বিভাগ - শহর

কলকাতা, আমার মতে, একটা ‘লুজ ক্যারেকটার’ শহর, ফষ্টিনষ্টি করা মেয়েমানুষের মতো। না পারা যায় গিলতে, না যায় উগরোতে। কলকাতার বাসিন্দে মাত্রই জানেন, নগর জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাটা কী রকম। এ এক কঠিন খেলা, ইংরেজিতে যার বিভিন্ন প্রতিশব্দ ‘ক্যাচ টুয়েন্টি-টু’, ‘নো-উইন সিচুয়েশন’। বা, ‘টাইট স্পট’, কোরানডারি’। বাংলাতে যদি বলি ‘শাঁখের করাত’, ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’, ‘উভয় সংকট’? কলকাতা সেই খেলা যাতে হার আছে, জিত নেই। ‘আসা’ আছে, ‘যাওয়া’ নেই। গুডবাই বললেই বলতে হবে, ‘হ্যালো’! হয়তো এই কারণেই ডেসমন্ড ডয়েগ কলকাতাকে “মাচ অ্যাবিউজড, মাচ লাভড অ্যান্ড অলওয়েজ ইন্টারেস্টিং” বলেছিলেন ‘আর্টিস্টস ইমপ্রেশন’-এর উৎসর্গে। সঙ্গে ছিল তাঁর আঁকা হবি। গ্যাসপোস্টের ওপর নো-পার্কিং-এর বোর্ড মারা। তখনও তো কলকাতায় একটু সাবেক কালের গন্ধ ছিল। ছিল বালিগঞ্জ বারোক আর শ্যামবাজার ভিক্টোরিয়ানার টুকরো-টাকরা। এখনকার এই ইস্টার্ন বাইপাস আর রাজারহাটি কলকাতা কন্ডোমোনিয়ামের ফিউচারিস্ট স্থাপত্যের দাপটে তারা কোথায় মিশে গেছে কে জানে। এ কি নেহাতই ‘চান্স ডিরেকটেড’? কিপলিং যেমনটা বলেছিলেন। এই ছন্দে ছন্দে রং বদলানো, শপিং মল আর বিগবাজার আর চিকনাই দিদি-মাসিদের কলকাতা কি অঙ্ক কষে নষ্ট করল পুরনো সেই শহরটাকে? যে শহর “মাচ অ্যাবিউজড, মাচ লাভড” হয়েও ছিল “অলওয়েজ ইন্টারেস্টিং”। যে শহরের একটা ‘পাকা-আমি’ আছেই, যেমন ছিল এবং থাকবেও। সেই শহরকেই তো তার বইখানা উৎসর্গ করেছিলেন ডেসমন্ড। ঝটিতি স্কেচ আর পুরনো পারফিউমের গন্ধ-মাথা গদ্যে লেখা বইকে। হয়তো এ বই হুতোম কিংবা রবি ঠাকুরকেও উৎসর্গ করা যেতে পারত। কিন্তু হুতোম নিজেই তো কলকাতা-কাহিনির নায়ক না-হলেও এক কেন্দ্রীয় চরিত্র তো বটেই। চরিত্রকে কি আর কাহিনি উৎসর্গ করা যায়। আর রবীন্দ্রনাথ, তিনি তো যতটা জোড়াসাঁকোর, তার বেশি বই কম নন শাস্তিনিকেতনের। তাই সব দিক থেকে দেখলে মনে হয় যে ভুল করেননি ডেসমন্ড। কলকাতাকে যদি একান্তই কারও হাতে তুলে দিতে হয়, তবে তার যোগ্য দাবিদার কলকাতাই। চাঁদের গায়ে যেমন চাঁদ লাগে বাউলের দেহতত্ত্বে। বা, চাঁদ যেমন তার ‘চাঁদ-মুখ’ দেখে ‘সরসীর আরশি’-তে। সোনার হাতে যেমন সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার? তেমনি। এ শহরের সত্যিই কোনও লাগসই মেটাফর নেই। একটার পর একটা গেঁথে মেটাফরের মালা বানালেও নেই। হোমার যেমন খুঁজে পাননি ওডিসিউসের যোগ্য মেটাফর-সবই তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে খাটো হয়ে গেছে। কলকাতার ব্যক্তিত্ব কি ওডিসিউসের থেকে কম? নাকি আমিই কিছু হোমারের চাইতে বড়? এই ‘ব্যক্তিত্ব’ কথাটায় জানি, অনেকেই জানবেন, অনেকেই তেরচা বিদ্রূপ করবেন। শহরের আবার ব্যক্তিত্ব, এ কোন দেশি বাংলা? শহরের আবার ব্যক্তিত্ব হয় নাকি? আমি বলি, হয় হয় জানতি পারো না। শহরের যদি আত্মা থাকে, অবয়ব থাকে, হৃদয় থাকে, এমনকী থাকে ফুসফুসও (যেমন, গড়ের মাঠ), তো ব্যক্তিত্ব থাকতে বাধা কোথায়? মানি শহরটা ‘লুজ ক্যারেকটার’, তবে ‘চরিত্র’ তো আছে, ‘অসৎ চরিত্র’ হলেও। থাকতে বাধ্য। সব পুরনো শহরেরই থাকে। লন্ডনের আছে, প্যারিসের আছে, আছে রোমের, ইস্তানবুলের, বেনারসের-আর কলকাতার থাকবে না? সে ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরার যোগ্য লোক চাই। ডাবলিনের যেমন ছিল জেমস জয়েস। ফলে সেই আলোছায়ানদীনারীহীন শহরটাকে ‘ডাবলিনার্সে’ তিনি এক ট্র্যাজিক নায়ক বানিয়ে ফেললেন। গলির ভিতরে খেলা করা কিশোর, ঘরে ফেরা কেরানি, বচসা করা সবজিওয়ালা, চাকরি-খোয়ানো মাতাল, সেলসগার্ল, জোচ্চোর আর লাটে ওঠা ব্যবসায়ীদের গল্পের শহরে লাগল পরাজয় চেতনার, শীতরাতের কুয়াশার আর ছায়াহীন অস্তিত্বের ছোঁয়া। কে যেন বলেছিল, “ডাবলিন শহরটা যদি কোনও দিন নিশ্চিহ্নও হয়ে যায়, তবে জয়েস পড়ে আবার তা বানানো যাবে।” তেমন করেই বানিয়ে নেওয়া যাবে প্যারিসকে ভিকতর উগো পড়ে, বা ডিকেন্স পড়ে লন্ডন। বড় শহরের এই পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি, ঠাসাঠাসি করে বেঁচে থাকা জীবনে, এয় গলি-খুঁজিতে, এর বিবর্ণ ক্ষয়াটে রঙে, এর শূন্যতার, হতাশায়, এর ট্যারাব্যাঁকা পাগলপনায় ভরা আকাশের নীচে কত যে উপন্যাস আর ছোটগল্প আর কবিতা আর ছবি হয়ে থাকে। এরই প্রেমে পড়েছিলেন ডক্টর জনসন। বলেছিলেন, “লন্ডন সম্পর্কে আমি যদি কোনও দিন ক্লান্ত বোধ করি, বুঝতে পারবে যে জীবন সম্পর্কেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।” কথাগুলো বলেছিলেন লন্ডনের গলিঘুঁজি সম্পর্কে বলতে গিয়ে। সিকাভিলি সার্কাস আর কনসার্ট হলের লন্ডন সম্পর্কে নয়। ‘মার্ক অ্যান্ড স্পেনসারস’-এর লন্ডন সম্পর্কে নয়। প্যারিসকেও কি চেনা যায় নিছক ‘আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ’ তোরণ উল্লাসে বা শাঁজেলিজের বৈভবে-মহিমায়? চিনতে হলে আসতে হবে রু মুফতারের গলিতে, যেখানে হেমিংওয়ে বাস করতেন, র‍্যাঁবো-ভেরলেন বাস করতেন, যেখানে লেখা হয়েছিল ‘প্যার গোরিও’ বা ‘মোজ অফ ফিলিম্যাঞ্জেরো।” অথবা আসুন পিগালে বা সাঁ দনির বেশ্যাবাড়িতে, ন্যাংটো মেয়েমানুষরা যেখানে যত্রতত্র ক্যারাভান থেকে নেমে নাচ দেখায়।
যেমন কলকাতাকে চিনতে হলে, সোনাগাছি যেতেই হয়। হাড়কাটায় যেতেই হয়। সন্ধেবেলায় পার্ক স্ট্রিট-প্ল্যানেটরিয়ামের ধারঘেঁবা নিবু নিবু আলোয় খুঁজে বেড়াতে হয় ঠিক ইঙ্গিত। আমি অন্তত তাই মনে করি। শহর চিনতে হয় লোভের গন্ধে, শ্রমের শ্রান্তিতে, মিলনের মমতায়। ভিড়বাসে গলদঘর্ম কলকাতার লোক এখনও যে ভাবে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে আসন ছেড়ে দেয়, যে ভাবে হইহই করে ওঠে, পড়ে যাওয়া রুপ্স মানুষটির হাতে হাত রাখে পরম মমতায়।
হয়তো এই জন্যই এ কলকাতার ওপর মারার টান আমার আর ঘুচল না। কত বার পালাতে চেয়েছি, কত বার পালিয়ে গেছি আর ফিরব না বলে। শেষে আবার সে এসেছে ফিরিয়া। যত বার আসি, আকাশ থেকে শহরটাকে কী সুন্দর যে দেখার। যেন এক শ্যামলবরনি অলৌকিক স্বর্গকন্যা, জলবালা। আর দমদম হাড়িয়ে যত ভিতরে ঢোকে গাড়ি, মন বিষিয়ে যায়, শরীর বিষিয়ে যায় আরও বেশি। এত ধোঁয়া, এত ধুলো, এত ক্ষয়াটে কালচে রং এ শহরের। এত লজঝড়ে বাস, ট্যাক্সি, মিনিবাস। এত চিৎকার-চেঁচামেচি। এত লোক। এত টকগন্ধ। এত ঘেমো শার্ট আর রংজ্বলা প্যান্টালুন। আর ভুইফোঁড় কিছু ‘টাভেরা-ইনোভা- ক্যামরি-লান্সার’। কিছু খোট্টাহ-আদেখলার ভিড়-ঠাসা রং-বাহারি শপিং মল, ‘বিগ বাজার’-এর নয়া বড়বাজারি। আর নয়তো, সুখস্বপ্নের কন্ডোমোনিয়ামের বিজ্ঞাপন। আর বাঙালে স্বপ্নের সোনারগাঁইয়া হোটেলের পাঁচতারা প্রলোভন। আর নোলাধরা রেস্তোরী আর সোনাঝরা সানন্দ-সন্ধ্যা। লকলকে উত্তর-আধুনিকা বা খলখলে আমোদিনী মাঝবয়সিনী। শুধু এটুকুই কলকাতা? আমার শহর?
ফিরেই যাব, ভাবতে ভাবতেই ঝটিকা হাওয়া লাগে গায়ে। বঙ্গোপসাগরের ভিজে নরম নোনা হাওয়া। সে হাওয়া কানের কাছে ফিসফিসোয়: এই তো সবে কলির সন্ধে। আরও কত কী দেখবে, সবুর করো। জানো তো, কাল রাতে মুখুজ্জেদের বাড়ির বড় ছেলেটা সুইসাইড করেছে। ক্যানসার। টাকা নেই। তাই। আর জানো তো, পাশের গলির মাসিমা তিন দিন মরে পড়েছিলেন। গন্ধে টের পেয়ে পাড়ার লোক দমকল ডেকে দরজা ভাঙে। ওঁর কাছে কেউ নেই। ছেলে বিলেতে। কী বুঝলে শিবাজি? এ যে পলাশির প্রান্তর। খুলবে খাগ?
ফাজিল হাওয়া! কিন্তু একে ছেড়ে যায় কোন শালা, কোন আহাম্মক? কোন সে দেশে?
প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ৩

জুলাই ২০০৮, একদিন লাইভ

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

বিভাগ – শহর পৌরাণিক অভিধানে যে কথাই লেখা থাকুক, বসফরাসের চালু তুর্কি অর্থগুলো সবই

বিভাগ – শহর সব ‘নতুন’-ই কোনও না কোনও দিন পুরনো হয়ে যায়। কলকাতার যেমন

বিভাগ – শহর স্মৃতির পাতায় কত কী যে গন্ধের দাগ। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের

বিভাগ – শহর সেই বার নেই সেই বারাঙ্গনারাও নেই। গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে দুটো-একটা পয়সা পেলে

Scroll to Top