বিভাগ - সমাজ

মস্কো কোথায়? লেনিন কোথায়? সোভিয়েত ইউনিয়নে? সোভিয়েত ইউনিয়নই তো নেই। গত সত্তর বছর ধরে ভূগোলের মানচিত্রে লাল রঙে রাঙানো ওই অখণ্ড এলাকার এখন অজস্র রন্ধের না। আলাদা আলাদা নাম। আলাদা আলাদা জমি। লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, ইউক্রেন, বাইলোরশিয়া, মোলদাভিয়া, আজেরবাইজান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজিস্তান। তা হলে হাতে রইল কী? হাল্কা প্রসঙ্গ হলে জবাব ছিল, ‘কেন, পেনসিল?’ কিন্তু এটা হাঝ প্রসঙ্গ নয়। মক্কা বলুন, মোক্ষ বলুন- মস্কো ছিল আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সদর দফতর। উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ভারতের পলিটব্যুরোগুলির পখনিদের্শক। মস্কোয় বরক পড়লে এখানে ওভারকোট চড়াও- এই ছিল অ-কমিউনিস্ট রসিকতা। পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বাম-আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। তাঁদের কী হবে এখন? কী মনে করছেন তাঁরা? ‘শেষ যুদ্ধ শুরু আজ’, নাকি ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’? ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ বলে যাঁরা কাব্যি করছেন’, তিরাশি বছরের বৃদ্ধ হীরেন মুখোপাধ্যায় তাঁদের পছন্দ করেন না। গান্ধী, নেহরু, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থের লেখক বিদ্বান এই সি পি আই-সদস্য অবশ্য স্বীকার করে নিলেন, ‘এর ফলে ইতিহাস অন্তত পঞ্চাশ বছর পিছিরে গেল।’ ইতিহাস বলতে হীরেনবাবু অবশ্য এখনও সমাজতন্ত্রের অগ্রগতিকেই বোঝেন। তাই ইতিহাসের এই ‘পিছু হটা’-র জন্য তিনি ভীষণ ক্রুদ্ধ গোরবাচভের উপত্রে ‘ওই লোকটার জন্যই এ-সব হল। পেরেস্ত্রৈকা আর গ্লাসনন্তের নামে ও কাউন্টার-রেভলিউশন করেছে-সাম্রাজ্যবাদের মদতে।’ আর ইয়েলৎসিন? তাঁকে হীরেনবাবু মানুষের মধ্যেই ফেলেন না, ‘একটা নিরক্ষর, দুর্বৃত্ত, মাফিয়া টাইপের লোক’ বলে মনে করেন। তাঁর বক্তব্য : ‘কমিউনিস্ট পার্টিতে ওরা এসেই সব নষ্ট করল। ওই লোভী লোকগুলো।’ কিন্তু অম্লান দত্তের প্রশ্নটা এইক্ষেত্রে আরও মৌলিক। হীরেনবাবু ওই কথা বলেছেন শুনে অম্লানবাবু বলেছিলেন, ‘হতে পারে, লোভই এই ঘটনার জন্য দায়ী। কিন্তু লোভগুলো এল কী করে? যতদিন দরজাজানালা বন্ধ করে লেখানো, পড়ানো চলছিল, ততদিন কারও মনে লোভ ছিল না। আর যেই বাইরের আলো ঢুকল অমনি মানুষগুলো নষ্ট, লোভী হয়ে গেল, কী করে?’ আসল কথা, অম্লানবাবুর মতে, গোলমালটা ওই আদর্শ এবং তার প্ররোগের শুরুর দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ‘মানুষ তো আর আজই স্বপ্ন দেখছে না, হাজার হাজার বছর ধরেই দেখছে। কিন্তু স্বপ্নটা ভাঙে তখনই, যখন চটজলদি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রাপ দেওয়ার চেষ্টা হয়। যে-কারণে মার্ক্সবাদ। মানুষের মুক্তির কথা তো আর মার্ক্স একলা নন, আরও অনেকেই বলেছেন। মার্ক্স যেখানে মার্ক্স হয়ে ওঠেন, সেটা ওই মানববাদ নয়। তিনি মার্ক্স, কেননা তিনি সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের কথা বলেন, শ্রমিক-শ্রেণীর প্রভুত্বের কথা বলেন।’ অম্লানবাবুর মতে, ভুলের বীজ সেখানেই। একটা বিশেষ সম্প্রদায়, সঙ্ঘ, জাত, জাতির অগ্রাধিকার যে-কারণে হিটলারের জন্ম দেয়, মৌলবাদের জন্ম দেয়, সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়। ওখান থেকেই ভুলের শুরু। তার পরে, লেনিন। লেনিন কী প্রমাণ করলেন? অম্লানবাবুর মতে, লেনিন এটুকু প্রমাণ করতে পারলেন যে, হিংসার পথ ধরে ক্ষমতা দখল করা যায়। কিন্তু তাতে ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে চলে আসবে না, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হবে না- এটা প্রমাণ হল কী? ফলে, আজকের এই ঘটনা। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ থেকে দলের অধঃপতন, যার জন্য মানুষ ওই দলকে আর নিল না। অম্লানবাবু তো এমন কথা বলবেনই: চিরদিনই তো বলে এসেছেন, এ আর আজ নতুন কী- নিশ্চয়ই অনেক সমাজতান্ত্রিক এখনই এই মন্তব্য করবেন। সেই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার যে, ‘মার্ক্সবাদের এই চরম নিন্দুক’-এর এই সব কথাবার্তার সঙ্গে এই মুহূর্তে কিন্তু বহু বুদ্ধিজীবীও একমত। অনেকেরই বক্তব্য জায়গায় জায়গায় আজ অম্লানবাবুর সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। হ্যাঁ, বক্তব্যের ভঙ্গিটা অন্যরকম হতে পারে, মূল্যবোধের গোড়াটা অন্য হতে পারে। যেমন, অমিয় বাগচি। সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এই অর্থনীতিককে তো অম্লানবাবুর বিপরীত প্রান্তের মানুষ বলা যেতে পারে নির্দ্বিধায়। রাশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পিছনে কোনও চক্রান্ত আছে কি না জানতে চাইলে তিনিও বলেছিলেন যে, এই ব্যাপারে ‘রাষ্ট্রাশ্রয়ী সমাজতন্ত্রের দুর্বলতাকে মুছে দেওয়া যার না।’ তাঁর মতে, ‘শুধু চক্রান্তের দোহাই দিরে লাভ নেই। ভিতরের থেকে ঘুণ না-ধরলে শুধু বাইরের নাড়ায় ইমারত ধসে পড়ত না।’ এবং শুধু অমিয়বাবুই নন, বামপন্থী তাত্ত্বিক রাজনীতিক অসীম চট্টোপাধ্যায় (কাকা), সাতের দশকের বিপ্লবিনী লেখিকা জয়া মিত্র, সমাজসচেতন কবি শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী- ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি ভিন্ন বিশ্বাস থেকে কথা বলেও এঁরা প্রায় সকলেই এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এই প্রসঙ্গে। তবে বিশ্লেষণের ভঙ্গিতে স্বভাবতই স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। পর্যটক হিসাবে রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ঘুরে সুনীলের মনে হয়েছিল, ‘ওই ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্নীতিতে ভরে গিয়েছিল। ও আর চলতে পারত না।’ অমিয় বাগচির মতে, এরজন্য বহুলাংশে দায়ী ব্রেজনেভ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা। ওদের আমলেই কমিউনিস্ট পার্টি এবং দেশের সংযোগ আরও বেশি শিথিল হয়ে যায়। নচেৎ ক্রুশ্চেত অবধি যে-পরিবর্তন আসছিল, সেটা ঠিক দিকেই যাচ্ছিল। জয়া মিত্র অবশ্য মনে করেন, ক্রুশ্চেভের আমলেই এই রোগের শুরু- ‘ক্রুশ্চেত ও তাঁর সংশোধনবাদ’। তারপর আজ যা হয়েছে, সেটা জয়ার কাছে নিতান্তই ‘ফর্ম আর কনটেন্ট’-এর প্রশ্ন। এত যে জটিলতা আর তত্ত্বের অভিনবত্ব ঘটেছে আজ, এমনকি মার্ক্সবাদেও, সেই বিষয়ে অয়ার বোধহয় খুব অভিজ্ঞতা নেই। তিনি সহজ যুক্তি, সহজ সিদ্ধান্তেই থাকতে চান, মনে হয়। ‘কনটেন্টই তো আগে বদলায়,’ বলেছিলেন তিনি।
এই পরিবর্তনটা তাই তাঁর কাছে ‘অস্বাভাবিক’ লাগেনি। ‘এত নাটকীয়ভাবে হবে,’ তা অবশ্য তিনি জানতেন না। ‘কিন্তু প্রথম পা ফেলা থেকেই তো কোথায় যাওয়া হবে’, বোঝা যায়। সুতরাং এটা হবে, এ তো জানা কথা। আর প্রাক্তন নকশাল নেতা অসীম চট্টোপাধ্যায়ের কথা হল, ‘এ বিপর্যয় তো সে-দিন থেকেই জানা ছিল, যে-দিন থেকে পুঁজিবাদী দাওয়াই দিয়ে গোরবাচেভসমাজতন্ত্রের রোগ সারানোর চেষ্টা করছিলেন।’ অত ‘তত্ত্বের কচকচানিতে না-গিয়ে’, গোরবাচেভকে অত দোষারোপ না-করেও অমিয় বাগচির কিন্তু এটা আগেই মনে হয়েছিল, ‘বাজার-নির্ভর অর্থনীতি সম্পর্কে ‘গোরবাচেভের বিশ্বস্ত পরামর্শদাতাদের বহু ভুল ধারণা আছে’।
কিন্তু তা বলে রাশিয়ায় স্বাগত গণতন্ত্র এবং বিদায় সমাজতন্ত্র? না, এ-কথা বলতে নারাজ এঁদের অধিকাংশই। যাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন, যেমন ঐতিহাসিক অশীন দাশগুপ্ত, বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁদের মধ্যেও একটা অস্বস্তি, একটা বেদনার ভাব দেখা যাচ্ছে। যে-হেতু ‘এখনও সঠিকভাবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না’ বলে মনে করেন অধীনবাবু। ‘অবাধ নির্বাচন, মানুষের অধিকার, সংখ্যালঘুদের রক্ষার ব্যবস্থা’ নিয়ে সেই দেশে কী হচ্ছে, তা জানেন না অধীনবাবু।
সুনীলও জানেন না। সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয়ে তিনি ব্যথিত। তাঁর মতে, ‘একটা আদর্শ হিসাবে, স্বপ্ন হিসাবে সমাজতন্ত্র তো ভালই ছিল। জাত থাকবে না, ধর্ম থাকবে না…।’ তা-ছাড়া আদর্শ সমাজতন্ত্র না-হয় হয়ে উঠল না। আদর্শ গণতন্ত্রও হয়েছে কি? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তো এটাতেও সন্দেহ। এবং সন্দেহ নয়, অমিয় বাগচির এটা পাকা সিদ্ধান্তই।
তাই এঁদের অধিকাংশের মতে, ধারণা হিসাবে, আইডিয়া হিসাবে, সমাজতন্ত্রকে নাকচ করে দেওয়ার প্রশ্ন এত তাড়াতাড়ি আসে না। এই বিশ্বাস কট্টর কমিউনিস্ট হীরেন মুখোপাধ্যায়েরও ‘দু’দশ বছর কেন, সমাজতন্ত্রের জন্য একশো, হাজার বছরও লেগে যেতে পারে।’ তেমনই জয়া মিত্রের মতে, ১০/১৫ বছর নষ্ট হওয়াটা কিছু নয়। প্রায় একই কথা বলেন অসীম চট্টোপাধ্যায় ‘কনটেন্ট হিসাবে সমাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে তো লাভ নেই।’ সুতরাং এই ব্যর্থতার বা এই বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে অসীমের চটজলদি উত্তর: ‘দল ও সাধারণ মানুষের যোগাযোগের অভাব। বা মাও-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বের রূপ দিতে না-পারা।’ শঙ্খ ঘোষ এই ব্যবস্থা এবং এই তত্ত্বের ‘প্রয়োগের মধ্যে’ সমালোচনার যে-জায়গা ছিল, যোগ্য সময়ে যোগ্যভাবে তার মীমাংসা না-করাটাকেই গুরুত্ব দেন। হীরেনবাবুর মতে, ‘এটা আদর্শের প্রয়োগে ল্লখতা। দেশের প্রতি, দেশবাসীর প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকদের ভালবাসার অভাব।’ কিন্তু বিসমিল্লায় গলদ কি নেই? একবার মাত্র অসীম চট্টোপাধ্যায়ই বলেছিলেন, ‘পরিকল্পিত অর্থনীতি শ্রমিক-শ্রেণীকে কেন মোটিভেট করে না, এটা ভাববার কথা।’ সেই তত্ত্ব নাকচ করে দিয়েছেন অমিয় বাগটি। বলেছেন, ‘ওটা বড় কথা নয়। পরিকল্পিত অর্থনীতি, সব দেশেই থাকে। এমনকি জাপানেও আছে।’ আর অসীমের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তত্ত্ব? অমিয়বাবুর মতে, ‘যে-কোনও সমাজেই সমাজব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সারাক্ষণ আলোচনা জিইয়ে রাখা উচিত। নইলে সেই সমাজব্যবস্থায় বঙ্গধরনের খুণপোকা বাসা বাঁধে।’ অতএব পথের শেষ কোখায়, তা নিয়ে কোনও তর্ক নেই। কেন না, এঁদের অধিকাংশই বিশ্বাস করেন, সমাজতন্ত্রের পথে আলো জ্বেলে ও-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে। বহুদিন পরে হোক, বহু দূরের মনে হতে পরে। কেন না এখন এঁদের অনেকেই সেই বয়সে পৌঁছেছেন, যেখানে ‘দূরেরটাই বিলক্ষণ স্পষ্ট, শুধু কাছেরটাই ঝাপসা দেখায়’। তাই দূর-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রায় সকলেই নিশ্চিত। প্রশ্ন কেবল এই যে, এই মুহূর্তে কী হবে? নারী-মুক্তি আন্দোলনের কী হবে? সমাজতন্ত্র এবং নারী-বাদকে যাঁরা হাতে হাত মিলিয়ে চালাতে চান, তাঁরা কী করবেন? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেনস স্টাডিজ’ বিভাগের প্রধান যশোধরা বাগচির উত্তর: ‘একটা শূন্যতার তো জন্ম হলই। নারী-বাদী আন্দোলনকে আর একটা বাড়তি দায়িত্ব নিতে হল। একটা বাড়তি ভূমিকা।’ যশোধরা বিশ্বাস করেন, সহজ অর্থে না-হলেও, ‘সমাজতন্ত্র এবং নারী-মুক্তি আন্দোলন একে অন্যের পরিপুরক’। হ্যাঁ, বন্দু আছে নিশ্চয়ই, ‘তবে তা নারী-বাদীকে সতর্কিতই করে দেয়।’ কেন না, নারী-বাদী আন্দোলনের তো ‘একটা প্রবণতা আছে- পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করতে গিয়ে পুরুষবেই প্রধান শত্রু ভাবার।’ সেখানেই সমাজতন্ত্রের ভূমিকা- প্রধান শত্রু চিনতে শেখানোয়। কার্যত যা নারী-বাদী আন্দোলনকে সাহায্য করে বলে যশোধরা মনে করেন। না, একেবারেই মনে করেন না জয়া। তিনি মনে করেন না, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নারী-বাদের আলাদা কোনও ভূমিকা আছে। ‘আমি নারী-বাদে বিশ্বাসই করি না। মার্ক্সবাদে ওরকম কোনও আলাদা আন্দোলনের সুযোগ নেই’-বলে দিলেন জয়া- ‘গাল’ খাবেন জেনেও। তো, সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয়ে ভারতের কী হবে? তৃতীয় বিশ্বের? ‘কী হবে আবার কিচ্ছু হবে না’, আবার তাঁর চাঁচাছোলা মন্তব্য। কেন, কেন, কেন? এত লোক এই নিয়ে ভাবছেন। এই হবে, ওই হবে, তা-ই হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন? ‘ও-সব যা ক্ষতিটতি সে তো রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষতি। তাতে ভারতের কী? তাতে ভারতের সাধারণ মানুষের কী? তৃতীয় বিশ্বেরই বা কী?’- বললেন জয়া। তাই ও-সব ক্ষতি-লাভের অঙ্ক নিয়ে জয়া মাথা ঘামাচ্ছেন না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কিছু দুঃখ, কিছু বেদনাবোধ তো হচ্ছেই। ‘লেনিনের মূর্তি, লাল পতাকার অপমান’ দেখে। কেননা, লেনিন (বা লালপতাকা) এখনও জয়ার কাছে ‘স্পার্টাকাসের মতো’। নিপীড়ন শোষণের প্রতিবাদের প্রতীক। বেদনার্ত জয় গোস্বামীও। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর ‘একটা নিরুচ্চার রোমান্টিক প্রেম’ যে ছিল, সেটা অস্বীকার করেন না। এখনও আছে। এখনও তাঁর বিশ্বাস হয় না যে, সমাজতন্ত্র মুছে যাবে। মায়াকভস্কি, বাংলার বিষ্ণু দে বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও কিন্তু এমনভাবেই শুরু করেছিলেন। ক্রোধে, প্রতিবাদে, কবিতায়। জয়ের এই তিন প্রিয় কবির তা হলে ওরকম হল কেন? প্রথম জন তো আত্মহত্যাই করলেন। ‘লম্বা মেঘের পাজামা’ পরা কবি সুভাষ তাঁর মাথা উঁচু করে তোলা স্বপ্নের জগৎ থেকে ছিটকে সরে এলেন, আলিন-হিটলারের বন্ধুত্বে প্রিয়মাণ বিষ্ণু দে বলে উঠলেন, ‘সহে না সহে না আর জনতার জঘন্য মিতালি।’ এই সব তবে কেন? ‘আমি এত সব চিন্তা করিনি, বিশ্বাস করুন’- জয় বলে দিলেন- ‘দুঃখী মানুষের মুখচোখ, তাদের গল্প আমাকে কষ্ট দেয়। ওদের অনেককে চিনিও। খুব কাছের থেকে, তাই।’ জানি। ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’-এর সেই কালো মেয়েটার গল্প তো? শহর থেকে বেড়াতে আসা, লেখাপড়ার ভাল বেণীমাধবকে দেখে যার ‘কুঞ্জে অলি গুঞ্জে’। করুন না বাবা দোকানে কাজ। সেই ব্যর্থ প্রেমে শিষ্ট কালো মেয়েটা, যার নষ্ট বোন কোথায় চলে গিয়েছে। ‘আমি এখন এই পাড়ার সেলাই দিদিমণি/ তবু আগুন, বেণীমাধব আগুন জ্বলে কই? কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?’ কিন্তু এই মেয়েটার জন্য কান্না পায় না, এমন মানুষ কে আছে? ‘মানুষ’ মানে ‘মানুষ’। ফানুস নয়। মূর্তিও নয়। ‘মানুষ মানে যার উপরে বিশ্বাস হারানো, রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘পাপ’। সভ্যতার সঙ্কটেও।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, আনন্দবাজার

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

বিভাগ – শহর পৌরাণিক অভিধানে যে কথাই লেখা থাকুক, বসফরাসের চালু তুর্কি অর্থগুলো সবই

বিভাগ – শহর সব ‘নতুন’-ই কোনও না কোনও দিন পুরনো হয়ে যায়। কলকাতার যেমন

বিভাগ – শহর স্মৃতির পাতায় কত কী যে গন্ধের দাগ। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের

বিভাগ – শহর সেই বার নেই সেই বারাঙ্গনারাও নেই। গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে দুটো-একটা পয়সা পেলে

বিভাগ – ব্যক্তিগত বড্ড মিস করি কলকাতায় আসা ইস্তক সুদেবদাকে। হুট করে রাগ করে

বিভাগ – ব্যক্তিগত অভিনয়ে উত্তমকুমার, আর সাংবাদিকতায় বরুণ সেনগুপ্ত। আশির দশকের গোড়া পর্যন্ত এটাই

Scroll to Top