একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না। সুভাষ বসুকে আমরা, বাঙালিরা, ‘নেতাজি’ বলি কেন? অত ‘জি’-হুজুরি তো বাঙালির ধাতে নেই, ও তো বাঙালির মতে, ‘খোট্টাই কালচার’। ছোট্ট এই শব্দটা নিয়ে কত বড় খেলাই না হয়ে থাকে হিন্দি ভাষা-সংলগ্ন এলাকায়।
তা হলে ‘বাংলার দামাল ছেলে’ সুভাষ বাঙালির শ্রদ্ধার চোখেই হঠাৎ এমন ‘নেতাজি’ হয়ে উঠলেন কী করে? যেন দিল্লি-মুম্বই-লখনউ-এলাহাবাদ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন বাংলার অঙ্গনে। এ সম্মান তো আমরা অন্য কোনও জাতীয় স্তরের বঙ্গনেতাকে দিইনি। দিয়েছি বড়জোর ‘রাষ্ট্রগুরু’-র শিরোপা। বঙ্গনেতা তো দূরের কথা, আমাদের ‘জাতির জনক’ ‘বাপুজি’-র ভাগ্যেও কি জুটেছে অতটা বাঙালি ভাব-বিহ্বলতা? তাঁর ক্ষেত্রে তো শুধুই ‘গান্ধিজি’। কই, তাঁকে তো বাঙালিরা ‘মহাত্মাজি’ বলেন না? বা ‘বাপুজি’? কেন? খোট্টা-খোট্টা শুনতে লাগবে বলে?
হয়তো! বা, হয়তো গান্ধিকে বাঙালি চিরকাল সুভাষের থেকে বহু কম নম্বর দিয়েছে বলে। বাঙালির গান্ধি নেহাতই এক ‘গুড্ডু’ বেনে, ‘বিড়লাদের দালাল’, ‘টুপিবাজ’, ‘আদ্যন্ত…’। তবু সব দিক রক্ষা করতে তাঁরও পুজো করতে হয়, তাই নমোনমো করে পুজো সারা। বাঁ-হাত দিয়ে ফুল ছোড়ার মতো তাই তিনি বাঙালির ‘গান্ধিজি’। সে অনেকটা ‘বাইজি’ বা ‘পেঁয়াজি’ বলার মতো।
মানে, শ্রদ্ধার আড়ালে উপহাস, বিদ্রুপ। এই ‘জি’ আর সেই ‘জি’-তে কত তফাত! ‘নেতাজি’-র ‘জি’-তে আছে খ্রিস্টের সম্মান, আত্মত্যাগের আলো। ইঙ্গিতে বাঙালি বলতে চায়, সুভাষ আমাদের ঘরের ছেলে বটে। তবে সে শুধু জাতির নয়, গোটা দুনিয়ার অবিসম্বাদিত নেতা। তিনি হিটলারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেন, মুসোলিনি তাঁকে খাতির করেন-এটি চাট্টিখানি কথা? বাঙালিরা মনে করেন, ‘জি’ একটি সর্বভারতীয়, বা আন্তর্জাতিক শিরোপা। অঞ্চল পেরিয়ে, দেশ-কালের বেড়া টপকে যায় ‘জি’। তাই সুভাষ ‘নেতাজি’।
এই জায়গাটা বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্য কারওকেই দেয়নি বাঙালি। রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা শান্তিনিকেতনের আশ্রমের ‘গুরুদেব’ (কথাটা প্রথম চালু করেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, ১৯০১ নাগাদ আশ্রমের শিক্ষকতা করতে এসে) থেকে গোটা দেশের ‘গুরুদেব’ করে তুলেছিলেন। মায়, গান্ধি-নেহরু-ইন্দিরার গুরুদেবও।
সেই একই কায়দায় ‘নেতাজি’। গুগল সার্চে একবার ‘নেতাজি’ লিখুন। হাজারটা লিংক খুঁজে পাবেন যেখানে ‘নেতাজি’ মানেই সুভাষ, সুভাষ মানেই ‘নেতাজি’। ভারতীয়দের কাছে তিনি ‘নেতাজি সুভাষ’ আর বাঙালির কাছে একমেবাদ্বিতীয়ম ‘নেতাজি’। পাড়ার ছোট্ট পার্ক, ধর্মতলার বড় অফিসবাড়ি, ইংরেজ লর্ড, ভাইসরয়দের হটে যাওয়া স্ট্যাচু, গলিঘুঁজি, পানের দোকানে ঝোলানো ক্যালেন্ডার, তেলেভাজার দোকান-সর্বত্রই ‘নেতাজি’।
তা ছাড়া যেখানেই বাঙালি খুঁজে পাবেন একটু ‘আন্তর্জাতিক’ বা জাতীয়তাবাদের গন্ধ, সেখানেই আলটপকা ঢুকে যাবেন ‘নেতাজি’। দমদম এয়ারপোর্ট যে কারণে ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল নেতাজি সুভাষ এয়ারপোর্ট’। কলকাতার ‘নেতাজি ব্যুরো’-র কথা না হয় বাদই দিলাম। যেহেতু এর ঠিকানাটি (এক নম্বর, উডবার্ন পার্ক) খুব স্বাভাবিকভাবেই বসু-পরিবার ও ‘নেতাজি’-র নামের সঙ্গে নাড়ির টানে বাঁধা। জোড়াসাঁকো, যেমন করে ঠাকুরবাড়ি, এবং / অতএব, রবীন্দ্রনাথেরও। কলকাতার সবচেয়ে শানদার ইনডোর স্টেডিয়ামটির (যেখানে আন্তর্জাতিক স্তরের খেলাধুলো, আলাপ-আলোচনা হয়) নামেও ‘নেতাজি’।
এমনকী, রাজ্যের বাইরে, পাতিয়ালায় গোটা দেশের খেলাধুলোর ‘মক্কা’ স্পোর্টস ইনস্টিটিউটটিও তাঁরই নামে। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ এই প্রতিষ্ঠানটির প্রাসাদোপম (ইন ফ্যাক্ট, এটা প্রাসাদই, একদা পাতিয়ালার রাজারা থাকতেন) অট্টালিকাটি এখন সবাই চেনেন ‘নেতাজি সুভাষ ইনস্টিটিউট অফ স্পোর্টস’ হিসাবে। আমার সন্দেহ, এর পিছনে কোনও বাঙালি ‘লবি’ আছে। না-হলে যতই তিনি দেশবরেণ্য হন না, খেলার প্রতিভা তাঁর এমন কিছু ছিল বলে তো জানা যায় না। এ তো রবীন্দ্রনাথের নামে ব্লেড কিংবা সেফটি রেজরের নাম রাখার মতো!
কিন্তু বুকে দম থাকলে, একবার বলে দেখুন না সে কথা? হইহই করে তেড়ে যাবেন বঙ্গসন্তানেরা। আস্পদ্ধা দ্যাখো! যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা! কেন ওখানে ‘নেতাজি’-র নাম বেমানান? ওই রকম সাহেব-ঠ্যাঙানো বলিষ্ঠ হাত-পা, ওই রকম বুকের ছাতি আর দম যাঁর, তিনি যদি বেমানান হন, তবে মানানসই কে? গান্ধি? হোক না তেনার নামে ‘পিস ফাউন্ডেশন’, কে আপত্তি করছে? বা হোক আরও গ্রামোদ্যোগ, চরকা-খদ্দরের দোকান-হাট-বাজার। বয়ে যায় বাঙালির!
সত্যিই তো! কীসে আর কীসে! কোথায় এক কেশ-দন্তহীন কৃশকায় বৃদ্ধের লাঠি হাতে পথ চলা, আর কোথায় এক চিরতরুণের ঘোড়সওয়ারি অহংকার? সব অর্থেই তো সুভাষ বাঙালির কাছে এক অলিম্পিয়ান। তবে পাতিয়ালার ওই খেলার কেল্লাটিই বা বাদ পড়ে কেন?
এমত ‘নেতাজি’-কে কখনোই ‘সুভাষ বসু’ বলতে নারাজ বাঙালি। এমনকী, ‘বসুজি’, ‘সুভাষবাবু’-ও নয়। ‘মিস্টার বোস’ তো নয়-ই। সে তো প্রায় সিডিশন তথা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমান। অনেকটা জিন্নার সেই গান্ধিকে ‘মিস্টার গান্ধি’ বলে ডাকবার বিপত্তি, ফ্যাসাদের মতো। কী হেনস্থাটাই না হতে হয়েছিল তাঁকে তরুণ খাদি-কংগ্রেসিদের হাতে। কোনও এক কংগ্রেস অধিবেশনে যেই না তিনি ‘বাপু’-কে সম্বোধন করলেন ‘মিস্টার গান্ধি’ বলে, অমনি হা-রে-রে-রে! হুংকার উঠল, “কেন বললেন মিস্টার গান্ধি? ‘মহাত্মা’ নয় কেন?”
কিন্তু খুব কি অন্যায় করেছিলেন জিন্না। আমরা যদি গান্ধিকে শুধু ‘গান্ধিজি’ বলে ছাড় পাই, তো জিন্নাই বা পাবেন না কেন? একই তো অর্থ এই ‘জি’ নামক অ্যান্ড্রোজিনাস প্রোনাউনটির। ‘জি’ মানে ‘মিস্টার’। যেমন ‘নেতাজি’-র মানে, ‘মিস্টার লিডার’ (ঠিক শ্রদ্ধেয় নেতা বা ‘রেভার্ড লিডার’ নয়)। একটু বাড়তি শ্রদ্ধা অবশ্য এতে আছে। অনেকটা ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট স্যার’ বলার মতো। ভদ্রতার, সৌজন্যের বোঝার উপরে শ্রদ্ধার শাকের আঁটি। চিরজীবিত, চিরপলাতক সুভাষ বসু হয়তো এখনও অস্বস্তি বোধ করেন।
বা, হয়তো এটাই তিনি চেয়েছিলেন। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে (জন্ম, ১৮৯৭) তিনি বর্মার জঙ্গলে, বিদেশ-বিভুঁইয়ে দিন কাটাচ্ছেন তাঁর আজাদ হিন্দু ফৌজিদের সঙ্গে। স্বপ্ন দেখছেন। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। দিল্লি দখলের স্বপ্ন। গোটা হিন্দুস্তানের জন-গণ-মন-অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন।
এই কারণে কংগ্রেসি কূটকচালির রাজনীতি ছেড়ে, সুভাষ তখন গায়ে তুলে নিয়েছেন ফৌজি উর্দি, কোমরে ফৌজি রিভলবার। মাথায় নাক-উঁচানো ফৌজি ক্যাপ, পরনে খাড়া কলার, ব্রেস্ট কর্ডস, যোধপুর আর স্পেশালি ডিজাইনড এপোলেত- স্বর্ণালী তারকাখচিত শোলডার স্ট্যাপস। তাঁর মিলিটারিজম তথা ক্ষাত্র রাজনীতির মূল ভাব।
এই সুভাষ যেন অন্য গ্রহের মানুষ, দেখে আর চেনা যায় না। গান্ধি-অনুরাগী, শান্তশিষ্ট, গণতান্ত্রিক সুভাষের চেহারাটা বাঙালির একেবারেই পছন্দসই নয়। কেননা, তাতে অত রণদামামার হুংকার নেই, বিউগ্ল বাজে না তাতে।
অবশ্য তখন থেকেই বাঙালির এই ‘সোনার চাঁদ’টি কথায় কথায় বেড়ে উঠছেন। কলকাতার মেয়র হিসাবে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণের (১৯৩০ সাল) দিনেই যা ধরা পড়তে থাকে। আগের দিনই সুভাষ আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। জেলে থাকার সময়ে রাজনীতির বইয়ে ডুবে থাকতেন। পাঠ্যতালিকার প্রিয় বইয়ে ছিল, ফ্রান্সেসকো নিত্তি-র ‘বলশেভিজম, ফ্যাসিজম অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি’, আইভ্যান হো, বনোমি-র ‘ফ্রম সোশ্যালিজম টু ফ্যাসিজম’ (তথ্য: ‘ব্রাদার্স এগেনস্ট রাজ’, লিওনার্ড গর্ডন)। ওই ধরনের বইপত্রই সম্ভবত তাঁর ওই ভাষণকে প্রভাবিত করেছিল। কেননা, সুভাষ বলেছিলেন, “…আমাদের এই নীতি ও কর্মসূচি, আধুনিক ইউরোপ যাকে সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ বলে থাকে, তার একটা মিলমিশ।”
সেদিন থেকেই শুরু। পরবর্তীকালে সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের এই জগাখিচুড়িটি বারংবার লেটমোটিফের মতো ফিরে এসেছে তাঁর ভাষণে, রেডিও বক্তৃতায়, লেখাজোকায়। এই উদ্ভট তত্ত্বটিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনপথের চলার সঙ্গী, কমরেড-ইন-আর্মস। এই দুই বিরোধী মতাদর্শের সোজা-উলটো টানেই ভেসে গিয়েছিল তাঁর অন্তর-বাহির। তাঁকে বদলে দিয়েছিল জ্যাকবুট-ব্যাটন- ফিল্ড মার্শাল চরিত্রের মেক-ওভারে। যার সঙ্গে খাপ খায় ওই কুচকাওয়াজি গানা-“কদম কদম বাড়ায়ে যা।” এই স্লোগান, “চলো, দিল্লি!”
শেষোক্ত স্লোগানটির অনুপ্রেরণা যে নাৎসি জার্মানি বা সাম্রাজ্যবাদী জাপান, সে কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। ১৯৪২-এর এক ভরা শ্রাবণে বর্মার জঙ্গলে রোগাক্রান্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন আজাদ হিন্দ ফৌজিদের উদ্দেশে এক রেডিও-ভাষণে সেই তথ্য ধরা দেয়। সুভাষ বলছেন, “ফ্রান্স ১৯৩৯ সালে যখন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, জার্মান ফৌজিদের তখন একটাই রণরব- ‘প্যারিস চলো, প্যারিস’। নিপ্পনের সেনারা ১৯৪১-এর ডিসেম্বরে যখন যুদ্ধযাত্রা শুরু করলেন, তখন তাঁদের স্লোগান ছিল, ‘সিঙ্গাপুর চলো, সিঙ্গাপুর’। আমার ফৌজি ভাইরা, আমার কমরেডরা, আপনাদের স্লোগান হোক, ‘চলো দিল্লি, চলো দিল্লি’।”
কিন্তু কেন সমাজতান্ত্রিক সুভাষকে অনুপ্রেরণার সন্ধানে নাৎসি জার্মানি, ফ্যাসিস্ত ইতালি বা সাম্রাজ্যবাদী জাপানের দিকে মুখ ঘোরাতে হচ্ছে? প্রথমে তো সোভিয়েত ইউনিয়নেই ছুটেছিলেন (ভায়া আফগানিস্তান, চোরাপথে)। রাশিয়ার কাছে আমল না পাওয়ার কারণেই কি এই বদল?
তাঁর বাঙালি অনুরাগী, সমর্থক, ভক্ত-শিষ্যরা অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, রাজনীতিতে ন্যায়-অন্যায় সূক্ষ্ম বিচারের চেয়ে দেশের স্বাধীনতাটিই ‘নেতাজি’-র প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। তা ছাড়া, ও সব ন্যায়বিচারের দায়িত্ব তো লাঠি-হাতে বুড়োটা নিয়েই নিয়েছে। ‘নেতাজি’-তে ওসব তঞ্চকতা পাবে না বাবা! তিনি ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ বলে মনে করতেন। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার সোজা-সাপটা ম্যাকিয়াভেলিয়ান থিওরি। ব্রিটেনের জাতশত্রু রাশিয়া, অতএব রাশিয়া আমার বন্ধু। নাৎসিরা খুনে, ফ্যাসিস্তরা স্বৈরাচারী, সাম্রাজ্যবাদীরা ক্ষমতা-খ্যাপা। হোক না, তাতে তোর-আমার কী? ওরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে এককাট্টা, সুতরাং ওরা আমার বন্ধু। আপত্তি আছে?
এই পাটিগণিতের সহজ অঙ্কের পিছনে একটা জটিল ক্যালকুলাসও যে কাজ করে, তা বাঙালির নজর এড়িয়ে যায়। সমাজতন্ত্র, নিঃসন্দেহে, সুভাষকে প্রভাবিত করেছিল। যৌবনে, বিলেতে থাকার সময় যেমন জ্যোতিন্দ্র বসুকেও (আমাদের শ্রদ্ধেয় ‘জ্যোতিবাবু’) করেছিল। বাংলার এই দুই গ্ল্যামারাস বসু-র সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাদীক্ষাও বিলেতের লেবার পার্টির কাছ থেকেই পাওয়া। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কাছ থেকে সুভাষ বেছে নিয়েছিলেন এর কর্তৃত্ববাদী ঢংটা। সমাজতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ আর দেশপ্রেমের উন্মাদনার হাঁসজারুটিই সুভাষের পলিটিক্যাল থিওরি। সম্ভবত এর জন্যই তিনি কামাল আতাতুর্কের তুর্কিতে যেতে চেয়েছিলেন। ভিসা মেলেনি।
না মিলুক, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে হতাশ সুভাষের বার্লিনযাত্রা ঠেকানো যায়নি। ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে হিটলারের ওয়াফেন-এসএস সংগঠনে জঙ্গি-জোটও বাঁধলেন। ভারতীয় সদস্যদের যেখানে সুভাষের পাশাপাশি হিটলারের নামেও শপথ নিতে হত। তবে হিটলারও শেষ পর্যন্ত নিরাশই করেছিলেন আমাদের ‘নেতাজি’-কে। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারত ছিনিয়ে নিতে তাঁর কোনোই আগ্রহ ছিল না। ভাগ্যিস। থাকলে কী হত ভাবতেই তো হাড় হিম হয়ে যায়।
না, সবার হয় না। কালচার-ভালচার বাঙালিরা মুখে যতই চণ্ডীদাস-লালন- রবীন্দ্রানুরাগী হন না কেন, ভিতরে ভিতরে হিটলার তাঁদের ‘হিটুদাদা’, “কী মারটাই না মারছে সাহেবদের।” যাবতীয় মানবিক ক্যাডিকশনের ডিপো এই আপাত নিরীহ জাতকে একটু তলিয়ে দেখুন। এঁদের কাছে রামপ্রসাদের ছোট- কৃষ্ণকলিসম কন্যেটির চেয়ে অনেক প্রিয় খড়গহাতে, রক্তজিভের করালকালী। সেই রুধিরময়, নরমুণ্ডমালা-পরিহিতা আর ছাগরক্তলেহীন তামসীই বাঙালির সেরা দেবী। ব্যোম্ কালী, কলকাত্তাওয়ালি।
তা ছাড়া যে জীবন বাঙালির ধাতে সয় না, সেটাই বাঙালির আরাধ্য, উপাস্য। নিয়ম-শৃঙ্খলা বাঙালির রক্তে নেই। অথচ এই সেদিন পর্যন্ত শহরে সামান্য গণ্ডগোল হলেই বলে বসতেন, “আর্মি নামাও”। তো, সুভাষের মতো ডিসিপ্লিনারিয়ান বাঙালির হিরো হবেন, নাকি হব আপনার-আমার মতো থোড়- বড়ি-খাড়ার নিয়মে বাঁধা ভিতু লোকেরা? কাঁহা রাজা ভোজ, কাঁহা গঙ্গারাম তেলি?
আসলে বাঙালি শক্তের ভক্ত, নরমের যম। দেখেননি পকেটমার, ছিঁচকে চোরকে কী পিটুনিটাই পিটতে পারেন ভদ্রলোক বাঙালি? আর পুলিশ দেখলে এখনও একটু ঘেবড়ে যান। বর্ণহিন্দু বাঙালি (সুভাষের বারো আনা ভক্ত) মনেপ্রাণে বীররসে, ক্ষত্রিয় তেজে বিশ্বাসী। বিশ্বাস করেন ব্রাহ্মণ্যের উচ্চতায়, শূদ্রের হেয়ত্বে। যে কারণে পাঁচশো বছর রাজত্ব চালিয়েও বৌদ্ধ পালরাজাদের (‘শূদ্র’) দ্বাদশ শতকে বাংলার সিংহাসন ছাড়তে হয়েছিল ক্ষত্রিয় সেনবংশীয়দের কাছে পরাস্ত হয়ে। বাঙালি এক গালে চড় খেলে দু’গালে চড়িয়ে দিতেই চান। সাধ আর সাধ্যে তফাত থাকলেও।
সে কথা সুভাষ জানতেন। আর ঠিক সে রাস্তাতেই রাজনীতির যুদ্ধের ঘোড়াটি চালাতেন। তিনি বাঙালির হিরো ‘নেতাজি’ হবেন, না কি হবেন কোথাকার কে এক ‘ডান্ডি-বুড়ো-গান্ধি’? বললেই হল? ইল্লি?
প্রথম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮, একদিন লাইভ