সব ‘নতুন’-ই কোনও না কোনও দিন পুরনো হয়ে যায়। কলকাতার যেমন হয়েছে, দিল্লিরও তা হয়ে চলেছে। ইংরেজ এলোমেলো ভাবেই এক দিন কলকাতা বানিয়েছিল (“চান্স ডিরেক্টেড, চান্স ইরেক্টেড”)। সিপাহী বিদ্রোহের পর অবশ্য পুরনো দিল্লির অলিগলির রহস্য ভেঙে আধুনিক, নিরাপদ এক শহর গড়ে-পিটে নিতে ইংরেজ আর দেরি করেনি।
ফলে প্রথম বলি হল পুরনো মহল্লাগুলো। যে সব মহল্লার সঙ্গে মান্ধাতার আমলের দিল্লির নানা যোগ সূত্র : কারও নামে ফটক, কারও নামে হাভেলি, গলি, বাগ। একটা বাড়ির নাম ছিল ‘বরাদরি শের খান’, আরেকটার ‘নামক হারাম কি হাভেলি’। চাঁদনি চকের দিকে লোকজন বলতে পারেন, বাড়িটা এখনও আছে কিনা। ও দিকে এখনও বোরখা ঢাকা নারীরা সালমা-চুমকি, ভারী আর ভরা রুপোর গহনা কেনেন দরিবা কালান গলি থেকে মালার পুঁতি আর জলের দরে বিক্রি হয় মতি বাজারে।
সে সব কিছু নিয়েই পুরনো সেই কিয়ার শহর দিল্লি আজও আছে এডউইন লুটিয়েন্সের গড়া বৃত্তাকার, স্তম্ভশোভিত কনট প্লেস, আর তরুছায়াচ্ছন্ন বুলেভার্ড, অ্যাভিনিউয়ের নয়াদিল্লির পাশাপাশি। নতুন দিল্লি গড়া শুরু হয়েছিল ১৯১১ সালে, সিপাহী বিদ্রোহের বছর পঁচিশ পর, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার নয়া ক্যাপিটালের নয়া জাঁকজমকে। বছর আঠাশ বাদেই যে এই রাজধানীর মারা কাটাতে হবে তা কি জানত ইংরেজ? আর সেই নয়া দিল্লিও কি জানত যে উত্তরে কনট প্লেস, দক্ষিণে লোধি রোড, পূর্বে মথুরা রোড আর পশ্চিমে ভাইসরয় ভবন (পরে রাষ্ট্রপতি ভবন)-এর ছোট এলাকা ছাড়িয়ে সে ক্রমশ দখল করে নেবে একেবারে যমুনার উসপারে, উত্তরপ্রদেশের ভিতরের নয়ডায়। বা হরিয়ানার ভিতরে গুরগাঁও তক? জানতেন কি বাহাদুর শাহ জাফর সে সব কথা? হয়তো আন্দাজ পেয়েছিলেন ভারতের শেষ স্বাধীন সম্রাট, না হলে কী ভাবে লেখেন, ‘ইয়ার থা, গুলজার থা বাদ-এ সবা থি, যায় না থা।’ সন ১৮৬২-তে আমরা দেখেছি ইয়াঙ্গনে নভেম্বরের এক বিষণ্ণ বিকেলে একটি ঢাকাঢুকি দেওয়া লাশ জেল থেকে বার করা হচ্ছে। এক অজানা পরিচয় ব্যক্তির মরদেহ। কারাগারের ভারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ কমিশনারের আদেশ ছিল, শেষ গ্রেট মুঘলদের সমাধিতে যেন কোনও এপিটাফ না থাকে। সে অনুমতি মিললে কী লেখা থাকত আমরা জানি। জাফর নিজেই লিখেছিলেন, “হায় কিতনা বদ নসিব জাফর, দাফনকে লিয়ে দো গজ জমিন ভি না মিলি কিউ ইয়ার মে।” নিজ ভূমে অভাগা জাফর কবরের জন্যও পেল না দুই গজ জমি। ‘পরবাসে রবে কে?’
তবু কবি জাফরকে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সব দায়দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তাও একজন পরাজিত সম্রাটের দায়। যে ধ্বংসঙ্করী বিদ্রোহে দিল্লিতে আগুন জ্বলল, কাসে আর বারুদের আগুনে দিল্লি হয়ে উঠল রাজ্যের স্তালিনগ্রাদ, পরবর্তী শতকেও তার জোর কাটেনি। জাফরের বারোটি সন্তানকে হত্যা করা হয়েছিল। চার মাসের রক্তক্রান্ত বিদ্রোহের অবসানে দিল্লি তখন ভগ্নস্তূপ। শূন্য সর্ব-শ্রীহীন মুঘল রাজধানী শেহজাহানাবাদ। মিয়ানমারে বন্দি দশায় মৃত বাহাদুর শাহ জাফর।
এ গল্প লেটমোটিফের মতো দিল্লির শহরে ফিরে ফিরে এসেছে, এখন সিপাহী বিদ্রোহের দেড়শো বছর পূর্তিতে যেমন। সে বিদ্রোহের মতো সে দিল্লি নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা বিতর্ক। বিদ্রোহে যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল তেমনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যও ছিল। কোনটা বড় কোনটা ছোট তা নিয়েই তর্ক। সেই মুঘল জমানাতেও জৌলুসের আলোর নিচে ছিল অবক্ষয়, দুর্নীতি আর দারিদ্রের লাঞ্ছিত অবয়ব। তবু দিল্লির গলিপুঞ্জি মীর তাকি মীরের ভাষায় ‘এক তসবির নজর’, এক মহৎ শিল্পের মতো দ্রষ্টব্য।
যেখানে কবিতার সাতরঙা ফুলবুরি, নর্তকীর ওড়না, ঘাঘরার চুমকি চাল, শ্রাবণের ফুলবাহারি মেলা (‘ফুলওয়ালোঁ কা সওয়ার’), ফরাসি শ্যাম্পেন গরম চানার চাটে মিলেমিশে যেত ভাং আর ভণ্ডবান্ধব (বহুরূপী) আর কাঠ পুতুলিবাজদের রঙ রসিকতা, সার্কাস অ্যাক্রোব্যাটিকস, প্রেম আর কবিতা, বিচ্ছেদ আর মিলন, শূন্য বা পূর্ণতায় সুর তোলা সঙ্গের কথাবারি।
একেই কি অবক্ষয় বলে? এই লম্পট, সুর্মা চোখের পতঙ্গ-বাজ, মেয়ে-বাজ, সুবাসিত খোশমেজাজি দিল্লির প্রেমিক ছিলেন মির্জা আসাদুল্লা খান গালিব, এই বাদশাহ আমিরের দিল্লির, এই গরিব ভুখে দিল্লির। আমীর বা গরিব, হিন্দু বা মুসলমান নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না, যেমন ছিল না তাঁর প্রিয় সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের (যাঁর সভাকবি ছিলেন গালিব)। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক উস্কে দেওয়ার জন্য ১৮ শতকের শেষাশেষি শাহ ওয়ালিউল্লাহ যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা সেই সময়ে অভাবনীয় ছিল। অভাবনীয় ছিল ওয়াহাবি আন্দোলনও। সিপাহী বিদ্রোহের আত্মিক আবহাওয়ায়তে তাই নিতান্তই হেলাফেলার নয়।
সেই পরিবেশেই বৃদ্ধি পেতে থাকে সুফি ঐতিহ্যে। আস্তে আস্তে ১৯ শতকে, যা বলতে গেলে, এক ধরনের জীবনবোধে পরিণত হয়। কে বা মৌলবি আর কে বা মুরা আর কে বা মাতাল কে চরিত্রহীন তাই নিয়ে ঠাট্টা। গালিব যা আমরা দেখেছি। গালিব বলেছেন, মেয়খানার দরজাটা কোথায় আর কোথায়ই বা ওয়ায়েজ (মৌলবী) জানি না। “মগর হাম ইয়ে জানতা হ্যায় কি ও যাতা থা কে হাম নিকলে।” শুধু এটুকু জানি, যে ও ঢুকছিল, আর আমি বার হচ্ছিলাম।
এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। সেই ভয়ঙ্কর দিনরাতের দিল্লিতে গালিব ছিলেন এক ব্যতিক্রম। হতে পারে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন স্বচ্ছ ছিল না। একই সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থন করেছিলেন, আবার রানি ভিক্টোরিয়াকে সেলামও ঠুকতেন। কিন্তু সে দ্বন্দ্ব তো বহু কাল ধরেই এই উপমহাদেশের কবি- সাহিত্যিকদের তাড়া করে আসছে। এমনকী রবীন্দ্রনাথকেও। তাই গালিবকে একমাত্র দায়ী করাটা বোধহয় ভুল। বরং আমরা ভাবি সেই গালিবকে নিয়ে, ধর্মে যাঁর অরুচি ছিল। যে কাবায় গিয়ে সাঁঝ বাজাতে চেয়েছিল, বা কাশীর মন্দিরে ইসলাম-ই ‘আহরাম’। বাহাদুর শাহের মৃত্যুর ছয় বছর পর গালিব মারা যান। কিন্তু মনে হয় যেন এখনও বেঁচে আছেন। “কে হার বাত পে কহেতা কিয়া ইউ হোতা তো ক্যায়া হোতা”। যদি এখন গালিব বেঁচে থাকত তো কী বলত, মীর প্রশ্ন করেছিলেন। সত্যিই তো কী বলতেন গালিব, আজকের এই ধর্মান্ধতার দিনে?
১৯ মে ২০০৭, একদিন লাইভ