বিভাগ - শহর

সেই বার নেই সেই বারাঙ্গনারাও নেই। গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে দুটো-একটা পয়সা পেলে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার যে ছেলেটা হরবোলা ডাক ডাকতে ডাকতে চলে যেত, সেও আর নেই। এই ত্রিভুবনার্যিত কলকাতায় হারিয়ে গিয়েছে। রাজকীয় ক্যালকাটা যেমন হারিয়ে গিয়েছে মফস্বলি কলকাতায়। তেমন করেই হারিয়ে গিয়েছে সার্কুলার রোডের ‘ছোট ব্রিস্টল’ উইন্ডসর বার (‘ছোট ব্রিস্টল’ কেন, জানি না। বড় ব্রিস্টল বলে কি কিছু ছিল? হামদি বে বলতে পারতেন) ধর্মতলা স্ট্রিটের ‘সাকি’, পালটে গিয়েছে ট্রিকস্ (ওখানে প্রথম শুনেছিলাম উষা উথুপ, তখন উষার গান, ‘সচ অ্যান্ড সোভা’, ‘সামার’, ‘হাউস অব দ্য…রাইজিং সান’)। আর হারিয়ে গিয়েছে সেই মেয়ের দল। রুথ-রেবা-রাবেয়া-রুকসানারা—আজও যারা ঘর ছাড়া। যারা এখন বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের এধারে-ওধারে আধো আলো-আঁধারে খদ্দেরহীন বেদনাবিধুর ক্যাাংলাস, উত্তর আধুনিক যৌনকর্মীদের সফিস্টিকেশনের ধারে কাছে যায় না, ডিজাইনার প্যান্টি পরে না, এখনও সার্কাস গালির আধ ন্যাংটো নাচ দেখায়। সাকির ক্যাবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বহুকাল (বামপন্থী নীতি পুলিশি থানায়), ফের চালু হল কিনা সিলুর যাবনাগো শিল্পায়নের গতিমনস্কতায়, জানা নেই। সাকি থেকে সোনাগাছির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘুচে যাওয়াটা যতটা আনন্দের, ‘ঘর ভাড়া দিতে না পারা সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষ্মী, রুকসানার ওপারে ফিরে যাওয়াটা ততটাই কষ্টের’। ছায়াসীমান্তে কতদিন এই আদিমতম পেলাটি টিকে থাকবে?
তুষারদা বেঁচে থাকলে আপত্তি করত। ঘোর প্রফেশনাল পোড় খাওয়া কলমচি তুষারদা, প্রফেশনাল স্বাধীনতাকে ফান্ডামেন্টাল রাইট-এর সব সম্মান দিতে সে অভ্যস্ত। এবং ভারতীয় সংবিধান মাফিক নয়, দস্তুরমতো জেফারসনিয়ান ‘ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স’ অনুসারে। ছোট চ্যাটার্জির (সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটির পিছনে, সুতারকিন স্ট্রিটের সরকারের ছাপাখানার লাগোয়া) বসে জনৈকা মধ্যবয়স্কা স্থূলাঙ্গিনীকে দেখেছি তুষারদা জ্ঞান দিচ্ছেন : “যেমন আমি রিপোর্টার, আমার প্রফেশনে কমিটেড, তেমন আপনি প্রস্টিটিউট, আপনি আপনার প্রফেশনে…।”
বার ভরতি মাতালের সামনে, ভর সন্ধ্যায় ওই ‘প্রস্টিটিউট’ শব্দ স্ত্রীলোকটিকে কতটা পুলকিত করেছিল জানি না, তবে আমার দিব্য ধারণা, তিনি তুষারদার কথায় এক বর্ণও মর্মোদ্ধার করতে পারেননি। সন্ধ্যার শুরু থেকেই (তুষারদা বলত, “বেলা যে পড়ে এল, জল কে চল”) আস্তে আস্তে তুষারদার মাত্রা পালটাতে থাকত। কখনও পিঙ্ক, কখনও সবুজ, কখনও বুঝি আর কখনও অবুঝ। রাত আটটা পার হলেই (কাগজের অফিসের ভাষায় যখন ‘মিড শিফট’) বাকি কাজ, লেখাঝোকা আমাদের হাতে ধরিয়ে, কানে মন্তর খোঁজার মত ফুসফুসিয়ে বলত তুষারদা “যাবেন না কি? সব মিলিয়ে যা আছে (পকেট বাজিয়ে) দু’একটা বিয়ার হয়ে যাবে।” তারপর জোর গলায় সবাইকে শুনিয়ে, তাহলে ওই কথাই রইল। আপনি ততক্ষণ মণি শঙ্কর আকারের কপিটা ট্রান্সলেট করুন। আমি ফিরে এসে (গম্ভীর বসে-বসে গলায়) দেখছি। না দেখিয়ে কলি ছাড়বেন না। আচ্ছা…। আর হ্যাঁ, কেউ খোঁজ করলে বলবেন দূতাবাসে গেছি।
এই “দূতাবাসের” কোনও মর্ম বোঝা গেল? বোঝেননি এখনও? ‘দূতাবাস’ হল ‘এমবাসি’ বার। সুতারকিন স্ট্রিট-এর কাছে। কলকাতার ব্ল্যাক ফ্লায়ার-স্ট্রিট স্ট্রিট এলাকা—রমরম করছে আনন্দবাজার তার গাড়ি ঘোড়া লোকলস্কর, প্রেস, গ্যারাজ নিয়ে। চাঁদনিচকের ওই চত্বরে উল্টো রাস্তায় স্টেটসম্যান বিল্ডিং, ঠিক যেন ড্রেসমন্ড ডয়েগের আঁকা ‘আর্টিস্টস ইমপ্রেশন’ হয়ে কালিঝুলিমাখা শহরের আকাশে টানানো রয়েছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ডান দিকে ম্যানগোর স্ট্রিটে অধুনালুপ্ত ‘সত্যযুগ’-এর অফিস। ম্যানগোর স্ট্রিটের আর একটা ডাকনাম ছিল—কলডোম স্ট্রিট। কেন, তা একবার হেঁটে আসুন, মালুম হবে। ওখানকার ম্যাজেস্টিক বারেই প্রথম আলাপ হয়েছিল হরিসাধন দাশগুপ্তের সঙ্গে। তখন তিনি আর সাহেবি হ্যারি এস নন (রোবার্তো রোসেলিনির সুবাদে) এবং পরবর্তীকালে তারই রেশ ধরে আত্মায় সর্বস্বহীন, শ্রীহীন মদ্যপায়ী মাত্র। ‘একই অঙ্গে এত রূপ’-এ অবশ্য হরিদার প্রতিভার চমক ইতিমধ্যেই মিলেছে। কিন্তু আমি যে হরিসাধনকে ম্যাজেস্টিকে চিনেছি তিনি সস্তা চিনাবাদাম চিবোনো এক ক্লান্ত মানুষ। হয়তো বা পতনের অন্ধকার মানুষকে এরকমই করে দেয়। তিনি তখন এক সার্থক ভাস্কর্যের ‘খাদ্যাহার।’ এখানে ওখানে আগাছার জঙ্গল। বাংলা গানের ভাষায়, এমন বিশাল বন্দরে বহুকাল থামেনি তো কোনও আকাশবিহারী যান। কবে কোন ঢোলাইয়ের ঠেকে আলাপ হওয়া শেঁচো মাতালকে নিয়ে সোজা চলে আসছেন বাড়িতে (শেষে তো শুনেছি একবারে “বোমের ঘরে অন্ন লুপেন সেনের ঘরে শেনি” অবস্থা হয়েছিল), পাড়াপড়শি, বাড়ির লোকজনকে চরম বিব্রত করছেন। ঢোলা, শার্ট পরে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে যাতায়াত করছেন। তবুও সেনস অব হিউমারটি সজাগ—“দুনিয়াতে এত পদবি কেন, তিন ধরনের হলেই তো হয় (পড়ুন ‘পান’)।” খান না (টি টোটেইলার) অথবা খান কি (একসঙ্গে পড়বেন না একটু দাঁড়ি দেবেন, ‘মায়া কী স্বপ্ন হারা’র মতো)—হরিদা বলেছিলেন। এই সেনস অব হিউমার কলকাতার বার কালচারের, যাকে বলে মজ্জায় মজ্জায়, হাড়ে হাড়ে। এতেই কলকাতার মাতালরা আলাদা, এবং তুলনীয় একমাত্র ফরাসি মাতালদের সঙ্গে। পেঁচো মাতালদের কথা বলছি না, তাল মাতালদের কথাও নয়, আমি বলছি জাত মাতালদের কথা। হামদি বে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আয়ান রশিদের মতো প্রবীণ মাতাল, অথবা কমলকুমার, ঋত্বিক ঘটকের মতো হোমারিক মাত্রার মাতাল। বা সন্দীপন-তারাশঙ্কর-সুনীলের মতো বাঙ্ময়/নির্বাক ও ‘রেজিং’ মাতাল। হামদি, মদের সব রসকসের বুলবুলি মস্তক করেও রোজ রাতে চ্যালা হয়ে বাড়ি ফেরে, রশিদ তার আক্সলুপি গন্ধের সঙ্গে টোরি, আহির ভৈরী রামের পাশ বানায় অবশেষে মির্জাগালিবে মাথা রেখে নাক ডাকায়।
নিজের বাড়ি নিজে খুঁজে হয়রান হয়ে যায় স্বেচ্ছাচারী শক্তি। এইসব সাত কাহন নিয়ে রসাল গল্প লেখে সন্দীপন, তারাশঙ্কর, সুনীল তাদের ‘জলে-আছি- জলে নেই’ স্টাইলে। সন্দীপনের বলা গল্পগুলো অবশ্য একটু প্যারাবলধর্মী, একটু কাফকায়েস্ক। বলেছিল, ও নাকি একবার অ-বাবুকে বছর শুরুর দিন অলিম্পিয়ায় ঢুকতে দেখেছিল সদলবলে। তারপর বহুমাস গড়িয়ে ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখে কোনও কাজে অলিম্পিয়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়েছিল অ-বাবু সদলবলে অলিম্পিয়া থেকে বেরোচ্ছেন। তখন থেকে সন্দীপন নাকি সবাইকে বলে বেড়ায় সেই বিরল মানুষ যে একজনকে টানা জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত একটা বারে বসে মদ খেতে দেখেছে। অলিম্পিয়ার কথাতেই মনে পড়ে সেল অলিম্পিয়ার বিফ স্টেক তথা ‘শাতো ব্রিয়াঁ’র কথা। জীবনের কোনও না কোথাও সময়ে সবারই যা চেখে দেখা উচিত। ভাল লাগুক আর না লাগুক। ভাল লাগা টিকে থাকুক আর না থাকুক। তার গরম ভাবটুকু ঠোঁট জিব ছুঁয়ে জিভে মেখে মেখায় ও আত্মার গহনে পৌঁছে যেতে বাধ্য। প্রথম প্রেমের মত। বা, প্রথম চুমুর মত। ভাল না লাগলেও ভোলা যায় না।

১৩ এপ্রিল ২০০৭, একদিন লাইভ

সমস্ত বিভাগ
Scroll to Top