বিভাগ - ব্যক্তিগত

রাজনীতি নাকি পাজি, বদমাইস (স্কাউনড্রেল)-দের শেষ আশ্রয়। জর্জ বার্নাড শ’র মতো মহাষ্টমীর এমত ধারণাকে সম্মানেই প্রত্যাখ্যান করে বলছি, আমার তা মনে হয় না। মনে হয়, রাজনীতি সম্পর্কে উনিশ শতকের জর্মন রাষ্ট্রনায়ক অটোভন বিসমার্কের কথাটাই ঠিক। রাজনীতি এক ধরনের শিল্প, সম্ভবের শিল্প।
এ কথা আরও জোর দিয়ে বলছি জ্যোতিবাবুকে কাছে-দূরে দেখার সৌভাগ্য সূত্রে। ‘কাছে’, থেকেই, কেননা সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে টানা বিশ বছর তাঁর পাড়ার প্রতিবেশী ছিলাম আমি। না, সল্টলেক নয়, তখন সল্টলেকের কোনওই রমরমা হয়নি। ইন্দিরাভবনও ছিল না। তিনি তখন তাঁর পৈতৃক বাসভবন হিন্দুস্তান পার্কের বাসিন্দা। বাড়ির নম্বর বলতে হয় না, ৫৫বি নম্বরটি যে এ রাজ্যের পয়লা নম্বর পুরুষের বাড়ি, সে কথা ও পাড়ার নবীন মুদিও জানেন।
ওই ৫৫বি’র তিনতলায় থাকতেন সস্ত্রীক জ্যোতিবাবু এবং চন্দন। তখন সদ্য বিবাহিত, পায়েল তখনও হয়নি। ওই একই দোতলার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন আর এক ‘জ্যোতি’-জ্যোতি ভট্টাচার্য, একদা যুক্তফ্রন্টের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক। তিনতলার বাসিন্দার ঘরের আলো রাত দশটার মধ্যেই নিভে যেত। কিন্তু মাঝরাত গড়িয়ে গেলেও জ্বলে থাকত জ্যোতি ভট্টাচার্যের ঘরের আলো-তাঁর ‘স্টাডি’। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ভারী আর ভরা বিদ্যের কেতাবে মগ্ন তিনি। সিগার-এর ধোঁয়ায় ঘর ঝাপসা।
এসব আমি দেখতাম ঠিক রাস্তার উলটো দিকের ৭২ নম্বর বাড়ির চারতলার ঘর থেকে। সে বাড়ির নাম ‘ভালো-বাসা’, কবিদম্পতি নরেন্দ্র দেব রাধারানি দেবীর কন্যা নবনীতাদির (আমাদের ‘দিদি’) আশ্রয়ে, স্নেহে, ভরসায় এবং প্রশ্রয়েও। চাকরি-বাকরি নেই (বয়স মাত্র একুশ বা বাইশ), খাই-দাই আর বগল বাজাই। তবে ‘দিদি’র দৌলতে তাঁর বসার ঘরের লাইব্রেরিটি তখন প্র্যাকটিকালি আমার হেফাজতে। ওখান থেকেই আমার যাবতীয় ‘পণ্ডিতিপনা’র হাতেখড়ি। বাড়তি ছিল কিছু দুষ্প্রাপ্য রেকর্ড। যেমন স্যার লরেন্স অলিভারের ‘হ্যামলেট’, টি এস এলিয়টের পড়া স্বরচিত ‘লঙ সং অফ জে আলফ্রেড প্রুফক’। জেবে ফকির, দিলে আমির, সেই নানা রঙের দিন।
তখন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবুকে দেখেছি ধোপদুরস্ত সাজে পুলিশি ক্যাভালকেড বাহিত হয়ে সকাল ন’টা নাগাদ সাঁইসাঁই হুটারে গড়িয়াহাট-রাসবিহারী অ্যাভিনিউকে উচ্চবিত্ত সাবধানী করে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অফিস যেতে। দেখেছি পায়ে পায়ে সন্ধের ক্লান্তি নিয়ে বাড়িতে নামার সময়ের হঠাৎ লোডশেডিংয়ের পাল্লায় পড়তে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই মনে মনে কষ্ট পেতেন। কিন্তু ব্যবহারে আর পাঁচটা নাগরিক ধকল সওয়া মধ্যবিত্তের মতো। বাড়িতে কোনও জেনারেটর বা ইনভার্টার ছিল না। অন্তত বাইরে থেকে সে আলো দেখিনি।
এ এমন রাজা, যে রাজার জাঁকজমকের নেই কো বালাই। আঁধার-চাপা হিন্দুস্তান পার্কের বাড়িতেই ফিরে যেতেন। এ পাড়ার মুখ্যমন্ত্রী থাকার সুবাদে যে লোডশেডিংয়ের অত্যাচার থেকে কিছুমাত্র ছাড় মেলেনি। পরে আনন্দবাজারের সহকর্মীদের কাছে এই কথা জানাতে তাঁরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে, কেউ বিশ্বাস করেনি আমার কথা।
তখন বরুণ সেনগুপ্তের দল তাঁদের ‘নির্ভীক সাংবাদিকতায়’ প্রায় প্রতিদিন কাগজে জ্যোতিবাবুর আদ্য-শ্রাদ্ধ করে বেড়াতেন। অসুস্থ জ্যোতিবাবুর জন্য বাড়িতে লিফট বসাবার প্রস্তাবনাকে নিয়েই সে কী ধুন্দুমার কাণ্ড-‘ছি ছি, সরকারি খাজাঞ্চির এ কী অপব্যবহার!’ আরও পরে সরকারি খরচে একই কারণে সত্যজিৎ রায়ের ভাড়াবাড়িতে অবধি লিফট বসানো হল-ভাগ্যিস তখন ‘নির্ভীক সাংবাদিকতা’-র সূত্রে একটু কোমলতা লেগেছে। জ্যোতিবাবু এই ছাড়টুকুও পাননি। কেননা তিনি রাজনীতির লোক। আবার যে সে রাজনীতি নয়, ক্ষমতাসীন বাম রাজনীতি। সুতরাং এ তো ‘দুর্নীতি’ হতে বাধ্য।
দুর্নীতি, সুনীতি’র ব্যাপারটা ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চিরকালই একটু গোলমেলে ভরা। তাই জ্যোতিবাবু নীতিবাদী না দুর্নীতিপরায়ণ, সে বিতর্কে অনেকের মতো আমারও অরুচি আছে। সে সব বিচারের দায়-ভার রাজনীতি সচেতন কলমচিদের। আমি যে প্রতিবেশী সজ্জন জ্যোতিবাবুকে সকাল-সন্ধেয় দেখেছি, তিনি একজন নিখাদ, নিখুঁত বাঙালি ভদ্রলোক। বাড়িতে যিনি ধুতি (লুঙ্গির মতো করে পরা) আর হাত-ওয়ালা গেঞ্জি পরেন। নিজের জামাকাপড় নিজেই কাচেন, স্বহস্তে ছাতে শুকোতে দিতেন বলেও শুনেছি। তিনি আর পাঁচটা ভদ্রলোকের মতোই শিষ্টাচারে প্রীত, অসভ্যতায় বিরক্ত হন।
মনে আছে একবার হিন্দুস্তান পার্কের বারোয়ারি দুর্গাপুজোর সময় পাড়ার উঠতি ছোকরারা বেশি রাত পর্যন্ত মাইকে গান বাজাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন কর্তামশাই (যথারীতি তাঁর লুঙ্গি-গেঞ্জিতে)। পাশে কমলদি (প্রয়াত কমল বসু, জ্যোতিবাবুর সহধর্মিনী)। জ্যোতিবাবু বকছেন ওই সব ছেলে ছোকরাদের “স্কাউন্ড্রেল কোথাকার। ‘পুজো’ হচ্ছে। আর, ‘পুলিশগুলোই বা করছে কী?”
বাপরে বাপ! কী দাপট! এক ধমকে পুজো প্যান্ডেল ফাঁকা। বালিগঞ্জ থানা বোধ হয় উপড়ে এসে পড়েছে ৫৫বি-র চারধারে। দুয়ার এঁটে মটকে রয়েছে গোটা পাড়া।
সে বড় সুখের সময় নয়। সোয়াস্তিারও নয়। এ রকম আরও দু’-চারটে ঘটনার কথা মনে আছে। যেমন, একদিন মাঝরাতে নবনীতাদির কুড়িয়ে পাওয়া প্রিয় সারমেয় ‘তাওয়াং’-এর তীব্র ঘেউ ঘেউ গোটা হিন্দুস্তান পার্কের ঘুম ভাঙাতে থাকল। আমরা সবাই কানে বালিশ চেপে ঘুমোনোর চেষ্টা করছি। এর মাঝেই বাড়ির কালো টেলিফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মাঝরাতে ও-রকম টেলিফোন সবার যেমন আতঙ্ক হয়, আমাদেরও সেই অবস্থা। শেষে সম্ভবত বাড়ির কোনও কাজের লোকই সেই টেলিফোন ধরল, আর কিছুক্ষণ, ‘হুঁ-হাঁ’ করে রেখেও দিল। ‘কী রে? কার টেলিফোন?’ ব্যস্ত হয়ে নবনীতাদি জানতে চাইলেন। ‘দিদি, জ্যোতিবাবুর বাড়ির সিকিওরিটির লোকেরা টেলিফোন করেছিল। জ্যোতিবাবু নাকি জানতে চেয়েছেন, ওরা কুকুরটাকে খেতে-টেতে দেয় না নাকি? এত চেঁচায় কেন?’ সেদিন তো তাওয়াংকে কোনও ক্রমে থামানো গেল। কিন্তু জ্যোতিবাবুর ওই মন্তব্যর কথা যখন বন্ধুবান্ধবদের কাছে ঠাট্টায় ঠাট্টায় বলেছি, কেউ কেউ আরোপিত গাম্ভীর্যে এই মন্তব্যের একটা প্রতীকী তাৎপর্য খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, ‘তা হলে কি ধরে নিতে হবে, চেঁচানো মানেই লোকে খেতে পায় না।’ এই স্লোগান-বক্তৃতার চেঁচামেচিতে ভরা বঙ্গদেশে সব কথাই কেমন যেন একটা দুঃখময় চেহারা নেয়।
না হলে অনেকেই বুঝতে পারতেন যে জ্যোতিবাবুর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রসিকতা বোধ আছে, যা তাঁর ঈষৎ স্নবারিতে ভরা বাঁকা ঠোঁটের মতোই চাপা। আমার রিপোর্টারি জীবনে অনেক অনুষ্ঠানে জ্যোতিবাবুকে কভার করতে গিয়ে এই রসিকতা বোধের পরিচয় পেয়েছি। জ্যোতিবাবু কারও নাম মনে রাখতে পারেন না। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে বসান। ‘ও বলল’, ‘এই তো সেদিন কথা হচ্ছিল’, ‘সনিয়া খুব ভালো রান্না করে’, এ ধরনের সব। বা তিনি অনন্তবাবু বলে যে রিপোর্টারকে নিন্দে করেন, তাঁর আসল নাম হয়তো ‘কান্তিবাবু’। এ ধরনের অনেক মজাদার চুটকি আছে ওঁর নাম জড়িয়ে। কিন্তু এই সব ঠাট্টা-চুটকির খোশমেজাজ একটা গূঢ়তত্ত্বকে ধরতে পারে না। এই সব হেঁয়ালি ভরা তাঁর নিজস্ব ইডিয়াম অনেক বিতর্ককেই নিপুণ ভাবে পাশ কাটিয়ে চলতে পেরেছে। যার নামে নিন্দা করা হচ্ছে, সে নিজেও বুঝতে পারে না যে একই সঙ্গে জ্যোতিবাবু সাপও মারলেন, লাঠিও ভাঙল। সনিয়া গান্ধির মূল্যায়ন করতে গিয়ে (তখন সনিয়া রাজনীতিতে এসে গেছেন ঢোল-মৃদঙ্গ বাজিয়েই) কেউ যদি তাঁকে ‘খুব ভালো রাঁধে’ বলে প্রশংসা করে, তাতে সোনিয়ার রাজনৈতিক ভাও বাড়ে কি? না তাঁকে নিতান্তই এক সুগৃহিণী বলেই খাটো করে দেওয়া হয়?
কিন্তু ওই যে বললাম, জ্যোতিবাবুর স্টাইল বা গালিবের ভাষায় ‘আন্দাজ-এ-বয়া’ই অন্য রকম। খুব বেকায়দায় পড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তিনি সামাল দিয়েছেন নিছক তাঁর সূচতুর, নাগরিক বাগ্মিতায়, তাঁর সকৌতুক তির্যক মন্তব্যে।
এর পাশাপাশি আরও এক জ্যোতিবাবু আছেন। ইনি এমন এমন এক সজ্জন মানুষ, তাঁর স্বভাব-স্বাতন্ত্রে যিনি এক বালিকারও মন হরণ করতে পারেন। যেমন করেছিলেন নবনীতাদির কনিষ্ঠ কন্যা টুম্পা (যে এখন নামী অভিনেত্রী শ্রীমতী নন্দনা সেন)-র। সেবার টুম্পার মাধ্যমিক পরীক্ষা। হিন্দুস্তান পার্কের পয়লা নম্বর বাসিন্দার অফিস যাওয়ার সময়েই টুম্পার পরীক্ষা হলে পৌঁছনোর কথা। সেদিন থেকেই পরীক্ষা শুরু। কিন্তু পুলিশি নির্দেশে তখন ও রাস্তায় বেশ কিছুটা সময় অন্য যান চলাচল বন্ধ। ক্যাভালকেড নিয়ে যতক্ষণ সাঁই-সাঁই হুটারে পাড়া কাপিয়ে তিনি অফিস রওনা না হন।
এখন উপায়? নবনীতাদির মাথায় হাত। একবার করে তার নীল রঙের ফিয়াট থেকে বেরুচ্ছেন, অসহায় চোখে ক্যাভালকেডের দিকে তাকাচ্ছেন। ফের গাড়িতে উঠছেন। ঠিক এমনি সময়ে ধোপদুরস্ত জ্যোতিবাবু জুতো মশমশিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একতলায় নেমে তাঁর গাড়িতে উঠবেন, উঠবেন করছেন। হঠাৎ নজর পড়ল নবনীতাদির উপর। ‘কী ব্যাপার নবনীতা, কী হয়েছে?’ নবনীতা জ্যোতিবাবুকে প্রণাম করে সংক্ষেপে তাঁর উদ্বেগের কারণ জানালেন। ‘ও! এই ব্যাপার?’ বলে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে ডেকে নিচুগলায় কী যেন বললেন। ফের নবনীতাদিকে! ‘যাও! নবনীতা, আর দেরি কোরো না।’
সেদিন মুখ্যমন্ত্রীর-ও আগে, তাঁর ক্যাভালকেডকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল টুম্পার গাড়ি। সাঁ-সাঁ করে। স্যাটাস্যাট!

১৮ জানুয়ারি ২০১০, একদিন

সমস্ত বিভাগ
Scroll to Top