আগুন লাগার বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই হাজির হয়েছিলেন চান্সেলর হিটলার। এবং সঙ্গে ক্যাপ্টেন গোয়েরিং, ডক্টর গোয়েব। জার্মানি, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩ সাল। সংসদ ভবন ‘রাইখস্ট্যাগে’ আগুন লেগেছে রাত নটা চল্লিশ। ভিতরের হলে তখনও পোড়া গন্ধ, ধোঁয়া এবং আগুন। সদলবলে ভিতরে ঢুকে কয়েক মিনিট স্থির তাকিয়ে রইলেন ফুয়েরার।
‘এটা একটা দৈববাণী। যদি এ আশুন, আমার যেমন বিশ্বাস, কমিউনিস্টদের কারসাজি হয় তা হলে এই নরকের কীটদের আমরা ধ্বংস করব লৌহমুষ্টিতে। কোনও কিছুই আর আমাদের থামিয়ে দিতে পারবে না।’ কথাগুলো বলার সময়ে হিটলারের চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। ‘ডেইলি এক্সপ্রেসে’র রিপোর্টার জানাচ্ছেন, ‘ক্যাপ্টেন গোয়েরিং-এর চোখে-মুখেও একটা রক্তিমাভা, উত্তেজনা’।
নাকি সর্বনাশের নেশা? ‘আগুন’ শব্দটার সঙ্গেই তো সারাক্ষণ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে নেশা কথাটা। নেশা এবং রহস্য। কে আগুন লাগিয়েছিল রাইখস্ট্যাগে? ভান ডের লুব নামের সেই ডাচ কমিউনিস্ট? না নাৎশিরা নিজেরাই? আনো দোমিনি ৬৪-তে নিরোর রোমে আগুন লাগল কী করে? নিছকই দুর্ঘটনা? নাকি নিরোরই চক্রান্ত? হিটলার জীবনীকার অ্যালান বুলক জানিয়েছেন, ‘রাইখস্ট্যাগে আগুন তারাই লাগিয়ে থাকতে পারে, ও আগুনে যাদের লাভ’। রোমের আগুনে নিয়োরও কি কোনও লাভ হয়েছিল? রোম নগরীর ঐতিহাসিক (আনাল) লেখক তাসেইভাসের বিবরণ অনুযায়ীও আগুন নিরোর কুচক্রান্তেও হতে পারে। আবার হতে পারে কারও অন্যমনস্কতার পরিণতি।
তবে আগুন লাগার সময়টাতে নিরো শহরে ছিলেন না। তাসেইতাস জানিয়েছেন, নিরো যখন ফিরলেন, শহরের প্রধান চক্কর থেকে আগুন হাওয়ায় হাওয়ায় শান্ত সুপ্ত প্রাসাদের কাছাকাছি এসে গিয়েছে। রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগার সময়েও তো হিটলার সেখানে ছিলেন না, থাকবার কথাও নয়। যখন এলেন, ভিতরে ঢুকলেন, দমকলকর্মীরা তখনও আগুন নেভাতে ব্যস্ত। ‘হের চান্সেলর, ঝাড়লণ্ঠনটা যে কোনও সময়ে ভেঙে পড়তে পারে’-এক পুলিস অফিসার সাবধান করে দিল। হিটলার ভ্রূক্ষেপ করেননি।
সেদিন রাতে কি হিটলারের ঘুম এসেছিল? নাকি জেগেছিলেন? কেমন জাগা? বিষণ্ণ, উদ্বিগ্ন? না কি উত্তেজনা? ক্ষমতার শিখরে ওঠার উত্তেজনা? হতেই পারে। ওই রাইখস্ট্যাগের আগুন থেকেই তো তাঁর আত্মপ্রতিষ্ঠা।
জনগণের প্রিয় ‘ফুয়েরার’ হয়ে ওঠা। রণরক্ত সফলতা সত্য বলে প্রমাণিত হল। তবে শেষ সত্য কি? এগারো বছর পরে চলে আসি। শার্লমানের শহর আখেন (তখন জার্মানিতে)। অক্টোবর, ১৯৪৪ সাল। মিত্রশক্তির ক্রমাগত বোমা। বোমার আগুন। নগরীর আকাশে ছাই। পোড়াকাঠ, পোড়ামানুষ, পোড়াবাড়ি। মিত্রশক্তির হাতে প্রথম পতন হল এই জার্মান শহরের। অবরুদ্ধ বাসিন্দারা আত্মসমর্পণ করতে এসে কেঁদে ফেললেন মিত্রশক্তির বাহিনীর কাছে। ‘আরও আগে এলেন না কেন? ওই (গেস্টাপো) গুণ্ডাগুলোর হাত থেকে আরও আগে বাঁচালেন না কেন?’ ফুয়েরার থেকে শুণ্ডার সর্দার? এরই নাম কি আগ্নেয়গিরির শিখরে পিকনিক? নাকি আগুন নিয়ে খেলা?
খেলা যখন, ঝুঁকি তো থাকবেই। যত ঝুঁকি ততই তো মজা। যত সজা ততই নেশা। দাঁতাল শুয়োর, বিষধর সাপ, বুনো ষাঁড়-এর সঙ্গে লড়াই-এ তাই এত বাজি, এত জুয়ো। আগুনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেছেন কখনও? কেমন নেশা ধরে যায় না? প্রাসাদে ফিরে ভোগী কামুক নিরোর চোখেও তো নেশা ধরতে পারত ওই অগ্নিবন্যার ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যে। গুজব তো রটেই গিয়েছিল যে, আগুন পোড়া রোমের সঙ্গে প্রাচীন ট্রয়নগরীর ধ্বংসের তুলনা করে গান বাঁধছিলেন নিরো তখন। নিরোর-ও কি ঘুম এসেছিল সে রাত্রে?
জর্জ বুশ অবশ্য ঘুমোতে পারেন। দিব্যিই। সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেনও। সাদ্দাম হুসেন পারেন কি না আমরা জানি না। অন্তত প্রকাশ্যে এসব কথা তিনি বলেননি। আর সজ্জা, কে না জানে, একটি সেকেলে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এবং আগুন কোনও লজ্জার আবরণ রাখতে চায় না। সত্যি-মিথ্যে-ন্যায়-অন্যায়ের বালাইও আগুনের নেই? জতুগৃহের গল্প মনে নেই? পঞ্চপাণ্ডব যে আগুন থেকে আত্মরক্ষা পেলেন, পুড়ে মরল পাঁচ নিষাদ এবং তাদের মা? কেন? নিরন্তর স্তব্ধতা সমস্ত ভয়ঙ্কর আগুনের শুরুতে এবং শেষে। উইনস্টন চার্চিলের কথাটা ধার করে এবং কিছুটা পাল্টে বলা যায়, প্রহেলিকার অন্তঃস্থলে রহস্যের চাদর জড়ানো এক হেঁয়ালি এই আগুন।
হেঁয়ালি আর রহস্য নিউ মার্কেটের আগুনেও। ৮৫ সালের খুশির ডিসেম্বরে মধ্যরাতে যে আগুন ছাড়খার করে দিয়েছিল আমাদের স্মৃতির শহরের আর এক প্রিয় গোলকধাঁধা। কেক-পেস্ট্রি-প্রিটিংস কার্ড-সুরভি-রেশমে গোটা বাজারটাই যখন তৈরি হচ্ছিল বড়দিনের জন্য। কার অন্যমনস্কতা, কোনও পুরনো বিদ্যুতের তার, কার মোমবাতি, কার ফেরেপবাজি এ আগুনের মূলে-সে এক অফুরান বিতর্ক, অনিঃশেষ বিস্ময়। সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, শেষমেষ কারওকে দোষী করা যায় না।
কিন্তু কিছু কৃতজ্ঞতা থাকে। সেইসব সাহসী যুবক (স্থানীয় মানুষ, দমকল কর্মী) যারা সারারাত আগুনের উজ্জ্বল তীব্রতপ্ত হলুদ আলোয় সিলুয়েত হয়ে থেকে অবিশ্রাম জল ছড়িয়েছে ওই আগুনে। বাঁচিয়েছে বাজারে রাত্রিবাস করা মানুষদের এবং হাঁসমুরগি, জীবজন্ত।
৮৪ সালে মধ্য লন্ডন থেকে কিছু দূরে টেমস নদীর পারে রাজা অস্টম হেনরির হ্যাম্পটন প্রাসাদে আগুন লাগে। ষোড়শ শতকে তৈরি হওয়া এই প্রাসাদে ছিল অসামান্য সব টিউডর পেইনটিং। রাজা অষ্টম হেনরির সঙ্গে ফ্রান্সের রাজা ক্লান্সিসের সাক্ষাতের ছবি। “ফিল্ড অব দ্য ক্লথ অব গোল্ড”। বা রাজা এবং তাঁর পরিবার। ধোঁয়া-মুখোশ পরে দমকলের শ’ দেড়েক কর্মী সে সব উদ্ধারের জন্য যে লড়াই চালিয়েছিলেন তা ‘টাওয়ারিং ইনফার্নো ছবির চাইতে কিছু কম শ্বাসরুদ্ধ উত্তেজনার নয়। হামাগুড়ি দিয়ে তাঁদের চলতে হয় ওই আগুনের গোলকধাঁধায়। মাথার উপরের ছাদ, পায়ের তলার মেঝে যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। একে একে প্রাসাদের হাজার কামরা থেকে উদ্ধার হল মানুষজন, মিনিবিড়াল। এবং ছবিগুলি। আগুনের তাতে কিছুটা বাদামি, পোড়া-পোড়া।
এ কাজ কি নিস্তাতই মাইনে বা শিরোপা বা অর্থপ্রাপ্তির জন্য? বিশ্বাস হয় না। কেন না মৃত্যুও তো হতে পারত। হয়ও। তবে? তবে কি দুনিয়াতে কিছু মানুষ সাহসী অ্যাডভেঞ্চারের জন্যই মুখিয়ে থাকে? ইতালির বিখ্যাত লেখক-পণ্ডিত উমবের্তো একো অবশ্যই তা মনে করেন না। একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, কিছু অপ্রকৃতিস্থ-ধর্ষকামী-মর্ষকামী-উন্মাদ-উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছাড়া অধিকাংশ মানুষই শাস্তির, স্বস্তির, নিরাপত্তার জীবনই ভালবাসে। কিন্তু অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর যে মন-যাকে পরার্থপরতা বলা হয় তাই-ই একজন সাধারণ মানুষকে করে তোলে সাহসী যোদ্ধা। সাহসের ইতিহাসের মূলে
এ-কথাই থাকে।
এ রকমই একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন উমবের্তো একো। তাঁর উপন্যাস ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’-এ। তার নাম ব্রাদার উইলিয়াম অব বাস্কারভিল। মধ্যযুগের ওই যুক্তিবাদী যাজক চরম অগ্নিকাণ্ডে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া একটি খ্রিষ্টীয় মঠ থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে উদ্ধার করে আনে অ্যারিস্টটল লিখিত এক পাণ্ডুলিপি। যে পাণ্ডুলিপি যাজকবৃন্দ জনসমক্ষে আনতে চায় না। পান্ডুলিপির পাতায় পাতায় তাই বিষ লাগানো থাকত। কৌতূহলী পাঠক থুতু দিয়ে পাতা উল্টোনোর সময় বিষক্রিয়ায় মারা যেত। রহস্যময় মৃত্যু আর অনাচার আর কুসংস্কার আর রক্ষণশীলতায় ভরা সেই মঠে অবশেষে আগুন লাগে।
দমবন্ধ তাপ, লকলকে ভরা আগুনের মধ্য দিয়ে অ্যারিস্টটলের যে পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করে আনলেন ব্রাদার উইলিয়াম, তাতে কী ছিল? কেন অত নিষেধ? বারণ? ছিল অ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্বের “দ্বিতীয় ভাগ”। যা কিনা জীবনের হাসি আর আনন্দের ব্যাখ্যা দেয়। কাব্যতত্ত্বের প্রথম ভাগে (কাব্যতত্ত্বের কোনও দ্বিতীয় ভাগ নেই। এটা একোর কল্পনা) ছিল ট্র্যাজেডি। এটা নাকি কমেডি নিয়ে। এবং তাই রক্ষণশীল মঠবাসী যাজক ব্রাদার বোর্গাস-এর কাছে এই পাণ্ডুলিপি খৃষ্টের দুঃখবাদী চৈতন্যের বিরোধী। হাসিকে ব্রাদার বোর্গাস দূরে রাখতে চাইতেন।
যে হাসি যে আনন্দ আসলে এক দুঃখভোলা গান। ক্যালিফোর্নিয়া অগ্নিকাণ্ডে, নব্বই সালে ঘরপোড়া তরুণ লেখক পিকো আয়ারের বর্ণনাটা এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়। আগুনের দহন থেকে তিনি তাঁর কয়েকটি পাণ্ডুলিপি বাঁচিয়ে আনতে পেরেছিলেন। আবিষ্কার করলেন তার একটিতে তিনি সপ্তদশ শতকের জাপানি পরিব্রাজক কবি বাশো-র দু’-চারটে লাইন উদ্ধৃতি দিয়েছেন। লাইনগুলো এরকম: ‘আমার বাড়িটা পুড়ে গিয়েছে। এখন আমি তাই অনেক ভাল করে দেখতে পাবো। চাঁদ ওঠা’।
ধ্বংসের মধ্যেও তা হলে থাকে একটা স্বচ্ছতার সঙ্কেত? এত আনন্দের আগমনী গান? আর একটা গল্প। ‘৮৫ সালের মধ্য ডিসেম্বরে, মধ্যরাতে নিউ মার্কেটে আগুন লাগল। পরদিন যথারীতি চলছে গোড়া-ছেঁড়া, দামি সৌখিন জিনিসপত্র, মাল বেসাতির উদ্ধারপর্ব। বাঁটাঘাঁটি, হা-হুতাশ, হইচই, ব্যস্ততা, নজরদারি তখন সেই পোড়া হাটে। তারই মধ্যে দমকলের এক যুবক কর্মী দৌড়ে গিয়ে তুলে আনলেন কয়েকটা পোড়া গ্রিটিংস কার্ড। চারধারটা পুড়ে কয়লা। তবু মাঝখানটা অবিকল। সেখানে একটি ছবি। জলভেজা তরতাজা কয়েকটা সবুজ পাতার। শাখার প্রশাখায় ছড়িয়ে আছে। যেন নতুন বছরের অনেক আশা নিয়ে। পাশে আদর্শলিপিতে লেখা ‘বেস্ট উইশেস ফর হ্যাপি নিউ ইয়ার’। ‘৮৬ সালে মন খারাপ লাগলেই আমি জলভেজা ওই সবুজ পাতার খোঁজ নিতাম। চোখ বুজে। মনে-মনে।
শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, আনন্দবাজার পত্রিকা
সাম্প্রতিক প্রবন্ধ
পাগলা হাওয়ার বসফরাস
বিভাগ – শহর পৌরাণিক অভিধানে যে কথাই লেখা থাকুক, বসফরাসের চালু তুর্কি অর্থগুলো সবই
জাফর, গালিব আর সেই মহাবিদ্রোহ
বিভাগ – শহর সব ‘নতুন’-ই কোনও না কোনও দিন পুরনো হয়ে যায়। কলকাতার যেমন
পুরনো বিকেলে বিগত আড্ডা
বিভাগ – শহর স্মৃতির পাতায় কত কী যে গন্ধের দাগ। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের
বারে বারে ফেরালে আমায়
বিভাগ – শহর সেই বার নেই সেই বারাঙ্গনারাও নেই। গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে দুটো-একটা পয়সা পেলে
অপরাজেয় সুদেবদা
বিভাগ – ব্যক্তিগত বড্ড মিস করি কলকাতায় আসা ইস্তক সুদেবদাকে। হুট করে রাগ করে