বিভাগ - শহর

পৌরাণিক অভিধানে যে কথাই লেখা থাকুক, বসফরাসের চালু তুর্কি অর্থগুলো সবই গলা বা কণ্ঠসম্পর্কিত। যেমন গলার শিরা, শ্বাসনালী, গলবিল (ফ্যারিঙ্কস), ঝুঁটি ইত্যাদি। ইস্তানবুলদের দৃঢ় বিশ্বাস, বসফরাসের হাওয়ায় গলার বা ফুসফুসের যাবতীয় অসুখ সেরে যায়। যে জন্য ইউরোপীয় ইস্তানবুলের ঐতিহাসিক গালাটা ব্রিজ পেরিয়ে কারাকয় মহল্লা পর্যন্ত চার-পাঁচ কিলোমিটারের যে পথটুকু বসফরাসের সমান্তরালে চলে, তার একদা নাম ছিল ‘থেরাপিয়া’ মহল্লা।
এখন অবশ্য শুধু অসুখের নয়, খিদে-তেষ্টার থেরাপির জন্যও এলাকাটা বিখ্যাত। সঙ্গে আছে হরেকরকম গান-বাজা। এলাকাটা জুড়ে সার সার রেস্তোরাঁ। অটোমানি স্যামন দোলমাসি (চিন্ম-জুচ্ছিনির গন্ধে ভরা), তুর্কি কেবাব (কাবাব), আনাতোলিয়ান পান্ডা, গ্রিক কেকরি মেজ (বকরি মেজ), দিয়ে আলফ্রেসকো তথা বসফরাসের খোলা হাওয়ায় লাঞ্চ, ডিনার। সঙ্গে আছে পিশে (কলসি) ভর্তি মেদক, শাবলি, কোতো দু লিওঁ-র লাল নেশা। কোনও রেস্তোরাঁয় চলেছে সুফি গান, কোথাও বা বাজছে আনাতোলিয়ার ‘বাহার এতুদি’ (বসন্ত বাহার)। আবার নিশীথ, নির্ঝুম পশ্চিমী ধ্রুপদীও বেজে চলেছে অন্য কোনওখানে—পিয়ানোতে দেবুসির ‘ফনের দিবাস্বপ্ন’।
তবে সাবধান, ও পথে বারবার যাবেন না। জিবের জোর যতই থাকুক, জেব কিন্তু খালি হয়ে যাবে। তাই ওঁরা যতই ‘আসতে আজ্ঞা, বসতে আজ্ঞা’ করুন, বসফরাসের পাগল হাওয়ায় খিদে যতই চাড়া দিয়ে উঠুক, মানে মানে কেটে পড়াই ভালো। বেশি খিদে পাওয়াটাও তো এক ধরনের অসুখ। মনের অসুখ। ওটাই তো আদিম হিংস্র মানবিকতা। অসুখ সারাতে গিয়ে কি আমি ফতুর হতে পারি? জায়গাটার নাম যে ‘থেরাপিয়া’ ছিল, সে কথা আমি কি জীবনে-মরণে ‘কখনও ভুলিতে পারি’? না, পারি না! থেরাপিয়াকে অবশ্য আরও অন্য একটা কারণে ভোলা সম্ভব নয়। ওই এলাকাতেই আমার এক প্রিয় কবি উনিশ শতকের শেষাশেষি বছর তিনেক বসবাস করেছিলেন। তাঁর নাম কনস্ট্যান্টাইন কাভাফি। জাতে গ্রিক কাভাফিকে বলা হয় শ্রেষ্ঠ ভূমধ্যসাগরীয় কবি। বোদলেয়ারের পরম অনুরাগী সমকামী কবি কাভাফি ছিলেন বোদলেয়ারের মতোই স্বাধীনচেতা। বোদলেয়ারের মতোই ‘রোমান্টিক-ডেক্যাডেন্ট’। নিয়ম-কানুন কোনো তোয়াক্কা করতেন না। আত্মাকে শক্তি দিতে হলে, ‘বশ্যতা’ বা ‘সংভ্রম’-এর তোয়াক্কা না-করাটাই ছিল তাঁর নীতি। ‘না মানলে নয় যতটুকু/সেটাই শুধু মানো/ বাকিগুলো বিদায় কর/বেশির ভাগটা ভাঙ।’ এমন ধাঁচের কবি যে বসফরাসের কাছাকাছিই থাকবেন, এতে আর সন্দেহ কী? বোদলেয়ারই তো বলেছিলেন, ‘হে মুক্তমানুষ! সমুদ্রকে সর্বদা সমাদর কোরো।’
আর বসফরাস তো নিছক সমুদ্র নয়, সমুদ্রের মেলা বা মালা। চার-চারটে সাগরকে মিলিয়েছে এই বসফরাস। ফিকে গাঢ় হরেক রকম কম, বেশি নীলে। এর হাওয়ার সজীবতায় রোগমুক্তি তো কোন ছাড়, পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হয়ে যায়। এ তো আরবসাগর বা বঙ্গোপসাগরের নোনা হাওয়া নয়, একটুখানি ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পর (ইস্তানবুলে প্রায়ই ঝরে) চেটে দেখুন। যে যা-ই বলুক, এর স্বাদ, একেবারে মিষ্টি! ঠিক যেন কলকাতার গলা। সকল রোগ, সকল পাপ নিবারক—আত্মচুরি/জাতচুরি/জ্যৈষ্ঠ মাসে ধান চুরি/যত্রতত্র রাত্রিযাপন/মদ্য পান আর কুকুটভক্ষণ ইনক্লুডেড।
তবে গলার যা নেই, বসফরাসের হাওয়ায় সেই ফস্টিনাস্টির, নখরাবাজির গন্ধটাও আছে। থাকবেই। বসফরাসের তো দুটো মুখ। এক মুখে সে রুমেলিয়াকে ‘আসছি’ বলে চলে যায়। অন্য মুখে আনাতোলিয়াকে বিদায় জানিয়ে বলে ‘যাই’। এক মুখে পশ্চিম-এশিয়ার সঙ্গে চুপি-চুপি কথা। অন্য মুখে ইউরোপের সঙ্গে পেলাদারি প্রেম। ঠিক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নদী, যা থেকেও নেই, আবার না থেকেও আছে।
এই কারণেই ইস্তানবুলদের সঙ্গে বসফরাসের এত সতীন-বন্ধন। এই সাহেব হতে হতেও না হতে পারা, আবার সাহেব না-হয়েও খাঁটি এশিয়ান (পড়ুন দেশি) না-বনার আত্মিক সংকট। দু’ নৌকোয় পা দিয়ে চলার টেনশন, অনেকটা উত্তর-ঔপনিবেশিক শহরগুলোর মতো। যেমন, দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা বা লাহোর। আনাতোলিয়ান মৌলভিরা চান মেয়েদের বোরখা, আবায়া, স্কার্ফে ঢেকে-ঢুকে রাখতে। রুমেলিয়া থেকে উড়ে আসা বসফরাসের হাওয়া মাথার সেই স্কার্ফ, পরনের সেই বোরখা খুলে দেয়। শেষে সমঝোতা হয় আলখাল্লার মতো ওভারকোটে। তার সঙ্গে জিনস। নীল মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসে। জিনসের উপর লেদার জ্যাকেট পরা যুবতীর দল একই ওড়নার তলায় কোনওক্রমে মাথা ঢাকা দেয়।
এই দ্বন্দ্ব (বা দ্বন্দ্বু)টা ইস্তানবুলের সবকিছুতে। দৈনন্দিন জীবনে, স্থাপত্যের ইতিহাসে, সৌন্দর্যে, দর্শনে। যে কারণে বাইজান্টাইন প্রাসাদের স্থাপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে নীল মসজিদের অটোমানি অহংকার, যে কারণে সান্টা সোফিয়া ব্যাসিলিকা ভেঙে তৈরি হয় আইয়া সোফিয়া মসজিদ। এই ভাঙাগড়ায় কোনও কিছুই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয় না, কোনও কিছুই পুরোপুরি স্বাতন্ত্র্য পায় না। কেবল একে অন্যকে দাবিয়ে রাখে কিছুকাল। যেমন আতাতুর্কি ইস্তানবুলের তুর্কি জাতীয়তাবাদ দাবিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে বহুভাষী, বহুমাতৃক অটোমানি সংস্কৃতিকে। যে জাতীয়তাবাদ এখনও ইস্তানবুলে রাজত্ব করে বেড়ায়। এই অনুজ্জ্বল, নিষ্প্রভ জাতীয়তাবাদের শিকার সবচেয়ে বেশি হয় ইস্তানবুলরা। পশ্চিমী গ্ল্যামারের আলোর তলায় ইস্তানবুলরা যেন আরও ময়লা, আরও ধূসর। যেমন দেখেছি ‘কাপিলা কারসিসিতে’। ইস্তানবুলের ‘গ্র্যান্ড বাজার’ নামে পরিচিত এই ‘কাপিলা কারসি’ দুনিয়ার প্রাচীনতম শপিং মল, মধ্য পনেরো শতকে, অটোমান সুলতান মেহমেটের আমলে নির্মিত। এতে ৬১টি প্রবেশপথ, হাজার পাঁচেক দোকান আছে। সে সব দোকানে কি না মেলে। চর্মদ্রব্য থেকে পুঁথিপত্র। (রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’-র তুর্কি অনুবাদেও চমক লেগেছে), সোনাদানা, মণিমুক্তো, কার্পেট-ঝাড়লণ্ঠন, পটারি, ঘড়ি, হুকো, অটোমানি পাগড়ি, ফরাসি বেরে, পুরনো স্বর্ণমুদ্রা… হয়তো বা বাঘের দুধও। পুরনো শহরের বেয়াজিত এলাকায় এই বাজারের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধ-বিকসনা ইউরোপীয় সুন্দরীরা, পুরুষবন্ধুর স্কন্ধলগ্ন হয়ে। কাফেগুলো গমগমাট, ফরাসি-জার্মান-ইংরেজি-ইতালিয়ান ভাষার কলরবে। চিজ-বাকলভা-বিস্কুটেক-লাল মদিরার মিশ্র সুবাসে।
এরই ফাঁকফোকর ধরে কোনও মতে টেবিলে-টেবিলে পৌঁছেচ্ছে দেশি ইস্তানবুলি চায়ের গেলাস, টার্কিশ ব্ল্যাক কফি। প্রবেশপথগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ইস্তানবুলি তিলের রুটির (সিমিটে) ফেরিওয়ালা ডাক দিচ্ছে পড়ন্ত বিকেলে নিস্তেজ গলায়। মাত্রই দু’-এক টার্কিশ লিরা দামের রুটি। ধোঁয়াওঠা চেষ্টাটও রয়েছে পাশাপাশি। কেউ মুখ ঘুরিয়ে দেখে না। লোকাল কালচার? ধুর। সে তো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। তার রেয়াত করে কে? গেঁয়ো যোগী কি আর ভিখ পায়? ঘরের মুরগি, কে না জানে, ‘ডাল-বরাবর’!
তবে এই অবস্থার পিছনে কতটা এশীয় বা ইউরোপীয় জীবনদর্শনের বৈপরীত্য কাজ করে, তা বিতর্কের বিষয়। পামুক একে এশিয়া বা ইউরোপ নামের বিমূর্ত ভাবনায় বেঁধে না-রেখে, স্থানীয় বনাম আমদানি ঐতিহ্যের লড়াই বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর স্মৃতিকথায়। এ ধরনের বিমূর্ত বিভেদ রাজনীতিকরা প্রায়ই করেন। ‘কিছু কিছু সীমান্ত থাকে যা নেহাত-ই কাল্পনিক’—’ফিফটি ইয়ার্স অফ ইউরোপ’-এ লিখেছিলেন জ্যান মরিস। যেমন, উনিশ শতকের বিখ্যাত অস্ট্রিয় রাষ্ট্রনায়ক প্রিন্স মেটারনিখের ধারণা ছিল, এশিয়া আর ইউরোপের সীমান্ত ভিয়েনার পূর্ব দিকের ল্যান্ডস্ট্র্যাসেতে। অথচ রাস্তাটি গেছে হাঙ্গেরি থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত। এ ধরনের ধারণা বিশ শতকেও বহু রাজনীতিকেরই মনে অটুট ছিল। জার্মানির প্রবীণতম চ্যান্সেলর ও খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটিক দল প্রতিষ্ঠাতা কনরাড অ্যাডেনোয়ের যতবার মধ্য-ইউরোপের এলবে নদী পেরিয়ে বার্লিনে যেতেন পূর্ব দিক থেকে, ততবারই বলে উঠতেন, ‘এইখানে এশিয়ার শুরু।’ তার পর জানলার শাটার নামিয়ে দিতেন।
এ রকম ভুল ধারণা ইস্তানবুল সম্পর্কেও পশ্চিমী রাজনীতিকদের মধ্যে এখনও আছে। এদের অনেকেরই ধারণা, ইস্তানবুল বোধহয় দামাসকাস বা তেহরান-এর মতো আর একটি মৌলবাদী এশিয়ান শহর। আবার অনেকে একে ‘প্যারিস অফ দ্য ইস্ট’, ‘গেটওয়ে টু ইউরোপ’ বলে মনে করেন। অথচ অটোমানি আমলের উত্থানের দিনে এই ইস্তানবুল-ই ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা শাসন করেছে। দোলমাবাসি প্রাসাদে গাইড যুবক দেখিয়েছিল, সব সুলতানের স্বাক্ষরেই আছে তিন-দীপের একটি কমনসইন—মানে ওঁরাই ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার মালিক-প্রভু।
শুধু প্রভু নয়, লুটেরাও বটে। ‘দিবে আর নিবে’-র গল্প বড়ই কম অটোমানি ইস্তানবুলে। শুধুই গায়ের জোরে পরের ধন গায়েব করা। দু’-একবার যা দিতে- থুতে হয়, তা-ও ভয়ে ভয়েই। একবার, অপর এক লুটেরা নাদির শাহর জন্য একটি হিরে-বাঁধানো সোনার ছুরি। শেষমেশ তা অবশ্য দিতে হয়নি, নাদির শাহ-র আকস্মিক মৃত্যুর জন্য। ছোরখানি রয়েই গেছে তোপকাপি প্রাসাদে। আজও পর্যটকদের চোখ ধাঁধাতে। একটু ছাড়া দোলমাবাসি বা তোপকাপির টন টন সোনা, হিরে, জহরত, কার্পেট, ক্রিস্টাল—সবই এসেছে এই তিন দ্বীপের মালিকানার সূত্রে। ব্রিটিশ ক্রিস্টাল, চিনে পোর্সেলিন, আরবি সোনা, আফ্রিকান হিরে, ইতালিয়ান মার্বেল।
কিন্তু মহাকালের রথের ঘোড়া তো সব হিসেব-ই পালটে দেয়। ফলে ইস্তানবুলকেই আজ ইউরোপ-আমেরিকাকে রেয়াত করে চলতে হয়। তারা একটু পাঙ্গা দিলেই দোলমাবাসির সবচেয়ে বড় ঝাড়লণ্ঠন ঝলমল করে ওঠে। যেমন করেছিল কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ইস্তানবুল আগমন। সারা প্রাসাদে সাজো-সাজো রব। পূর্ব-পশ্চিমের মিলনের গান। স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর সঙ্গে তুর্কি জাতীয় পতাকার করমর্দন। হই চাই, হুল্লোড়। আজ সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে।
মিল-কিল বাজে কথা। ইস্তানবুলকে যদি কেউ অন্য সংস্কৃতি, অন্য সভ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে থাকে, তবে সে কাজ করেছে বসফরাস। তার হাওয়ায়, তার ঢেউয়ে, তার জলে, তার গাংচিলের ডানায়। ইস্তানবুল যদি ধ্বংস, পরাজয়, বিবাদ আর বঞ্চনার গল্প বলে, বসফরাস তা হলে জীবনের গান গায়। পামুক তাই মনে করেন। এই যে ইস্তানবুল তার সুফিয়ানা, আর অতীন্দ্রিয়কে আর হজনের পাশাপাশি তার পশ্চিমী ধ্রুপদ আর সঙ্গের মেজাজি চায়ের আড্ডাটি বজায় রাখতে পেরেছে, তা ওই বসফরাসের হাওয়া-বাতাসের কল্যাণেই।
এরাই জন্য ইস্তানবুলরা আকঁড়ে ধরে থাকেন তাঁদের শহরকে। যেমন গালাটা ব্রিজের নিচের সাহেবি কেতার ফিশ-রেস্তোরাঁর ওই ছোকরা অ্যাটেনডেন্ট। চেহারায়, পোশাকে-আশাকে, আচার-ব্যবহারে যথেষ্ট স্মার্ট, সপ্রতিভ, প্রাণবন্ত। কোনও কারণে পামুকে হয়তো তার মনে ধরেছিল। কে? জানতে চাইলে পরিচয় করিয়ে দিই—’আমার স্ত্রী।’ তৎক্ষণাৎ তার পালটা প্রশ্ন : ‘আমি ইন্ডিয়ান মেয়ে বিয়ে করতে চাই। কোথায় গেলে খোঁজ পাব?’ পামুর সহাস্য উত্তর : ‘কেন, ইন্ডিয়ায়!’ তার পর একটু ভেবেচিন্তে ফের বলে, ‘শাদি ডট কমে বিজ্ঞাপন দাও। তবে ইন্ডিয়ায় আসতে হবে, হয়তো থাকতেও হবে। পারবে তো?’ এবারে ছোকরার চক্ষু চড়কগাছ। কোনও মতে বলে, ‘শাদি ডটকম ওকে! কিন্তু ইন্ডিয়ায় থাকা? ওরে বাপরে!’ কেন, কেন, কেন? ‘নো ম্যাডাম, নো! হিয়ার… বসফরাস… বিউটিফুল… লট অব ফিশ…ভেরি গুড… ইস্তানবুল ভেরি গুড.. ইন্ডিয়া… নো ফেভত… নো বসফরাস.. ইন্ডিয়া নো?’ যথার্থ, সেই ‘পরবাসে রবে কে হায়… তেমন আপন কেহ নাই।’
ঠিকই কথা। বসফরাসকে কোথায় পাবে ছোকরা ইন্ডিয়াতে? এ তো শুধু ও ছোকরার নয়, কম-বেশি সব ইস্তানবুলুরই মনের কথা। তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান অভিনেত্রী সিকেল কেকিলি কোনও এক নাটকের চরম মুহূর্তে বলেছিলেন, ‘ইউরোপের ধনীরা এতটাই ধনী যে, নির্ধন হওয়ার ভান করাটা তাদের পোষায়।’ ইস্তানবুলুদের তা পোষায় না। তাদের কেবল সম্বল নীলমণি বসফরাসটাই আছে। ওটা তারা কোনও মূল্যেই খোয়াতে নারাজ। আর সে কথা জানান দিতে তাদের কোনও ভণিতা নেই।
ননা, বসফরাস তাদের সব দুঃখ ভোলার গান। কেন না, বসফরাস তার গলায় কোনও ইতিহাসের অ্যালবাট্রস ঝুলিয়ে রাখে না। বসফরাসে আছে জলের উল্লাস, পাখির উড়াল, ফেরি-স্টিমারের চারপাশ-ঘেরা সাদা-ফেনার শীথ-মাজা ডানা মেলে আকাশের সন্ধান। আছে তার দুই তীর সংলগ্ন বনরাজি, সাইপ্রেস- জুভাস-পাইন পাতার শিরশিরানো, কালো, গথিক ছায়ামেলা ভগ্নদশার প্রাসাদোপম ইয়ালি। একদা পাশারা থাকতেন।
সে সব ছবির অনেকটাই বেঁচে আছে ফরাসি স্থপতি আঁতোয়ান আনিয়েস মেলিয়ে-র এনগ্রেভিংয়ে। উনিশ শতকের গোড়ায় ইস্তানবুলে এসেছিলেন মেলিং। ছিলেন অনেকটা কাল, প্রায় দু’ দশক। প্রথমে কাজ নিয়েছিলেন সুলতানা হাতিসের উদ্যানসজ্জার। সাহেবি-ছাঁচের বাগান, সোনাঝুরি-আকাশমণি আর লাল-বেগুনি লাইলাককে ছাওয়া। সুলতানের পছন্দ হয়েছিল। সেই সূত্রেই পেয়ে রাজস্থপতির চাকরি। দীর্ঘকালের এই নিয়োগ তাঁকে অটোমান দরবারের ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল। সেই সুযোগেই ইস্তানবুলকে কাছে থেকে দেখা, এনগ্রেভিংয়ে ফুটিয়ে তোলা। পরবর্তী কালে যা তাঁর ‘ভোইয়াজ পিতোরেস্ক দ্য কনস্টান্টিনোপল এ দে রিভ দু বোসফোর’ (ইংরেজি অনুবাদে, ‘পিকচারেস্ক ভোয়েজ অফ কনস্টান্টিনোপল অ্যান্ড দ্য ব্যাঙ্কস অব বসফরাস’) নামে প্রকাশিত। ৮৮টি এনগ্রেভিং সমৃদ্ধ এই বইটি সম্পর্কে পামুকের সবিস্ময় মন্তব্য : ‘এর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেল আমাদের হতবাক করে।’ মেলিয়ে-র আঁকা ছবিগুলো ঠিক ধরতাই পশ্চিমী শিল্পীর দেখা অটোমানি হারেম রহস্যের ইস্তানবুলের ছবি নয়। এই ইস্তানবুলের গায়ে বসফরাসের হাওয়ার গন্ধ মিশে আছে। আছে বসফরাসের রুমেলি হিসাব ফেরিঘাটের দিনভর ব্যস্ততা, যাত্রীদের দৌড়াদৌড়ি, গালাটা ব্রিজের মাছ-শিকারীদের দৃষ্টি, বাচ্চা নিয়ে পথ- চলা নারী, সিমিটে রুটিওয়ালার তিনচাকা ঠেলা, সুলতানাহমেট চত্বরে মাতাল-বোহেমিয়ানের অপরিচ্ছন্ন পোশাক, গাংচিলের রোদেল ডানা, বাড়িফেরা অফিসবাবু-বিবির অবসন্নতা, পায়ে-পায়ে সন্ধের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরা হতাশ বৃদ্ধের বিষাদ। এ ছবির কোনও এশিয়া-ইউরোপ, পূর্ব-পশ্চিম নেই। এটাই ইস্তানবুলের ঘরোয়া ছবি।
যার প্রাণভোমরা রয়েছে বসফরাসের গভীরে, ঢেউয়ে-ঢেউয়ে, আকাশে- বাতাসে। এই ইস্তানবুল ধরা দেয়, এমনকি সস্তা-থার্ড টিভি সিরিয়ালের ক্যামেরার চোখেও। সেখানেও সেই একই গল্প। নায়িকার বাবার কাছে ধাক্কা খেয়ে ব্যথাতুর নায়কের আনমনা পথ- চলা। ইস্তানবুলের অলি-গলিতে এবং শেষমেশ ওই থেরাপিয়া এলাকাতেই। সেখানেই সে শূন্যে ডানা-মেলা গাংচিলের দিকে তাকায়। তাকায় বসফরাসের দিকে। ওটাই মেলিয়ে-র বসফরাস। চোখ খুললেই যে বসফরাসকে আজও স্পষ্ট দেখা যায়। শোনা যায়, কান পাতলেই।

দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম সংখ্যা, ৩-১৮ ডিসেম্বর ২০০৯, একদিন লাইভ

সমস্ত বিভাগ
Scroll to Top