বড্ড মিস করি কলকাতায় আসা ইস্তক সুদেবদাকে। হুট করে রাগ করে চাকরি ছেড়ে দেওয়ারও তো বছর পনেরো হয়ে গেল। তবু সুদেব রায়চৌধুরীর কথা ভুলতে পারি না।
কত দিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। তবুও মনে হত কাছাকাছিই আছেন। যেন গেলেই হয়। লেক টাউনের কালিন্দীতে। করতে করতে হঠাৎ-ই একদিন কাগজে পড়লাম সুদেবদা নেই।
তিনি গ্রহান্তরে চলে গেছেন। সে বড় দূরের দেশ, গেলে তো আর কেউ ফেরে না। কে জানে কবে দেখা হবে ফের সুদেবদার সঙ্গে। জানি, দেখা হলেই বলবেন, “কী আশ্চর্য! এই মাত্র তোমার কথা হচ্ছিল। তোমার লেখার কথা। কী যে মিষ্টি তোমার লেখার হাত।”
এ রকমই বলতেন। ‘এই মাত্র তোমার কথা’, ‘মিষ্টি হাত’ এ সব কথায় বড় বড় আমলাদের মেজাজ ঘুরে যায়, আর আমি তো কোন ছাড়। যদিও জানি, ‘এই মাত্র’ কেন, গত দশ বছরে একবারও হয়তো আমায় নিয়ে কারও সঙ্গে তাঁর কোনও কথা হয়নি। যদিও জানি ‘মিষ্টি হাত’ কথাটা খুবই ডুবিয়াস সন্দেহজনক। নিন্দে না প্রশংসা, বোঝা দায়।
কিন্তু তাতে কী হয়? সুদেব রায়চৌধুরী, ততক্ষণে ‘মার দিয়া কেল্লা’। ঘাঘু রিপোর্টার তার প্রথম টেস্টে দশ-এগারো পেয়ে গেছেন। দ্বিতীয় পদক্ষেপ? আমারই সদ্য কেনা প্যাকেট-না-খোলা বেনসন হেজেসের মোড়কটি সযত্নে খুলে নিজে একটি নিয়ে অন্য আর একটি আমাকেই অফার করছেন: “নাও একটা সিগারেট ধরাও। কী এত ভাবো বলো তো সারাক্ষণ? শরীর-টরির সব ভালো তো? আর নির্মলদা-বউদি?”
শেষোক্ত দু’জন আমার পিতৃদেব ও মাতৃদেবী, দেশগ্রাম সুবাদে সুদেবদার ঘনিষ্ঠ। তার জেরে আমিও। আনন্দবাজারে চাকরি পাওয়ার প্রথম দিন থেকেই। সুদেবদা তখন অবশ্যই ডাকাবুকো নাম। চিফ মিনিস্টার থেকে চিফ সেক্রেটারি, ডি জি থেকে পুলিশ কমিশনার-সবারই কাছের লোক, দাদা কিংবা ভাই। সেটা আটের দশকের গোড়ার কথা।
ইতিমধ্যে যশস্বী সুদেব রায়চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কভার করেছেন, পদ্মায় সাবমেরিন ডুবিয়েছেন, মাদার টেরিজাকে (তখন জীবিত) নিয়ে বই লিখেছেন এবং প্রায় প্রতি মাসেই নানা মুখরোচক, উত্তেজক খবরাখবরে আনন্দবাজার মাতাচ্ছেন। খবর বলতে লোকে বুঝত কাগজের খবর। তখন সরকারি টিভি চ্যানেলে খবর বলে যা পরিবেশন করা হত তা নিছকই সরকারি দাতব্যের হ্যান্ডআউট বা দাড়িওয়ালা পঙ্কজ সাহার মাতব্বরি। তাঁর সব প্রোগ্রামেই তিন-চারটে নাম: সুনীল, নীরেন, পবিত্র বা নবনীতা। তা সে সংস্কৃতির অবক্ষয় হোক বা গ্রামাঞ্চলে ধানিজমিতে মাজরা পোকার উৎপাত হোক। এক্কেবারে নীরস, নিরেট সেই সব খবর, ইন্টারভিউ।
এই পরিবেশে বাংলা খবরের কাগজের চটকদার, খচমচে ভাষা, রসালো গুল-গল্প যে পাঠকের মন ভরিয়ে রাখবে, তাতে আর সন্দেহ কী? এক দিকে বরুণদা মাতাচ্ছেন তাঁর প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার রণদামামায়, অন্য দিকে সুদেবদার দলবল সরকারি কেচ্ছা, প্রেম-ধর্ষণ-বৈরাগ্য-স্বদেশিয়ানার পাঞ্চ খাইয়ে চলেছেন পাঠকদের।
আর হ্যাঁ, আরও একটা জরুরি উপাদান তখন খবরের এক্সক্লুসিভিটি-যে দামেই হোক। তাতে ঝুড়ি ঝুড়ি গপ্পো মিলুক ক্ষতি নেই, গল্পটা যেন একান্তই ওই কাগজেরই হয়। সেই এক্সক্লুসিভিটির নেশা ছিল সুদেবদারও। নিশ্চয়ই অন্য রিপোর্টারদেরও ছিল। তবে নেশা থাকলেই তো হল না। সবার অত দম কোথায়? যা সুদেবদার ছিল।
যে কারণে শ্মশানে শায়িত প্রয়াত উত্তমকুমারের মরদেহের উপর কান্নায় আছড়ে পড়া তাঁর সদ্য বিধবা স্ত্রী গৌরীদেবীকে টেনেটুনে সোজা বসিয়ে ইন্টারভিউ করতে সুদেবদার দ্বিধা হত না। আর সব কিছু বাদ দিলেও, সে টানাটানি যে বড় সহজ কাজ নয়, বিপুল স্থূলাঙ্গিনী গৌরীদেবীকে যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা সব্বাই জানেন। কিন্তু “যাঁহা চলে বয়েলগাড়ি ওয়াহা যায় মারোয়াড়ি” মতো “যেখানে খবর, সেখানেই সুদেব।” এবং যে কোনও দামেই খবরকে হাতছাড়া না করতে, পাঁচজনের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা না করতে অনমনীয় ছিলেন সুদেবদা। ওই ‘এক্সক্লুসিভিটি’র জন্য। একই কারণে সেদিন তুরন্ত গৌরীদেবীকে শ্মশানে শায়িত প্রয়াত উত্তমের কাছে ফের “শুইয়ে দিতে” বলেছিলেন কনিষ্ঠ সহকর্মীকে-“দেবাশিস শুইয়ে দাও, পিছনে “যুগান্তর”।
এই ছিলেন সুদেবদা। যাঁর গল্প শুরু করলে শেষ করা যায় না। যাঁর জন্য ‘আনপুটডাউনেবল’, ‘ইনইমিটেবল’, ‘ইররেজিস্টেবল’ ইত্যাদি কোনও বিশেষণই যথেষ্ট নয়। যাঁর সঙ্গে দু’-চার মিনিট কথা বললেই মনে হত খবরের কাগজে বোধ হয়, “সেই সত্য যা লিখিবে তুমি।” কোথাও কোনও দুর্ঘটনায় চারজন মারা গেলে, কাগজের রিপোর্টার যে সেটাকে চার দিয়ে গুণ করে দেবেই, কোথাও বন্যার জল পায়ের পাতা ডোবালে রিপোর্টার যে তা গলা পর্যন্ত টেনে বাড়িয়ে দেবেই, কোথাও পুলিশে-মানুষে খণ্ডযুদ্ধ হলে, রিপোর্টার যে চতুর্দিকে “চাপ চাপ রক্ত” দেখতে পাবেন, শুনতে পাবেন “ঝাঁকে ঝাঁকে” গুলির আওয়াজ, সে সব আমরা বুঝেছি সুদেবদার কাছ থেকে।
অবশ্য সুদেবদা একলা নন। অন্তত যুদ্ধটা যখন বাংলাদেশের তখন সবই সম্ভব। শোনা কথা, কলকাতার এক ইংরেজি কাগজেও নাকি লেখা হয়েছিল, “সোর্সেস ক্লোজ টু দ্য এনিমি ক্যাম্প।” অর্থাৎ পাক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ কেউ খবরটা দিয়েছেন ভারতের সাংবাদিককে। সুদেবদাকে নিছক আকাশ থেকে খসে পড়া উল্কা বলা যায় না। একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তাঁরও ছিল।
তবে বৈশিষ্ট্যে তিনি স্বভাবত স্বতন্ত্র। মনে আছে, বীরভূমের বন্যায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি প্লাবিত-এই ধরনের একটা খবর করেছিলেন একবার। সে খবর যে ঠিক নয়, একেবারেই নয়, এই মর্মে পরদিনই ফোন এসেছিল বীরভূমের তদানীন্তন এম পি কালী ব্যানার্জির কাছ থেকে। সুদেবদাকে কী বলছেন তা তো আমরা বুঝতে পারছি না, শুনছি কেবল ‘হুঁ, হ্যাঁ করছেন। শেষে টেলিফোন রেখে দেওয়ার আগে সুদেবদার যাকে বলে যাত্রার নায়কের মতো অট্টহাসি: “হাঃ হাঃ হাঃ! এ রকম তো হয়েই থাকে। এই তো জীবন, কালীদা… হাঃ হাঃ হাঃ।”
শেষ কথাগুলো ‘সাগিনা মাহাতো’-র ডায়লগ। গৌরকিশোর ঘোষের উপন্যাস নিয়ে এ ছবিটা বানিয়েছিলেন তপন সিংহ। দিলীপকুমার, সায়রা বানু হিরো-হিরোইন। খুব চলেছিল ছবিটা। সাগিনার রোলে দিলীপকুমারের বলা এই ডায়লগ তখন কলকাতার বাসে-ট্রামে, কার্তিকের চায়ের দোকানে আর ভোলাদের রকের আড্ডায় গেড়ে বসেছে। সব বাদ-প্রতিবাদ, সব তর্ক নস্যাৎ করে এই ‘সেন্স অফ হিউমার’। এই হালকা হাসি।
হাসি আর নাটক নিয়ে বাঙালি। সেই বাঙালিরই আর্কিটাইপ সুদেব রায়চৌধুরী। মনে আছে, আমাদের সহকর্মী বন্ধু তুষার যাবে অ্যাসাইনমেন্টে কলম্বোয়। সেই প্রথম ওর বিদেশ যাত্রা, পাসপোর্ট চাই জলদি জলদি, হাতে একদিনও সময় নেই। সুতরাং, সহায় সুদেবদা। কলকাতার পাসপোর্ট অফিসের সব আমলাই যাঁর করতলে। সুদেবদা নিয়েও গেলেন ওকে পাসপোর্ট অফিসে। বড্ড তাড়া আছে শুনে অফিসার আমলাসুলভ গাম্ভীর্যে বলেছিলেন, “ঠিক আছে। এই ফর্মটা ফিল আপ করে কাল সকালে আসবেন। পুলিশ এনকোয়্যারিটা যাতে যত তাড়াতাড়ি করানো যায়…”, কথা শেষ করতে পারেননি তিনি। কেননা, ততোধিক সিরিয়াস মুখ করে সুদেবদার জবাব, “কাল তো ও আসতে পারছে না… সরি দাদা… কাল তো ওর একটু অসুবিধা আছে।”
কেন, কেন, কেন? অফিসারমশাই বোধ হয় একটু অবাকই। এত যার তাড়া, তার অন্য কীসের অসুবিধে?
“না, কাল তো… হি উইল বি ইন কলম্বো টুমরো… কাল ও আসতে পারবে না। সরি…”
কী বুঝলেন? কিছু কি বুঝলেন? ধন্দে পড়ে যাচ্ছেন তো? যে কলম্বো যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট, সেই কলম্বোতে কাল চলে যাওয়ার জন্য তুষারের পাসপোর্ট নিতে আসা হবে না! এ কি হয়? হ্যাঁ, হয়। সুদেবদা থাকলে সবই হয়। হয়েছিলও। পরদিনই তুষার কলম্বো গেল। তবে সেই পাসপোর্ট নিয়েই। অফিসারমশাই ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই করে দিয়েছিলেন।
কী বললেন? বাড়িয়ে বলছি? ধরে ফেলেছেন? আর কী… এই তো জীবন কালীদা…হাঃ হাঃ হাঃ।
প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, ১৮ জুলাই ২০০৮, একদিন লাইভ