বিভাগ - সমাজ

কংগ্রেস প্রার্থীদের প্রচারসভায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একটি স্বতন্ত্র ভঙ্গির বক্তৃতা দিচ্ছেন। উত্তর বা দক্ষিণ কলকাতার সমস্ত সভাতেই (কখনো ভোলা সেনের আর কখনো অজিত পাঁজার) তিনি মঞ্চে উঠে বলছেন: আমি বক্তৃতা দিতে জানি না। রাজনীতিও সে অর্থে ভালো বুঝি না। আপনারা কাকে ভোট দেবেন সে কথা আপনারাই বিবেচনা করবেন। আমি কেবল আপনাদের কাছে জানতে এসেছি আমি এবারে নির্বাচনে কাকে ভোট দেব…’ তারপর সুভাষবাবু কখনও তাঁর দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা, কখনও বা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নানান ইতিহাস, অ্যাঙ্গোলা ভিয়েতনামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার লড়াই, ভারতের জাতীয় সংকট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার নৌবহরের উপস্থিতির ঘনঘটা এ সবের মাধ্যমে শ্রোতাদের বোঝাতে চাইছেন দেশকে বাঁচাতে, সংহতি বজার রাখতে একমাত্র কংগ্রেসই সক্ষম। নির্বাচনে কংগ্রেস যদি হারে তাহলে কংগ্রেসের যত না ক্ষতি হবে তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হবে কমিউনিস্টদের। এসব কথায় সঙ্গে বক্তন সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বীকার করে নিচ্ছেন তাঁর যৌবনের ভুল। যখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসাবে, বিদ্রোহী কবি হিসাবে নেহরু-গান্ধী কংগ্রেসকে নিন্দা ধিক্কার সমালোচনা করেছেন।
‘কমরেড আজ নবযুগ আনবে না? কুয়াসা কঠিন বাসর যে সম্মুখে/লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা/দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশংকুকে’ বা ‘চিমনির মুখে শোনো সাইকেল শঙ্খ গান গায় হাতুড়ি ও কান্তে,/ তিল তিল মরণে ও জীবন অসংখ্য/জীবন কে চায় ভালোবাসতে’- এসব কবিতার রক্তিম জীবনদর্শন কী কবি সুভাষকে ছেড়ে চলে গিয়েছে? গত রবিবার এ নিয়ে তাঁর বাড়িতে আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম। এসব কথায় ঈবৎ উত্তেজিত কবি সব প্রশ্নের জবাব দেননি। কিছুটা রাগ, খানিকটা বিরক্তি, খানিকটা ফিরে দেখার চেষ্টা- সব মিশিয়ে যা বলেছিলেন তাতে মনে হয় আদর্শ তাঁকে ছেড়ে যায়নি। পথভ্রান্তির চেতনা হয়েছে। ঐ কবিতাগুলির স্তবক তাঁর দীর্ঘজীবনের পথ-বিপথের মাইল স্টোন হয়ে আছে, থাকুক। সে প্রসঙ্গে খুব যেতে চান না আপাতত। একবার বললেন, যখন লিখেছিলাম, তখন ওইসব কথায় বিশ্বাস করতাম। আজ করি না। আবার আর একবার বললেন, পার্টি তখন যা বোঝাতো তাই বুঝতাম, তাই লিখতাম। নিজের চোখে দেখতাম না। আর একবার তো পরম বিরক্তি ভরে বলে উঠলেন, কবিতাটৰিতা নিয়ে আলোচনা ছাড়ো। ওসব কথায় যেতে চাই না।
সেদিন সাক্ষাৎকারের সময় আরও একটা কথা জানালেন ‘আমি এই প্রথম কংগ্রেসকে ভোট দেব। কংগ্রেসের জন্য নয়। দেশের কথা ভেবে। অনেকটা সেই চাঁদ সওদাগরের মতো অবস্থা আমার। বিপাকে পড়ে যাঁকে বাঁহাতে হলেও মনসার পুজো দিতে হয়েছিল।’ একই কারণে সুভাষবাবু এখন সকাল-সন্ধ্যায় কংগ্রেসের প্রচার সভায় বলছেন। এর মধ্যে অনেক প্রচার সভায় আচমন করার মতোই সভার শুরুতে বর্ষিত হচ্ছে কমিউনিস্টদের উপর গালিগালাজ। অনেক প্রচার সভা হয়েছে যেখানে সুভাষবাবুকে ‘মার্কসবাদী কবি’ হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেবার পরও অতুৎসাহী যুবকংগ্রেস তাঁরই সামনে মাইক্রোফোনে স্লোগান গর্জন করেছেন: বাংলার খেয়ে বাংলার পরে বাংলা মায়ের বুকের উপর লালগোলামি চলবে না। লাল হঠাও- দেশ বাঁচাও। মঞ্চে বসে থাকা কবির নিশ্চিতভাবেই তা প্রীতিকর লাগেনি।
সাক্ষাৎকারের সময়েও ও কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন দেশ তিনি বাঁচাতে চান সত্যিই তবে লাল হঠিয়ে নয়। লালেরাও থাকুক, দেশও টিকুক এবং লালদের নিরাপত্তার জন্যই কংগ্রেসের প্রয়োজন- এমন ধরনের একটা ধারণা হয়েছে সুভাষবাবুর। তবে সুভাষের কবিতার কোনো অনুরাগী পাঠক যদি কংগ্রেসের প্রচার সভায় মাথাভর্তি পাকাচুল, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় ঈষৎ অসুখের মলিনতা নিয়ে বক্তৃতায়ত কবিকে এক পলক দেখেন, শোনেন, তাহলে বছর চল্লিশ আগে সুভাষের লেখা ‘দীক্ষিতের গান’ কবিতাটিকে সে আবার একবার পড়ে দেখতে চাইবে। তাঁর মনে প্রশ্ন হতেই পারে, এই কী সেই কবি, বিনি লিখেছিলেন, ‘পালাবার পথে ধুলো এড়ানোর দঙ্গলে ভাই/ আমিও ছিলাম একজন:/ আজ প্রাণপণে ভাই/ ভীরুতার মুখে লাথি মেরে লাল ঝাণ্ডা হঠাই।” অবশ্য গঙ্গা আর ভলগার বুকের উপর দিয়ে যে অজস্র জল বয়ে গিয়েছে এই বছর চল্লিশে তাও তো কারও অজানা নয়। সুভাষবাবু অকৃতজ্ঞ নন। প্রতিটি জনসভায়, যেখানেই শুনেছেন কমিউনিস্টদের আদ্যশ্রাদ্ধ হচ্ছে সেখানেই বলছেন: ‘বলে নেওয়া দরকার মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাস আমার অটুট আছে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিও ঋণ রয়েছে। তাঁরাই আমাকে মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখিয়েছেন, মানুষের কাছাকাছি এনেছেন।’ কিন্তু কী জবাব দেবেন যুবকংগ্রেসের সেই কর্মীকে যে সেদিন লেক গার্ডেনসের জনসভায় সুভাষবাবুর বক্তৃতা শেষ হতেই বলে উঠলেন: ‘এতক্ষণ বক্তৃতা দিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। যাঁর কবিতা পড়ে বহু মানুষ মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়েছিল।’ অর্থাৎ কিনা এই যে দেখুন সেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে, যার জন্য বহু মানুষ মার্কসবাদী হয়েছিলেন, তিনি পর্যন্ত দেখুন, আজ আমাদের শিবিরে…।
ওই লেক গার্ডেনসের জনসভার কথাই বলা যাক। সুভাষবাবুর সঙ্গেই ওখানে গিয়েছিলাম গত রবিবার। সেদিন সকালেও তিনি ভোলা সেনের সমর্থনে কসবায় আর একটি জনসভা করেছেন। বিকেলে দুটি জনসভায় যাবার কথা ছিল কংগ্রেসপ্রার্থীদের সমর্থনে। একটি বেলেঘাটা, অপরটি লেক গার্ডেনসে। গাড়ি নিয়ে যাঁদের আসার কথা ছিল বেলেঘাটার জন্য তাঁরা এলেন না। আমাদের কথাবার্তার শেষে (যে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে) আমরা সন্ধ্যা পাঁচ-সাড়ে পাঁচটা নাগাদ লেক গার্ডেনসে গেলাম। রেল ক্রশিং পেরিয়েই বাঁদিকে পথসভা। বোধহয় প্রধানবক্তা ছিলেন সুভাষবাবুই। কবির বক্তৃতা, তবু শুনতে লোকের মোটে ভিড় নেই। বড়জোর জনা পঞ্চাশ লোক। এবং তাঁদের মধ্যেও কবির আগমনে যে বড় একটা চিত্তচাঞ্চল্য ঘটল এমনটা বলতে পারছি না। যেন অনেকেই এসেছেন নেহাৎই, দৈবাৎই। পলকা জ্যাকেট পরা, দাড়িদুড়ি ওয়ালা এক যুবক জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘দাদা ও কে? ভোলা সেন?’ ‘না, না। উনি কেন ভোলানাথ সেন হতে যাবেন, উনি তো বিখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়!” বলতেই তিনি কি বুঝলেন কে জানে, ‘ও কবি।’ এই বলেই অদৃশ্য হলেন।
সুভাষ তখনও মঞ্চে ওঠেননি। ফ্লাডলাইটের তলায় সারি সারি রাজীবের ছবি। তলায় ইন্দিরা। শ্লোগান অব্যাহত। এবং বলাবাহুল্য আতিশয্যে ভরা। যেমন ‘খলিস্তানের সমর্থক সি পি আই (এম) কে একটিও ভোট নয়।’ ‘রাজীর লাও দেশ বাঁচাও।’ এবং ‘হাত চিহ্নে ভোট দিন।’ ‘কংগ্রেসকে ভোট দিন।’ এ সেই সুভাষের কবিতার ‘জোড়াবলদের’ প্রতীক নেওয়া কংগ্রেস নয়। কমনীয় হাত। তবে ‘রাস্তার মোড়ে লালবাতি মেলে/ শকুনেরা দের সন্ধ্যে/ জোড়াবলদকে দেয়াল লটকে/ ঠোঁট চেটে বলে ভোট দো’ ‘ভেটি দে’ এ কথা নিশ্চয়ই কোনোদিনও কংগ্রেস বলেনি। তবে তখন কবির ক্রোধ ছিল, ঘৃণাও ছিল। আর রবিবার দুপুরে বললেন, ‘কংগ্রেস আর সেই রাজার ছেলে, আমীরওমরাও আর ক্যাপিটালিস্টদের কংগ্রেস নেই। পার্লামেন্টে এখন কংগ্রেসে অনেক মেঠো মুখ দেখা যায়।’ সুভাষবাবুর ওদিনের ওই বক্তৃতাটি বড় সুমার্জিত। কোনও উলঙ্গ গেস্টাপো চালিয়াতি নেই। জীবনের কিছু ঘটনা, কিছু ব্যক্তিগত বিশ্বাস, কিছু হৃলয়গত অনুভব- এর মধ্য দিয়েই কবির ধারণা হয়েছে দেশের সংহতি রাখতে কংগ্রেসই এখন এক এবং অদ্বিতীয়। তারা থাকলে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, পরমাণু বোমার খাঁড়া প্রতিনিয়ত ভর দেখাতে পারবে না। তিনিও এও বললেন পি এল ও নেতা ইয়াসের আরাফত সহ দুনিয়ার যত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে তাঁরা সবাই নাকি মনে করতেন শ্রীমতী গান্ধীর জয়, তাঁদেরই জয়। আগে যা বলতেন, এখন তা কেন আর বলেন না সেই প্রসঙ্গেও কথা বললেন সেদিন। তবে উচ্চ আশার কৈলাসে/ ধূলিসাৎ বটে সে বালখিল্য স্বপ্নরা;/ আজও হাসি তাও মুখভঙ্গির অভ্যাসে। দগ্ধ হহৃদয় হাওয়ায় মেলতে পথে ঘোরা’- না, এরকম কোনো পুরোনো বুলি মাছি তাড়াননি সেদিন। বললেন, আগে একরকম বলতাম, এখন আর এক রকম বলি। এ নিয়ে আমার সমালোচনা যাঁরা করছেন তাঁদের বলি, হ্যাঁ বদলেছি। পথের বদল হয়েছে। আস্তি হুচেছে। আদর্শের বদল হয়নি। বদলানোর পিছনে যথেষ্ট কারণ ছিল তাই বদলেছি। তারপর কয়েকটি ঘটনার কথা বললেন। যা তার স্বপ্ন বা মায়া মতিভ্রম ঘোচাতে সাহায্য করেছে। যার মধ্যে একটি হল কেরল সরকারে উৎখাত করা প্রসঙ্গে শ্রীমতী গান্ধীর উপর ছিছিৎকারী কমিউনিস্টদের মিথ্যাচার। সেদিনের সেই সাক্ষাৎকারের সময় অপ্রীতিকর কিছু মুহূর্ত ঘটেছিল। রাজনীতি বা কংগ্রেস বা নির্বাচন প্রসঙ্গে নয়, তার পুরোনো কবিতার সাম্প্রতিক ভেঙে পড়া ভিটেমাটি নিয়ে। তাঁকে প্রশ্ন করতে গিয়েছিলাম ‘পদাতিক’, ‘চিরকুট’, ‘অগ্নিকোল’, ‘ফুল ফুটুক’-এর সেইসব বিখ্যাত পংক্তিগুলিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে। ‘লেনিন, এঙ্গেলস, মার্কস নখাগ্রে আমার/ উত্তরাধিকার সূত্রে অন্যতম নেতা লক্ষ্য তাই মহাত্মার ধাম/ আনন্দ-ভবনে খুঁজি মুক্তির উপায়…’ বা ‘মানি অহিংসা, মেনেছি অসহযোগিতা;/ নায়ক অধুনা কংগ্রেসী মনোনয়নে/ সাহিত্য সখ, পড়ি না কষ্ট কবিতা/ শিবসুন্দর স্পষ্ট নির্মীল নয়নে’। প্রশ্ন করেছিলাম, কেমন মনে হয় এই সব শ্লেষ, বিরূপ- আজকের নতুন প্রেক্ষাপটে। সুভাষবাবু ক্রুদ্ধ স্বরে আনিয়েছিলেন, আমার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি নন তিনি।
লেক গার্ডেনসে, সভা শেষে, হাতে হাত রেখে ব্যস্ত কবি বললেন, দুপুরে অনেক কড়া কড়া কথা বলেছি। কিন্তু মনে কোরো না। বলে রওনা দিলেন যোধপুর পার্কে। আর এক জনসভায়। এক কবি, যিনি নিজেই বলেছিলেন নির্বাচন তাঁকে টানে না। ‘এক কবি/ যিনি পড়তেন চুপিচুপি। লম্বা মেঘের পাজামা- এক কবি/ ছিল আকাশটা তাঁর টুপি।। সমুদ্রে তিনি শুতেন।। কবিদের আছে আলাদা একটা জগৎ-/ স্বপ্ন যেখানে মাথা উঁচু করে বেড়ায়।’ সেই বালখিল্য স্বপ্নদের ফেলে পরিণত এক কবি এগিয়ে চলেছেন নতুন এক পথে। স্বপ্ন সেখানে মাথা উঁচু করে বেড়ায়?

২৩ ডিসেম্বর ১৯৮৪, আনন্দবাজার

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

বিভাগ – শহর পৌরাণিক অভিধানে যে কথাই লেখা থাকুক, বসফরাসের চালু তুর্কি অর্থগুলো সবই

বিভাগ – শহর সব ‘নতুন’-ই কোনও না কোনও দিন পুরনো হয়ে যায়। কলকাতার যেমন

বিভাগ – শহর স্মৃতির পাতায় কত কী যে গন্ধের দাগ। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের

বিভাগ – শহর সেই বার নেই সেই বারাঙ্গনারাও নেই। গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে দুটো-একটা পয়সা পেলে

বিভাগ – ব্যক্তিগত বড্ড মিস করি কলকাতায় আসা ইস্তক সুদেবদাকে। হুট করে রাগ করে

Scroll to Top