বিভাগ - শহর

স্মৃতির পাতায় কত কী যে গন্ধের দাগ। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের ‘ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম’ (‘আ লা রশার্শ দ্য ত পরদু’) যাঁরা পড়েছেন (অন্তত প্রথম খণ্ড), তাঁরাই জানেন। এই আধা-আত্মজীবনী আধা-উপন্যাসের প্রধান দৃশ্যই ওই গন্ধের। ইনভলানটারি মেমরি বা স্বয়ংভূ স্মৃতির স্মৃতি নিয়ে। ছোট, মিষ্টি মাদলেন কেক—চায়ের কাপে ডোবাতেই কথকের মনে যেমন শৈশবের একটা বড় চ্যাপ্টার অজ্ঞাতসারেই ফিরে আসে স্মৃতির পথ বেয়ে। ফিরে আসে রোদ ঝলমলে শহরতলির রবিবারের আলসে ভরা সকাল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাকি-র হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে বলে ওঠা : ‘বাঁ জু।’ সেই চায়ের গন্ধ আর মাদলেনের মিশ্র সুবাসে পাখা মেলে ওঠা শহরতলির অলিগলি, গির্জার চূড়ো।
এ রকমই লাগে এখনও কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়। জীবন তো কতই পালটাল। “কত না হস্ত চুমিলাম আমি অক্ষিমালার মতো।” তবুও ও পথ দিয়ে গেলেই মনে হয়, আরে! এই তো সেদিন। এই তো সেদিন বকা খেলাম দিলীপদার কাছে। অ্যাটেনডেন্স খাতা দেখে দিলীপদা বললেন, ‘ডিসকলেজিয়েট হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।’ তখন আর স্যার স্যার করা ছাড়া উপায় কী?
উপায় হারিয়ে যেত। পরীক্ষাও দিয়েছি। পার্ট ওয়ানের পর ফের ক্লাসকাটা। প্রেসিডেন্সির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ক্লাসের ঘণ্টা বাজলেই, বুকটা ধক করে ওঠে এখনও। ভয়। মিলিয়ে যায় ভয়ের স্মৃতি। মন জুড়ে ভেসে ওঠে আর এক ছবি। উলটো দিকে কফি হাউসের দোতলা। পাস ক্লাস, বাংক করলেই বা কী? কফি হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিনও মনে হল, যাব নাকি একবার টু মেরে। তার সাথে দেখা হয় যদি?
যে ছিল আমার স্বপ্নচারিণী। আমার প্রথম প্রেম। সে অনেক কাল আগের কথা, বহু বহু দিন আগে। আমরা দু’জন সঙ্গী ছিলাম গভীর অনুরাগে। দশটা পঁয়তাল্লিশে একে বিজয় পাস ক্লাস বাংক করেই দে দৌড় কফি হাউসে। সিঁড়ির গোড়ায় ইসমাইল তখন সবে তার দোকানের ঝাঁপ খুলছে। দশ পয়সা তার দিকে বনাং। ‘ইসমাইলদা তিনটে চারমিনার।’ কোনও কোনও দিন অবস্থা আরও করুণ। ‘ইসমাইলদা এ মাসে কত হল?’ ‘সতেরো টাকা পঞ্চাশ পয়সা।’ ‘ঠিক আছে, আরও তিনটে চারমিনার।’
ধার-পর্ব শেষ। এবারে লম্ফন পর্ব। পোস্টারে, হ্যান্ডবিলে ছয়লাপ সিঁড়ি ভেঙে… কোথায় ও? দোতলায়? না তিনতলার ঝুল বারান্দায়? পথে মালবিকার সঙ্গে দেখা। সে এম এন রায়ের ‘র‍্যাডিকাল হিউম্যানিস্ট’-এর অ্যাকটিভ মেম্বার। ঝোলায় পাশাপাশি থাকে ‘দাস ক্যাপিটাল’ আর ‘শেষের কবিতা’। বলল, ‘চলে যা, তিনতলায় রয়েছে। ত্রিশ পয়সা ছাড় তো। এই বইটা…’ ভেতরে তখন বড্ড গরম। পাখা ঘুরত যত, হাওয়া দিত তার অনেক কম। তবু দারুণ গরমে, দরদরে ঘামে আমাদের মন মাতাল করে রাখত এই হাওয়া-ভরা কফির সুবাস। সঙ্গত দিত চারমিনারের মড়া-শোড়ানো গন্ধ।
আর কলকাতার হোমরা-চোমরা আঁতেল-কবি-ভাবুক-বিপ্লবীরা। কোথাও নির্মাল্য আচার্য, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় টেবিল আলো করে আড্ডা জুড়েছেন। কোথাও নির্মল চন্দ্র, অশোক মিস্তিরিরা। একবার এক টেবিলে গোয়েন্দা কাহিনীকার স্বপনকুমারকে (কি ওয়ার্ড : বিশ্বচক্র সিরিজ, বাজপাখি) আবিষ্কার করেছিলাম। তাঁর নায়ক-গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জির স্টাইলেই তিনি গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। দীপক অবশ্যই তখন ‘কফি সহযোগে চা ও ওমলেট ভক্ষণ’ করত। ‘দু’ হাতে দুই রিভলভার আর অন্য হাতে টর্চ’ নিয়ে বাজপাখির দিকে ধেয়ে যেত। আমরা যেচে আলাপ করতে গিয়েছিলাম। স্বপনকুমার খুশি হননি। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন প্রায় পাগল বিনয় মজুমদার-ও। জ্যোতিদা (জ্যোতির্ময় দত্ত) তখন সদা জাগিয়েছেন বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকা’। তখন কবিতার বাতাসে দাঁত শিরশিরানোর সময়। মুখস্থ হয়ে গিয়েছে সুনীলের সেই বিখ্যাত একুশ মাত্রার পয়ার—’আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ।’ পড়া হয়ে গিয়েছে শক্তির ‘অবাস্তব স্মৃতির মাঝে আছে… তোমার মুখ অশ্রু ভালোভালো, লিখিও উহা ফেরত চাও কি না।’ তখন বাজার গরম করছেন এক মাদকাসক্ত প্রমত্ত কবি তুষার রায়। হঠাৎ একদিন এক টেবিলে তার উন্মোট চেহারা চোখে পড়ল। যেন কোনও খুনে। কবিতায় পেঁড়ে থিতি দিচ্ছেন সুনীল-শক্তিকে। ‘সুনীল-শক্তি যুগলবন্দী, পয়সা করার নতুন ফন্দি।’
অবশ্য আমাদের প্রেসিডেন্সির ইংরেজি অনার্সের ছেলেরা এই সব বলজ কবিদের খুব একটা রেয়াত করত না। তাদের ছিল তারক সেন। তাদের ছিল শেকসপিয়ার : ‘দেয়ার উড হ্যাভ বিন টাইম ফর সাচ অ্যান্ড ওয়ার্ড… টুমরো, টুমরো অ্যান্ড টুমরো… আউট আউট ব্রিফ ক্যান্ডেল। লাইফ’স বাট আ ওয়াকিং শ্যাডো…।’ তাদের কফি হাউস সঙ্গিনীদেরও ব্যাপারই আলাদা। সাহসিনী, হ্যান্ডব্যাগ থেকে সিগারেট প্যাকেট, লাইটার বার হয়। তারা স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ (ওঁরা বলতেন, ‘অনাতান্দ গোদো’, ফরাসি কেতা!) নাটক করেন। তাদের হাউস শেকলে আলিপুরের মসৃণ সুরকি-বিছানো ড্রাইভওয়ে থেকে প্রায় উড়ে‌ই চলে আসে কলেজ স্ট্রিটে।
তারা ‘সব পেয়েছির’ দল। আর আমরা, মফস্‌সলে, শহরতলির মাঝারি বর্গের ছেলেমেয়েরা নিজেদের মনে করতাম ‘সর্বহারা’। তাই বিপ্লব, মহাবিপ্লব, গ্রামে গ্রামে, মহানগরে। তবু কখনও সখনও এ হিসেব উলটে দিত কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস। প্রেম উড়ে এসে জুড়ে বসত আলিপুরের মেঘবাসিনীর মনে, কসবায় বিত্তহীন সুতীক্ষ্ণ মেধার কবি যুবকটির জন্য। বিপ্লব ডুবে যেত কালো চুলের অন্ধকারে। ফুটত যে ফুল আজ কোথায়?
কোথায় সেই মেঘের দল? সেই সব রঞ্জিনী, সূপদীপা, সুলেখা, মিষ্টুয়ারা? নিশ্চয়ই এখন পৃথুলা, মাঝ-বয়সিনী? সেই প্রথম প্রেম তো কবেই গেছে মরে। কেওড়াতলার চুল্লিতে তার নাভির টুকরোও খুঁজে পাবে না কেউ। কবি হওয়ার উচ্চাশাও চ্যাপ্টা চারমিনারের প্যাকেটের মতো বুক পকেটে‌ই রয়ে গেছে। হারানো স্মৃতির সন্ধান?
মনে মনে বোধ হয়, আমরা সবাই মার্সেল প্রুস্ত। চা বা কফির কাপকে প্রধান চরিত্র করে স্মৃতিমেদুর উপন্যাস লিখে চলেছি নিরন্তর। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের ভারী আর ভরা গন্ধ উসকে দেয় ইসমাইলের চারমিনারের ধোঁয়া। ধোঁয়া টেনে আনে রাস্তায়, প্রেসিডেন্সির রেলিং-এ সাজানো সার সার বইয়ের স্টলে। সেখানেই প্রথম দেখা তার সঙ্গে। জানা ছিল নাম, বয়সে এবং মনে ছিল রং। ধরে ফেলতাম তাকে। ইস। আর একটু হলেই।

প্রথম বর্ষ, পঞ্চাশ সংখ্যা, ১৮ ফেব্রুয়ারি-২ মার্চ ২০০৯, একদিন লাইভ

সমস্ত বিভাগ
Scroll to Top