‘বাংলা আধুনিক গানের’ জমানার কথার ও সুরের নৈরাজ্য? ‘দেশ’ সাহিত্য পত্রিকার একটি সাম্প্রতিক সংখ্যায় কয়েকজন জনাদৃত বাংলা আধুনিক গায়ককে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এঁদের মধ্যে ছিলেন জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, উৎপলা সেন, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। সকলে প্রায় সমন্বরেই জানিয়েছিলেন আধুনিক বাংলা গানের আকর্ষণ কমে আসার প্রধান কারণ গানের কথার প্রতি অষর, সুরে মেলডির থেকে ভিনদেশী ছন্দের দাপট, অর্কেস্ট্রার বাড়াবাড়ি। তা ছাড়া যত্ন নিয়ে রিহার্সাল না করে চটজলদি প্রতিভার বদলে চটক বা যোগাযোগের উপরেই গুরুত্ব দেওয়া, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি নিয়ে আসা- এ সবও ধীরে ধীরে বাংলা আধুনিক গানের জগৎকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলেছে।
এলেবেলে গলা, এলেবেলে সুর আর এলেবেলে কথার ত্র্যহস্পর্শে বাংলা গান সুররসিকদের মনে ভালবাসা তো দূরের কথা আতঙ্কই সৃষ্টি করছে বেশি। সঙ্গীত সম্পর্কে অতিসীমিত জানের লোকজন এখন রেকর্ডিং কোম্পানিগুলির কর্মকর্তা হয়ে ওঠাও হাল আমলের বাংলা গানের এই পরিণতির জন্য দায়ী বলে ওই সাক্ষাৎকারে জানানো হয়েছিল। এবং তাঁরা একথাও জানিয়েছিলেন চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আধুনিক বাংলা গানের প্রধান জোর ছিল না কি সে সব গানের কথা ও সুরের সমন্বয়। কথাগুলো নাকি ছিল কাব্যময়, সচেতন এবং মনোযোগী ছিল শব্দ, সুরে ছিল অফুরন্ত মেলভি, বোম্বাইয়ের হামলাবাজি এত প্রবল ছিল না।
সত্তর সাল থেকেই সে চিত্র পালটে যায় বলে সুরবোদ্ধা, সঙ্গীত-সমালোচকরা মনে করেন। অর্থাৎ সেই বোমা-পিস্তল-পাইপগানের শব্দমুখর সত্তরদশক থেকেই বাংলা আধুনিক গানের অকালবার্ধক্য। কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও আশির দশকের এই বেলা শেষেও বাংলা গান তার পুরনো গৌরবের দিনে ফিরে যেতে পারেনি বলে একদা সুরকার বিমান ঘোষ মনে করেন। এক ধরনের ধর তক্তা মার পেরেক ভাবটাই যে এর জন্য মুখ্যত দায়ী এ কথা অস্বীকার করতে পারেন না প্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়ার উপদেষ্টা হিসাবে বর্তমানে কর্মরত বিমানবাবু। যদিও বিমানবাবু ‘এটা মনে প্রাণে’ বিশ্বাস করেন যে আধুনিক গানকে সব সময়ই এগিয়ে যেতে হয়, আটকে থাকলে চলে না। ‘কোনও গীতরীতির বাঁধা ধরা’ নিয়মের ফাঁদে আটকে থাকার তিনি বিরোধী। তবু তিনিও স্বীকার করেন বাধ্য হলেন যে কিচ্ছু তেমন হচ্ছে না। অবশ্য এরকম গাঁইয়া ভাবে কথাটা বলেননি। বলেছিলেন ‘বাংলা গানের ধারা শুকিয়ে যাচ্ছে।’ সেই ‘পঞ্চকবির’ ধারা যাঁরা তাঁর মতে, ‘রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত’ এবং অবশ্যই ‘নজরুল’। বিমানবাবুর ভাষায় ‘কাজি সাহেবের অত্যন্ত কাছের লোক’ ছিলেন। এককালে বিমানবাবু নিজেও অনেক বাংলা গানে সুর দিয়েছেন। ‘তবে শেষে আর কিছুই করে হয়ে ওঠা হল না’। ‘বুকের ভিতরে’ (তিনি বুকের উপর টোকা দিয়েই বললেন) ‘অনেক কিছু জমানো আছে। হিমাংশু দত্তের সেই সব সুর- ‘ছিল চাঁদ’, অনুপম ঘটকের, আহা। তাঁর ‘কোনও খেদ নেই।’
তবে এই যে বললেন ‘গানের ধারা শুকিয়ে যাচ্ছে?’ দুঃখ বা ‘খেদ’ হচ্ছে না আপনার? ‘না না একেবারে কিছু হচ্ছে না, তা তো বলছি না।’ কয়েকজন যুবকের নাম করলেন তিনি- সুমন চট্টোপাধ্যায়, গৌতম চট্টোপাধ্যার। ওরা গান নিয়ে নতুন পরীক্ষা করছে। তবে, ‘স্বীকার করতে বাধ্য’- তাঁর গলায় প্রাবন্ধিকের সিরিয়াসনেস- ‘একটা বিরাট সঙ্কট আজ প্রাস করেছে আধুনিক বাংলা গানকে।’ এবং তার প্রধান কারণ, ‘আগে কাব্যে সুর দেওয়া হত, এখন সুর চলে কথার হাত ধরে।’ হাত ধরে না কোমরে দড়ি বেঁধে তা নিয়ে আর কথা হয়নি। রুচিহীন ভাবে কথাবার্তা বিমানবাবু বলেন না বলে। যা সরাসরি।
সরাসরি কথা, ‘পঞ্চকবির’ ট্রাডিশন ভাঙার ‘কুফলে’র ব্যাপারে মন্তব্য রাখা-এতে সলিল চৌধুরীও রাজি হননি। ‘সলিল চৌধুরীও’ কথাটা এখানে সুপ্রযুক্ত। কেননা পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে যিনি বাংলা গানকে পঞ্চকবির ‘ট্রাডিশন’ ভেঙে ‘বিপ্লবী চেতনা’র আলোকিত করেছেন বলে গণদাবি তিনি এই সলিল চৌধুরীই। তাঁর সুরে, তাঁর ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূর’ কথায় আজও মোহিত বাংলা দেশ।
আপনিও তো প্রথা ভেঙেছিলেন, কই আপনার গানকে তো লোকে ফেলে দেয়নি সেদিন? এখন হলটা কী? টলানো গেল না সলিলবাবুকে। যতই ওয়াগনার, বেটোফেন শুনে বড় হন না কেন, যতই থাকুক না ছোটবেলা থেকে পিয়ানো বাজানোর সখ- ‘কৃষক আন্দোলন’ করা মানুষ বটে তো। ‘এসব ব্যাপারে আমার মতামত দেওয়াটা সাজে না। আপনারাই তো মতামত দেবেন।’ বললেন তিনি। ‘তা ছাড়া প্রথা ভাঙাটা তো কোনও অপরাধ নয়’- সলিলবাবুর মন্তব্য। ‘প্রথাতো আমিও ভেঙেছি। কোনও এক গাঁয়ের বধূতেই অস্থায়ী-অন্তরা-আভোগের গতানুগতিক রাবীন্দ্রিক প্যাটার্ন তো আমি গানে রাখিনি। পরে তো রেডিও, রেস্তোরাঁ, হাটে, বাজারে কেবল চলেছিল ওই গান। কই খারাপ তো লাগেনি কারও। এখনও।’
অবশেষে সলিলবাবু খানিকটা দূরত্বের শীতলতা ভেঙে সরব হলেন। ‘আসলে ব্যাপারটা কী জানেন।’ সলিলবাবু বুঝিয়ে বলেন ‘আসলে আধুনিক বাংলা গানের একটা বাণী নির্ভরতার ট্রাডিশন আছে।’ গানকে এখানে কথার মধ্য দিয়ে উপলব্ধিতে পৌঁছোতে হয় বলে সলিলবাবুর বিশ্বাস। ‘নিজেও যখন গান লিখি, এ কথাটা মনে রাখি।’ যে জন্য তাঁর গান এখনও মানুষের হৃদয়ের শাখা ধরে নাড়া দিয়ে যায় বলে তাঁর বিশ্বাস। যে কারণে তিনি পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বিক্ষুদ্ধ, ভাঙা বাংলায় বিপ্লবে বুভুক্ষু বাঙালি মধ্যবিত্ত মানসকে অতটা নাড়া দিতে পেরেছিলেন। ‘মনুমেন্টের নীচে টাঙিয়ে দেওয়া হল নোটিস-এই এই গান শোনা চলবে না। তার বারো আনাই আমার গান’- সলিলবাবুর স্মৃতি মেদুর কণ্ঠ। মিন্টো পার্কের কাছে তাঁর ফ্ল্যাট বাড়িতে বসে এসব কথা। তাঁর সেই বাশী নির্ভর গানের। কখনও সুকান্তের কবিতা থেকে ‘রানার’ (যে ‘রানার’ এবার পুজোয় ফের লতা মঙ্গেসকরকে দিয়ে তিনি গাইয়েছেন) ‘অবাক পৃথিবী। সেলাম তোমাকে সেলাম।’ কখনও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পালকির গান- ‘পালকি চলে, গগনতলে’। তবে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছিল পালকির গান- উনি সেটাকে ‘পালকি বাহকদের গান’ করেছেন সুরে, ছন্দে শ্রমের শ্বাস এনে। ‘ওই হুনহুনা, হনহনায়।’ যে গান শুনলে একদা মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে হত ‘কাল থেকেই বুঝি রেশনে চাল-চিনির দাম কমে যাবে।’ এ কথা সঙ্গীত-সমালোচক পার্থ বসুর। কেমন সুরকার ছিলেন সলিল চৌধুরী। পার্থ বসুর মতে তিনি ‘একমাত্র লোক যিনি ভালভাবে মিশিয়ে চুরি করতে পারতেন।’ চুরি মানে সুর চুরি বলাই বাহুল্য। সলিল চৌধুরীর জনপ্রিয়তাকে তেমন কিছু আমল দিতে চান না উনি। কেন না ওঁর মতে সলিলের জনপ্রিয়তার পিছনে ‘গণনাট্য সংঘই কাজ করেছে’। এবং এই সেই গণনাট্য সংঘ তথা আই পি টি এ সলিলবাবুকে ‘যাঁদের একদেশর্শিতা, সঙ্কীর্ণতা আঘাত দিয়েছে।’ এবং ‘এখনও তার জের চলেছে’ বলে সলিলবাবু জানিয়েছিলেন।
তবে কেবল একমাত্র সলিলবাবু সম্পর্কে যে তাঁর এরকম কোনাওরালা খোঁচাওয়ালা মন্তব্য রয়েছে তা নয়? হেমন্তর গলাও তাঁর এমন কিছু আহামরি বলে মনে হয় না। আমির খান প্রশংসা করলেও না। ‘বলা হয়, আমির খান বলেছেন হেমন্তের গলা অসামান্য। কোন্ পরিস্থিতিতে, কী খেয়ে এমন কথা বলেছেন জানি না।’
তবে তাঁর মতে, হেমস্ত নিজের লিমিটেশন বুঝতেন। গলাটা ছিল মনোরম। ‘তার বেশি কিছু নয়।’ বরং পার্থবাবুর আরও ভাল লাগে গীতা দত্তর গান (‘গলাটা চট করে খুব উঁচু দিয়ে যেত’), অথবা আরও আগের পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া আধুনিক গান ‘চৈত্র দিনের ঝরাপাতা’ বা সায়গলের গাওয়ার ভলি-‘আনট্রেইন্ড অথচ সফিসটিকেটেড’। ভাল লাগত সুধীরলাল চক্রবর্তীর গান, অনুপম ঘটকের সুর। কিন্তু তিন দশকের পুরনো বাংলা ‘আধুনিক’ গান নিয়ে তাঁর এমন কিছু আহাউছ নেই। নজরুলের পর থেকে বাংলা আধুনিক গানের কথা ‘খুবই খারাপ’ তাঁর মতে। ‘লোকেরা এসব গান শুনেছেন’ গায়কদের গলার জন্য। ‘গাওয়াটা ভাল হত এসব গানে।’
কোনও গীতিকারকেই কি তাঁর মনে ধরে না? বেশির ভাগেরই কথা অত্যন্ত ‘হাকনিড’। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার? তথৈবচ। ‘ওঁকে মনে পড়ে যাওয়ার কারণ, সিনেমার গান? সুচিত্রা-উত্তম জুটি- এইসব। এঁদের মধ্যে কিছুটা স্বতন্ত্র ছিলেন প্রণব রায়। প্রণব রায় মানে, জগন্ময় মিত্রের গাওয়া সেই বিখ্যাত ‘সাতটি বছর আগে-পরে’র গীতিকার। ‘প্রণব রায় এঁদের তুলনায় বেশই ম্যাচিওরড ছিলেন।’ এই প্রণব রায়ও কিন্তু চারধারে বাংলা গানের কথা ও সুরের হালচাল দেখে শেষ জীবনে কিছুটা নীরবতার বাস করেছেন। ‘বাবা শেষ জীবনে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়েছিলেন’- প্রণব রায়ের স্মৃতিচারণার সময় বন্ধুমানুষ প্রদীপ্ত এ কথা বলেছিল। এবং ভাবলে একটু গা হাত পা শিউরে ওঠে বাংলা আধুনিক গানের অস্তাচলের ওই সত্তর দশকেই কিন্তু প্রণব রায়ের মৃত্যু। স্বাভাবিক মৃত্যু, তবুও। বাবার লেখা গানের একটা ক্যাসেটও বার করার ইচ্ছা প্রদীপ্তর।
‘কারও গরজ নেই’ বলে সে কাজ করতে পারছে না প্রদীপ্ত। নিজে সে ভারতে সদ্য চালু হওয়া বহুজাতিক রেকর্ড সংস্থা সি বি এস-এর পূর্বাঞ্চলের আর্টিস্ট অ্যান্ড রেপারটোয়ার ম্যানেজার। পুরনো গানের সমঝদার। তবু বাবার লেখা রেকর্ড হওয়া গানগুলো সি বি এস-এর পক্ষে ক্যাসেট করানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ‘গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড যে ওগুলো।’
আর, কি সব গান। আহা আহা করে উঠবেন বহু মধ্যবয়স্ক, প্রায় যুবকরাও। ‘পৃথিবী আমারে চায়’ ছবিতে ‘তুমি বিনা ফাগুন বিফলে যায়’- গীতা দত্তের গলায়। মনে আছে? মনে নেই আবার? শোনার পরে এখনও তো নিস্তেজ নিশ্বাসে উত্তাপ আসে। অথবা সাগরিকা ছবিতে সন্ধ্যার গলায় ‘এ মধুরাত শুধু ফুলপাপিয়ার’ বা সাহেব বিবি গোলামে ‘ধীরে বন্ধু ধীরে’।
বাংলা ছবির জন্য প্রণব রায় গানের ‘সিচুয়েশন’ বুঝে নিয়ে গান লিখতেন। ছবির পরিচালকরা তাঁর কাছে আসতেন ‘শুধু কেবল গানের কথার জন্য নয়। বাবা অনেক সময় গানের সিচুয়েশনও তৈরি করে দিতেন’- প্রদীপ্ত বলছিল। ফিল্মের বাইরেও তাঁর লেখা অনেকানেক গান। ‘আর জনমে হয় যেন গো তোমায় ফিরে পাওয়া’। বা ‘আর ডেকোনা সেই মধুনামে, কিশোরবেলায় যে নামে ডাকিতে।’ চোখের কোল ভিজে ভিজে আসছে? গলার ভিতরটায় কি যেন শক্ত ভ্যালা মতো? আয়নায় বহুদিন নিজেকে দেখেন না? ওইটাই তো সবচেয়ে বড় কারণ। ধূলোভরা কলকাতার আকাশের নীচে পুরনো গানগুলোর এই লংমার্চের শেষে তো আপনার-আমার জীবনের ওই হারানো দিনগুলোও চলেছে। জীবন যখন সময়ের ফন্দিফিকিরে, চালবাজিতে এত ধুরন্দর হয়ে পড়েনি। যেমন সেই ‘নিশিরা বাঁকা চাঁদ আকাশে’র গান। এটাও প্রণব রায়ের লেখা। গীতা দত্তের গাওয়া। যেন কবেকার আগেকার অরুণিমা সান্যাল তাঁর দক্ষিণের বারান্দায় সন্ধ্যালগনে দাঁড়িয়ে আছেন ঈষৎ ঝুঁকে। বাঁকা চাঁদের আলো কিঞ্চিৎ রেলিংয়ে। এবং তার ধানীরন্ডের শাড়িটার উপরে। যেন ছোঁয়া যায় তাকে। ছোঁয়াই যায় তার গান। বছর কুড়ি পিছু হেঁটে গেলেই। জীবনের বরবাদ বছর কুড়ি।
চাঁদনি চকের কাছে, এই তো সেদিন, চোখে পড়ল দৃশ্যটা। একটা রেকর্ড-ক্যাসেটের দোকানের ভিতর। ছোট্ট দোকান। কিন্তু ভিড়ে ভিড়ে ঠাসা। ভিতরে ঢুকতেই প্রচণ্ড বেগ পেতে হয় এত লোকজন। আর এমনই মিশ্রজাতের লোকের ভিড় যে স্বচ্ছন্দে দোকানের ভিতরের ছবিটার ক্যাপশন করা যেতে পারে ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’। নানান ধরনের, নানান ভাষা, নানান গায়কের, যন্ত্রের সুর ভেসে উঠছে দোকানটা থেকে। খদ্দেররা কেনবার আগে যাচাই করে নিচ্ছেন রেকর্ড, ক্যাসেট।
জুহি চাওলা, রাজবব্বরের মতো দেখতে যুবক-যুবতী গানের ক্যাসেট কিনছেন। হেলমেট হাতে ধরা যুবকটি সযত্নে শুনে চলেছেন ম্যাডোনা বা মাইকেল জ্যাকসন। বৃদ্ধবৃদ্ধারা কেনার তোড়জোড় করছেন রামকৃষ্ণ-সারদা মার ভজন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে’-কে ভিড়ে কোনঠাসা করে দিয়ে ‘গুরুদক্ষিণা আমার গুরু দক্ষিণা’ কানে তালা লাগানো গান না স্লোগানও কানে আসছে। আদুরে আবদারে গলায় কার যেন গান আর একপাশে- ‘মনটা আমার হারিয়ে গেছে’। ‘কয়ামত সে করামত তক’। এ-ও-তা। ঠাসঠাস ধুমধাম! ফুল ফোটে? তাই বলো? আমি ভাবি পটকা।
এর মধ্যে হঠাৎ একটা পুরনো গানের কলি- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলা-গানে মোর ফোন ইন্দ্রধনু, আজ স্বপ্ন ছড়াতে চায়- এ শুধু গানের দিন এ লগন গান শোনাবার…। কে শুনছে এই গান, এই কালে, এই মোপেড-মারুতির প্রায় একুশ শতাব্দীর কলকাতার? চোখে পড়ল ভিড়ের মধ্যেই গা বাঁচিয়ে দুই বিভিন্ন বয়সের নারী তন্ময় এই গানে। মা এবং মেয়ে নিশ্চয়ই। বছর কুড়ির কন্যাটি তার উত্তর চল্লিশের মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বেছে নিচ্ছেন ক্যাসেট এবং এক আধটুকরো গানও শুনে নিচ্ছেন সেই সুযোগে। সন্ধ্যার পাশাপাশি গীতা দত্ত-‘তুমি বিনা ফাগুন বিফলে যায়’। বা হেমন্ডের ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’। ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’। আগামী পৃথিবীর কাছে গায়কের রোমান্টিক আবেদন। ঝরাপাতাদের মর্মরধ্বনির মধ্যে যেন তার গানখানি বেঁচে থাকে। এ দৃশ্যকে কী বলা যায়? অলৌকিক? অপার্থিব।
এ ভাবে ভ্যানিশ করে দিচ্ছেন কী করে মা-মেয়ের মাঝের কুড়ি কুড়িটা বছর। দোকানের যুবক-মালিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম রহস্য করে। তাঁর নাম হরিশ গাথানি। ভারি করিৎকর্মা যুবক তিরিশের চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে আজকের এই আশির দশকে গাথানির পরিবার রেকর্ডের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন কলকাতায়। চিৎপুর থেকে শুরু করে এখন চাঁদনী চকে একদা নিছক সেভেনটি এইট স্পিডের ভারি ভারি রেকর্ড দিয়ে। এখন নানা ধরনের দেশবিদেশী রেকর্ড এবং স্বভাবতই ক্যাসেট। বিক্রিও করেন আবার প্রকাশও করেন।
কথার চাল বুঝতে দেরি হয়নি হরিশের। তা ছাড়া তাঁর নিজেরও পছন্দ ওই সব পুরনো দিনের বাংলা, হিন্দী গানগুলো। যতই তাঁর কাউন্টার থেকে শয়ে শয়ে বিক্রি হোক ‘গুরুদক্ষিণা’ আর ‘করামত সে কয়ামত তক’- দুর্বলতা তাঁর পুরনো গানগুলোকে নিয়েই।
এবং সেটা নিছক আবেগের, অনুভূতির ক্রিয়া, বিশেষণে বোঝাই দুর্বলতা নয়। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘এ শুধু গানের দিন’ বা কবেকার আগেকার সুধীরলাল চক্রবর্তীর গাওয়া ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’র মতো গানের থেকে তৈরি হওয়া এ কালের ক্যাসেট তাঁর ‘ব্যবসার লক্ষ্মী’ও বটে। স্বীকার করেন এ কথা। ‘চটজলদি হাজার হাজার বিক্রি হয়ে না গেলেও সারা বছর ধরেই এ গানগুলোর বিক্রি চলে,’ বললেন তিনি। এ যেন বাংলা বইয়ের বাজারে কবিতার, প্রবন্ধের বইয়ের মতো। রগরগে উপন্যাসের মতো যা দিনে দিনেই খান্তাকচুরির মতো বিক্রি হয় না। কিন্তু সারা বছর ধরে যা পাঠকের আগ্রহে থাকে। স্থায়ী একটা ব্যাপার আছে। এক ধরনের নির্ভরতা।
ঠিক এই নির্ভরতাই এখন বান্ধালি মধ্যবিত্তের মধ্যে পুরনো বাংলা গানের উপর। এবার পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে, গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজারের মোড়ে, যার প্রমাণ মিলেছে। সপ্তমীর দুপুরে শোনা গিয়েছে হেমন্তের গাওয়া আমার গানের স্বরলিপি, বিকেলবেলায় সন্ধ্যার গলা- ‘এ মধুরাত শুধু ফুল পাপিয়া’র। পুজোয় লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া বাংলা গানের ক্যাসেটে ও সলিল চৌধুরীর সুরে ‘রানার’। একদা যে গান হেমন্তের গলায় রবিবারের অনুরোধের আসরের ‘শেষ গান’ মানে চূড়ান্ত কাঙ্ক্ষিত গান ছিল।
শোনা গিয়েছে সদ্যপ্রয়াত শ্যামল মিত্রের দু তিন দশকের পুরনো গান-মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁরই গলায় নতুন করে গাওয়া। ‘মউল বনে জমেছে বউ, হিজল শাখে ডাহুক ডাকে’। কিছুদিন আগেই এইচ এম ভি প্রকাশ করেছেন ‘স্মৃতির বাঁশরি’ নামে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের কিছু ছায়াছবির গান। বইয়ের প্রকাশক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক জীবনী ছেপেছেন, সঙ্গে হেমন্তের পুরনো গানের ক্যাসেট। এবং গত বছরের বই মেলায় তা হুহু করে বিক্রি হয়েছে। দীর্ঘ লাইন দিয়ে তা কিনেছেন লোকজন। তা ছাড়া কলকাতার একদা জমজমাট জলসার দিনগুলোও ফিরে আসছে। পূজোপ্যান্ডেলে বিজয়াদশমীর পরে পরেই যা শুরু হত। পাড়ার দালাদিদিদের গান দিয়ে শুরু এবং ছোট-মেজ-বড় ‘বেভার শিল্পী’দের দিয়ে শেষ। সত্তরের শুরু থেকেই যা অস্তাচলে- বাঙালি মধ্যবিত্তের স্মৃতির দীর্ঘনিশ্বাস হয়ে বেঁচেছিল মাত্র। সেই জলসাও ফিরে এসেছে- এবং কেবল গুরুদক্ষিণা’ ‘আশা ভালোবাসা’ বা ‘দাদার কীর্তি’র গানেই সীমিত থাকছে না। জলসার রাতেও ফিরে আসছে পুরনো গান।
বড় জলসাতে মান্না দে হয়তো আসর শুরু করছেন জঞ্জিরের ‘ইয়ারি ইমান মেরা ইয়ার মেরি জিন্দেগি’ দিয়ে। পাড়ার ‘অমিতাভ’দের নাচিয়ে। কিন্তু তাঁর তুরুপের তাস এখনও সেই ‘আমি সাগরের বেলা, তুমি দুরন্ত ঢেউ’। গালের মুখটা ধরা মাত্রই জলসা ছাপিয়ে করতালি, কিছু শোনা যায় না। ফের শিল্পীকে শুরু করতে হয়। বা হেমন্তকে গাইতেই হচ্ছে সলিল চৌধুরীর সুরে সেই ‘ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। জগন্ময় মিত্রকে ‘এমনই শারদ রাতে, সাতটি বছর আগে’। যে গান প্রণব রায় লিখেছিলেন চল্লিশের দশকে। এবং এই চল্লিশের দশকে হওয়া ‘গরমিল’ ছবির গান আবার ক্যাসেট হয়েছে আশির দশকে। সে গানের নাম ‘এই কি গো শেষদান’। ছবিতে যে গান গেয়েছিলেন রবীন মজুমদার। কমল দাশগুপ্তের সূরে। ৮০ সাল থেকে ৮৮সাল-এই গানটি তিনজন গায়ক ফিরে গেয়েছেন। ফিরোজা বেগম, অনুপ ঘোষাল এবং শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়। ঠিকই একই ভাবে এই আশির দশকেই দু-তিন দশক আগেকার আর একটি গান তিন তিনবার রেকর্ড হয়েছে। তিন তিনজন গায়কের গলায়। তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগম এবং অনুপ ঘোষাল। যে গান একদা গেয়েছিলেন সত্য চৌধুরী। মোহিনী চৌধুরীর লেখা কমল দাশগুপ্তের সুর দেওয়া এ গানটি। ‘পৃথিবী আমারে চায়।’
গত দু-তিন দশকের এই সব বাংলা গানের (‘আধুনিক বাংলা গান’)-আবার হঠাৎ এরকম জেগে ওঠার পিছনে কি হাল আমলের।
২৬ নভেম্বর ১৯৮৮, আনন্দবাজার