একুশ না পেরোতে পারা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও যদি বেঁচে থাকতেন। বয়স নিশ্চয়ই হত বাষট্টি-তেষট্টি। চেহারায় মনে নিশ্চয়ই নেমে আসত ঈষৎ ভার আর সময়ের বিষণ্ণতা। চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ যদি হঠাৎই গিয়ে পড়ত তাঁর প্রায় আঠারো বছর বয়সেই লেখা ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতার উপর? নিজের ছেলেমানুষি দেখে নিজেই কি একটু লজ্জিত হতেন না? নিতান্তই হাত-পাকানোর মতো, আবেগে ভেঙে পড়ার মতো ওই কবিতাটি পড়ে? ওরকম ‘ঝুঁকি’র সঙ্গে ‘উকি’, ‘পুণ্য’র সঙ্গে ‘শূন্য’, ‘বাধা’র সঙ্গে ‘কাঁদা’, ‘যন্ত্রণা’র সঙ্গে ‘মন্ত্রণা’র মিলে বা গোঁজামিলে? অথচ কবিতার শেষ লাইনটা- ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’- কিরকম সাধে আহ্লাদে ভরপুর হয়ে ওই বয়সে অপরিণত কবিকিশোরের জয়জয়কার করে উঠেছে। আজ, এই ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দেও। আর কয়েকদিন পরেই ভোট। এবং এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের প্রায় ৫০ কোটি ভোটারের বেশ বড় একটা অংশ- প্রায় সাড়ে তিন কোটি ওই কবি সুকান্ত-র আঠারো থেকে একুশের দল। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই পঁচিশ লাখ নবনবীন ভোটার।
‘এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।’
এ কথা সুকান্ত যেমন বিশ্বাস করতেন, রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে জ্যোতি বসু, অটলবিহারী বাজপেয়ী, মায় দেবীলালও নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছেন, না হলে আঠারোর এই সাংবিধানিক স্বীকৃতিতে সব রাজনৈতিক দলগুলির এই ঐকতান কেনই বা হবে? এবং সব দলই বা কেন দাবি তুলবে যে নূতনের কেতন ওড়ানোর ব্যাপারে তারাই অপ্রণী? এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, ভোটারদের ন্যূনতম এই বয়স একুশ থেকে নামিয়ে এই আঠারোয় করার পক্ষে রায় দিয়েছেন নানা পক্ষ-বিপক্ষের প্রায় সব কটি রাজনৈতিক দল ও নেতা। দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তো বটেই। অশীতিপর বৃদ্ধ দেবীলালও। কমপিউটার এবং প্রযুক্তির জোর কদমে, বয়সে-ব্যবহারে-আচরণে রাজীব না হয় বরাবরই ঘোষিত অর্থেই প্রথাবিরোধী। কিন্তু জাঠানেতা ফুলপতি দেবীলাল? দেবীলালও কি সুকান্ত বা সুকান্তর মতো কাউকে পড়ে ফেললেন? সবাই হঠাৎ এত তারুণ্যের অধিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে? ডাল মে কুছ কালা নেই তো?
আর, কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম ভালবেসেছি বলে সবছি কেন হঠাৎ জানাতে চাইছেন এই জাগ্রত বসন্তের দূত তাঁরা, তাঁরা এবং একমাত্র তাঁরাই। পাঁচের দশকে কলকাতা-কাঁপানো ছাত্রনেতা, এক্ষণে সি-পি-অইয়ের প্রাজ্ঞ, সুস্থির, মধ্যবয়স্ক সাংসদ গুরুদাস দাসগুপ্ত-ই বা কেন স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন যে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে’ তাঁরই ‘মিড ফিফটিজ’-এ উত্থাপন করেছিলেন ভোটার তালিকায় এই নবনধীনদের অন্তর্ভুক্তির দাবি। এবং ‘নেহরু ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।’ এবং সেই অবিভক্ত পার্টি থেকে ষাটের দশকে ভিন্ন হওয়া সি পি আই এমের ছাত্র সংগঠন এস-এফ-আইয়ের রাজ্য-সম্পাদক সুজন চক্রবর্তীই বা কেন জোর দিয়ে বোঝাতে চাইবেন, ‘আঠারো বছর বয়সকে ভোটাধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য’ এ রাজ্যের বামপন্থী ছাত্র-বুষ আন্দোলন ‘বহু বছর ধরেই সচেষ্ট’। এই জয় রাজীবের টুপিতে বাড়তি কোনও পালক নয়।
যদিও ‘রাজীবই কাজটি করেছিলেন তরুণদের সম্মান জানাতে।’ স্বভাবতই এ কথা বলছেন এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়ানো লোকসভাপ্রার্থী প্রদীপ ভট্টাচার্য। ‘জ্যোতিবাবু ময়দানের মিটিংয়ে যতই বলুন কেন রাজীব এই অধিকার দিয়ে ভোট কিনতে চাইছেন।’ ছাত্রদের সঙ্গে দৈনিক মেলামেশি করা অধ্যাপক প্রদীপবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস তরুণরা রাজীবের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থক। বিক্রিবাটার প্রশ্ন নেই।
যে কোনও রক্তমাংসের মানুষের মতো প্রদীপ ভট্টাচার্যের এই বিশ্বাসে নিশ্চয়ই খানিকটা অহমিকাও মিশে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, জ্যোতিবাবু এ রকম মনে করলেন কেন? তা হলে কি সুকান্তর আঠারোদের উপরে আস্থা কমছে? যে ‘বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়’, যে বয়স ‘বাঁচে দুর্যোগ আর বাড়ে’, সেই আঠারোর দলকে কিনবেন কি করে রাজীব? তরুণরা অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট তথা অচলায়তন বিরোধী, এই বিশ্বাস তবে কি মজবুত নেই বামপন্থীদের? নাকি বামফ্রন্ট সরকার নিজেই গত বারো বছরে আঠারো থেকে একুশের চোখে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত। আঠারোর পদাঘাত কি তাদের উপরও পড়তে পারে। অন্তত সেরকম আশঙ্কা-উদ্বেগ কি আছে তাঁদের?
না, এ উদ্বেগ একেবারেই নেই এস এফ আইয়ের। অন্তত সুজনবাবুর কথা শুনে তো তাই মনে হয়। এ প্রশ্নের পাল্টা জবাবে দ্বিধাহীন গলায় বলে গিয়েছিলেন ‘এবারের নির্বাচনের লড়াইটা মূলত কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে। কেন্দ্র সরকারই এসট্যাবলিশমেন্টের প্রতীক। এবং বামফ্রন্ট প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার। এ রাজ্যের ছাত্র-যুব সবাই বামফ্রন্টকেই ‘অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট’ বলে মনে করেন।”
ঠিক এতটা অ্যালজেবরার সহজ ফর্মুলার মতো না হলেও গুরুদাসবাবুর গলাতেও মোটামুটি একই সুর: ‘এবারের নির্বাচনটা হচ্ছে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রশক্তির রদ-বদলের প্রশ্নে।’ ‘এবং যুব প্রজন্ম স্থিতাবস্থার বিরোধী।’ অতএব!
বলা বাহুল্য প্রদীপ ভট্টাচার্যও একই রকম কথায় বিশ্বাস করেন। যে, যুবকরা যেখানে প্রচণ্ড ভাবে ‘হতাশ’। যে-রাজ্যে ‘শিক্ষিত বেকার পঞ্চাশ লাখ।’
অতএব আকাশে বাতাসে গভীর দ্বন্দ্ব, কে আগে কাড়বে যুঁথির গন্ধ। কিন্তু যুথি কি জানে সে কার? রাজনৈতিক নেতারা তো আনেন যুব-প্রজন্ম অচলায়তন বিরোধী, অতএব রাজীব গান্ধী বিরোধী। কিন্তু নওল কিশোর, নওলা কিশোরী ভোটারেরা কি জানেন সে-কথা?
তরুণদের প্রকাশিত মতামতের অন্তত বরা পড়ছে না সেটা। অল্পবয়স্ক ভোটারদের মতামত যাচাইয়ের প্রকাশিত সমীক্ষাগুলি কিন্তু অন্য রায় দেয়। (‘ইন্ডিয়া টুডে’, ‘ইলাসট্রেটেড উইকলি’ এবং ‘দ্য উইক’-এ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছিল এই সমীক্ষাগুলি)। রাজীব গান্ধী বা বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ- এ দুইয়ের মধ্যে কে ভাল প্রধানমন্ত্রী হবেন এ প্রশ্নে রাজীবের সমর্থনেই রায় দিয়েছেন সিংহভাগ তরুণ ভোটার। ব্যক্তিগত সততা, প্রশাসনিক উৎকর্ষ, গরিবের ভাল করা ইত্যাদি বাকি প্রশ্নেও রাজীবই ঊর্ধ্বে। সমীক্ষাগুলি অবশ্য হিন্দি বলয়ের তরুণ ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপারটা অন্য রকম বা একেবারে উল্টো রকম হতেই পারে।
উল্টোভাবে দেখতে গেলে বড়লোকেরা আর ততটা যামবিরোধী নয়। এখন লা মার্টিনিয়ার স্কুলের সতেরো-আঠারো বছরের মেয়েরা শুধু কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পৌত্রীকে নয়, মুখ্যমন্ত্রীকেও ‘তাদের পরম আদরের ঘনিষ্ঠ মানুষ, পাশের বাড়ির লোক বলে মনে করে।’ উদ্ধৃতি চিহ্নের ভিতরের কথাগুলি লা মার্টিনিয়ার ফর গার্লস-এরই তরুণী শিক্ষিকা রূপা সিং দেও-এর। রাপার কথায় ‘ওরা রাজীব গান্ধীকেও পছন্দ করে। দেশে কমপিউটার এবং প্রযুক্তির জোর কদমের জন্য আবার নেহরু পরিবারের খানদান-রাজ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।’ রাজীবকে পছন্দ করতে গিয়ে ‘ওরা জ্যোতিবাবুকেও বাদ দের না। তাঁকেও খুবই পছন্দ করে।’ এক কথায় কে কতটা কাজের কাজ করে তাই নিয়েই ওদের আগ্রহ।
সন্দেহ একটাই। অত্যন্ত নিচু গলায় করা হলেও বামদরদী কণ্ঠ থেকেও ইদানীং এটা শোনা যাচ্ছে। অত্যন্ত সাবধানে দেওয়ালের কান বাঁচিয়ে। যে, পশ্চিমবঙ্গের শহর ও শহরতলি এলাকার তরুণ ভোটাররা রাজীব সম্পর্কে তত আস্থা না থাকলেও কংগ্রেসের দিকেই শেষমেশ ঝুঁকতে পারে। তবে প্রামাঞ্চলে বামফ্রন্ট এখনও এবং আরও বহুদিন নিশ্চিন্ত- হাওয়া বদলের সমূহ বিপদ নেই। শহরাঞ্চলে বাম-বিরোধিতার কারণ নাকি বিগত দশক জুড়ে বামফ্রন্ট নেতাদের আদর্শহীনতা। কথা এবং কাজের পার্থক্য। লোভ। দুর্নীতি। এবং তরুণ-যুবকরা আর যে তত কিছু প্রতিষ্ঠানবিরোধী নয় (প্রতিষ্ঠান বলতে যদি বোঝায় একটা সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক নিরাপদ সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে ট্রাডিশনের একটা মূল্য এবং গুরুত্ব আছে) পশ্চিমবঙ্গেই তার ঢের ঢের প্রমাণ মিলছে। বড়লোকের ঘরের ছেলে হলেই (‘হলদিয়া পেট্রোকেম, কলকাতার উন্নতি’) কে কোন দলের তা নিয়ে ওদের কোনও মাথা ব্যথা নেই।
এরা না হয় অভাব-অনটনের মধ্যে না-থাকা, বন্যা-মহামারী-দুর্ভিক্ষের ছায়া না মাড়ানো উঁচু ঘরের মেয়ে। কিন্তু যারা কলকাতার বাইরে গ্রাম-গঞ্জ-মফস্বলের? তারা? যেমন ধরা যাক চাকদা কলেজে বি-এ ফার্স্ট ইয়ারে পড়া চাকদা সেবাগ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারের মেয়ে অষ্টাদর্শী ফিরদৌসি বেগম। যে বিয়ে করলে ‘মুসলমানকেই’ করবে। যে নারী স্বাধীনতা নিয়ে ‘এত বাড়াবাড়ি পছন্দ’ করে না। অথবা, দৃষ্টান্ত ধরা যাক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফার্স্ট ইয়ার অনার্স’-এর ছাত্রী বছর আঠারোর যেয়ে শম্পা ব্যানার্জিকেই। এদের দুজনেরই বা কেন রাজীবকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলে মনে হয়, অথচ ‘জ্যোতি বসুকেও বেশই ভাল লাগে’?
চলতি দুনিয়র সম্পর্কে একটা জ্ঞান- ভাসা-ভাসা ওপর-ওপর হলেও-এদের দুজনেরই আছে। শম্পা এখনও পর্যন্ত শেকসপিয়র না পড়লেও ‘লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’ বলে যীশুর জীবন নিয়ে বিতর্কিত মার্কিন ছবিটির কথা শুনেছে। ফিরদৌসি ‘বকর্স’ না বুঝলেও সাহবানু মামলা সম্পর্কে খবরাখবর রাখে। এবং দুজনেই জানে সলমন রুশদির বিতর্কিত ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বিষয়ে। বিবিধ বিষয়ে দুজনের দু ধরনের মতামত। রুশদি বিষয়ে, সাহবানু মামলার ব্যাপারে, নারী-স্বাধীনতার ব্যাপারে শম্পার প্রগতিবাদী স্পষ্ট উচ্চারণ, ফিরদৌসি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত শিক্ষা ও ধর্মের দোটানায়- কিন্তু রাজীব গান্ধী এবং জ্যোতি বসুর বিচারে দুজনের মতামত প্রায় একই রকম।
‘রাজীব পয়সা চুরি করতে পারেন না’ বলে নির্দ্বিধায় মনে করে ফিরদৌসি। রাজীবকে অতটা নম্বর না দিলেও শম্পাও মনে করে না যে রাজীব সরকারের দুর্নীতি ‘প্রমাণিত’। ‘দুর্নীতির অভিযোগ আনলেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না।’ বলল শম্পা। এবং বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহও ওর বিচারে একেবারে কিছু সাধু মহাপুরুষ নন। ‘প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখা দিলেও’। যেমন জ্যোতি বসুকে ‘নেতা হিসাবে শ্রদ্ধা’ করলেও তাঁর ‘সব কাজ সমর্থন’ করে না সে।
ডেঁপো? এঁচোড়ে পাকা এই ছেলেমেয়েগুলো? যে বয়সে কুমারসম্ভবের অষ্টম সর্গ দূরে থাকুক জিওমেট্রি-বক্সের সেট স্কোয়ার বা তেকোনা কাচ দেখলেও লজ্জা, উত্তেজনা, কামনা জেগে ওঠে, যে-বয়সে সব কিছুতেই হাঁ-মুখ হয়ে যায়, সে-বয়সে এত ‘পাকামি’ কি স্বাভাবিক? ওই যে বাকুঁড়া-বৃন্দাবনপুরের ক্লাস এইট অবধি পড়া সদ্য-যুবক কানাই বাউরি। প্রতিদিন ভাগলপুরে আরও কজন মারা গেল তার হিসেব নিকেশ রেখে চলেছে এবং রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্কের ব্যাপারে গম্ভীর সে মন্তব্য করছে, ‘আমার তো মনে হয় মিউচুয়াল করা উচিত’, তার গাঁয়ের জ্যাঠামশাই তো হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠতেই পারেন, ‘ব্যাটা তুই রাজনীতির কি বুঝিস রে?’ বা এই যে, যাদবপুর ইউনিভার্সিটির খার্ড ইয়ার ফার্মেসির ছাত্র একুশ বছরের সঞ্জয় দাস ও শান্তনু রায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার পদ্ধতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হতে গিয়ে দুজনেই গত জুলাই-আগস্ট মাসভর ব্যস্ত, উত্তেজিত ছিল। শপথ নিয়েছিল ‘আমৃত্যু অনশন’ করবে বলে। এবং একটা সময়ে বিরাগভাজন হয়েছিল কর্তৃপক্ষ ও এস-এফ-আইয়ের। মৃত্যু কি এতই সোজা?
এদের মধ্যে শান্তনু যখন রাজীবকে ‘অক্ষম’, ‘একটা শো-পিস’ বলে মন্তব্য করে যা সঞ্জয় যখন বলে, ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’ বা দুজনেই যখন সমস্বরে বলে ওঠে ভোটারদের বয়স কমানোর ব্যাপারে একটা ‘রাজনৈতিক অঙ্ক’ আছে, তখন এই নব্য ভোটারদের রাজনৈতিক/ সামাজিক মানসিকতার কোন ছবিটা ফুটে ওঠে বড়দের কাছে?
অথবা ধরা যাক প্রেসিডেন্সি কলেজের কুড়ি বছর বয়সের ইংরাজি অনার্সের সেই ছাত্রটি। যে এন রাম উদ্ঘাটিত বফর্স-অন্তর্তদন্তকে উড়িয়ে না দিলেও তৎক্ষণাৎ রাজীবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে একেবারেই চার না। এটা ভুল হলে ওটা ঠিক বলে জীবনের কোনও সহজ মীমাংসায় যে আসে না। যে সিনেমার ‘পরমা’-র ব্যক্তিত্বের বিকাশ মেনে নিলেও ‘নিজের মা ও ধরনের কাজ করলে’ কখনই মানত না বলে জানিয়ে দেয়। অথবা গোয়েঙ্কা কলেজের সেকেন্ড-ইয়ার অ্যাকাউনটেনসির ছাত্র উনিশ বছরের অমিতাভ ভট্টাচার্য। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহকে যার আরও ভাল লাগার অনেকানেক কারণের একটি ‘ওঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কলঙ্কের অভিযোগ নেই’ বলে। এবং ভাল লাগে না জ্যোতি বসুকে যখন তিনি হিন্দু নবজাগরণের সমালোচনা করেন। ‘মুসলমান মুসলমান বলে পরিচয় দেবে বুক ফুলিয়ে অথচ হিন্দু নিজেকে হিন্দু বলতে পারবে না কেন?’
বা শান্তিনিকেতনের সেই নল, কিশোরী ছাত্রীটি। যে এবছরের গোড়ায় বিশ্বভারতী সমাবর্তন উৎসবের সময় আচার্য-ছাত্র প্রশ্নোত্তরের দিনে রাজীবকে জিজ্ঞেস করেছিল ‘আমরা কি প্রিয়াঙ্কার বন্ধু হতে পারি?’ যদিও সে প্রথমে বলতে চেয়েছিল ‘প্রিয়াঙ্কাকেও কি আপনি রাজনীতিতে আনছেন?’
বাস্তবে কোন ল-সা-গুতে এই জটিল মনের বিচিত্র অন্তর্বন্দ্বের, নবীন ভোটারদের একত্র করা যাবে? নিছক বয়স দিয়েই কি? বয়স্কদের থেকে অনেক বেশি মাত্রায়, অনেক বেশি চোরাগোপ্তা স্ববিরোধ কি দেখা যাচ্ছে না এদের মনে? কপালের উপর অনেক বেশি অদৃশ্য দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের ভাঁজ? সুকান্তর কবিতার থেকেও অনেক লক্ষ গুণ কালো দীর্ঘশ্বাস এবং বেদনা?
‘লক্ষ করে দেখবেন- মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ সৌমিত্র বসু বলছিলেন- ‘ড্রাগের রকমটাও কত পালটে গেছে এখনকার এই আঠারো-একুশের মধ্যে। এবং গান শোনার রুচিটাও’। সত্তরের দশকের, গোটা দুনিয়ার ছাত্র-যুব সমাজে যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, দুনিয়ার মুক্তি, মাও-এর শতপুষ্পের ডাক তখন জনপ্রিয় ড্রাগ ছিল এল-এস-ডি। ‘ঠিকই তো, এল-এস-ডি মানে তো সত্তর দশকের বিভ্রান্ত যুবকের কাছে মুক্তির আনন্দ, রঙবেরঙের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানো, এল-এস-ডি মানে ‘ট্যাঞ্জারিন ট্রিজ অ্যান্ড মার্মালেড কাইজ’ অনেক কমলা মোরব্বার আকাশ। এল-এস-ডি সেই লুসি নামক স্বর্ণকুণ্ডলা নীলনয়না কমলাবালা যে পশ্চিমের ‘স্কাই’-এ ‘ডায়মন্ড’-সহ উড়ে বেড়ায়। ‘আর আব্জ।’ ডঃ বসু বললেন, আজকের ড্রাগ ‘হেরোইন’। ‘যা ঝিম ধরিয়ে দেয়, থিতু করে দেয়।’ আর ওড়া নয়। এবারে থকে যাওয়া।
একটা প্রতীকী তফাত? কিন্তু সত্যিই তো! নেশায় হোক, স্বপ্নে হোক সত্তরের যুবকের কাছে যে-বিরাট আন্তর্জাতিক আকাশটা ছিল সেটা গেল কোথায়? যাদবপুরের সঞ্জয় দাস যদি রাজনীতির কথা বলে তো তার সিংহভাগ জুড়েই খাকে কলেজের নিজস্ব সমস্যা, পরীক্ষার সমস্যা, টিউটোরিয়াল ব্যবস্থার উন্নতির দাবি। গোয়েঙ্কা কলেজের অমিতাভ হিন্দুত্ব এবং ব্যক্তিগত কলঙ্ক বিচার নিয়েই কথা বলে যায়। ‘পরমা’ সিনেমায় ঠিক আছে কিন্তু জীবনে মানব না বলতে দ্বিধা হয় না, অত্যন্ত বুদ্ধিমান, চোখা মনের নওল কিশোরের। ইসলাম আর কলেজের বইপত্রে লেখা মানবিক মূল্যবোধে যদি সংঘাত বাধে, তাহলে ‘ইসলামকেই মেনে নেব’ বলে উঠতে কুণ্ঠা হয় না ফিরদৌসির। কেবল কাছের স্বার্থ, কেবল নিজেরটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা!
‘ওরা এটাকে বলে প্রাগমাটিজম। আসলে এটা স্বার্থপরতা। দলে মিলে কাজ করার কোনও উৎসাহই নেই ওদের কাছে। রাজনীতি তো অনেক বড় কথা, ওরা আজকাল নাটকের দল করতেও উৎসাহ পায় না। এমন কি স্কাউটও হতে চায় না।’ কিছুটা কাজ আর কিছুটা জীবনের অভিজ্ঞতার একথা বুঝেছেন ডঃ বসু।
আর অপসংস্কৃতির বিষ? কেবল হৈ-হট্টগোল, কেবল চিৎকার! এবং সেটাকেই আনন্দের পরমতৃপ্তির পরম বলে মনে করা? সুরবিহীন, ইলেকট্রনিক শব্দসর্বস্ব ফাঁকা আওয়াজকেই গান বলে খাতির যত্ন করা। নাচানাচি করা।
সেই পঞ্চাশ/ষাট দশকের সাদাসিধে সহজ সুন্দর উন্মুক্ত দরাজ এবং অশ্রুবিন্দুর মতো উজ্জ্বল কোমল গানগুলিও আজ আর নেই কেন? নিঃস্ব শূন্য হয়ে পড়ছে না কি আধুনিক গানেরও ভাঁড়ার?
‘না একেবারেই নয়, একেবারেই নয়’ বলে তৎক্ষণাৎই প্রতিবাদ করলেন ঊষা উন্মুপ। মাত্র বছর কয়েক আগে যাঁর গানকে অপসংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে অভিযোগ করেছিলেন বামফ্রন্টেরই একদা-মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী। একালের গান, যুবকদের সঙ্গীত-প্রীতি সম্পর্কে ঊষার বরং খুবই উঁচু ধারনা। ‘আই অ্যাম ফর দ্য ইউথ’- যৌবনের পক্ষে ঊষার ঘোষণা কেন? এক সময় তো মান্না দে’র ‘আয়মেরি জহরে জভি’ গানটা শুনেও একদল মনে করেছিলেন, আরে রাম রাম, এ কি গান? এই লোকটাই না আবার আধা গ্রুপদী গান গায়। ‘পুজো না ক্যায়সে ম্যায়নে গেয়ে ওঠে আহির ভৈরবে? ‘দুটো গানই কিন্তু এখন আপনার আমায় কালেকশনে থাকছে।’ ‘ইউ হ্যান্ড টু গিভ আ চান্স টু দ্য প্রেজেন্ট- যুবকদেরও সুযোগ দিন’।
চট করে তাই যুবকদের বিচারে বসতে চান না ঊষা। মনে করেন খারাপ বলে যদি কিছু যুবকদের থাকে ভালও অনেক কিছু আছে। এবং ভালর মতো খারাপেও বড়দের/বুড়োদের/রাজনীতিকদের/নেতাদের যথেষ্ট ‘ভূমিকা আছে’।
প্রসঙ্গটা অন্য হলেও প্রায় একই রকম কথা বললেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালরের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক নবনীতা দেব সেন। একদা প্রেসিডেন্সি-যাদবপুরের ছাত্রী, ষাটের দশকের শেষে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়া এবং এখন ফের যাদবপুরেই ফিরে এসেছেন যিনি। নয়া প্রজন্ম, আঠারো-একুশের দলের সঙ্গে যাঁর এখন দৈনন্দিন মুলাকাত পড়াবার সূত্রে। ‘এটা ঠিকই’, স্বীকার করলেন তিনি, যে, ‘প্রারম্ভিক সত্তর থেকে শেষ আশি-তে ছাত্র রাজনীতিতে একটা বড় বদল হয়েছে’। ছাত্ররা যে এখন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ‘কলেজের নিজস্ব রাজনীতি’তেই অব্যবহিত দাবিতেই বেশি জড়িয়ে পড়েছে এটা তিনিও খেয়াল করেছেন।
‘কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে একটা আন্তরিক ভালবাসার সম্পর্কও আছে। অন্তত যাদবপুরে।’ সেটা হয়তো আগেকার মতো লোক-দেখানো ভালবাসা নয়। শ্রদ্ধার ভঙ্গিটা হয়ত পালটে গিয়েছে। ‘সিগারেট হয়তো ছাত্ররা লুকোয় না’। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর খুবই বন্ধুত্ব আছে। এবং ভালবাসাও। যে-ভালবাসা, তাঁর মতে, সত্তরের গোড়ায় ছিল না, যখন ‘শিপ্রা সরকার বা রণজয় কার্লেকরের মতো বামপন্থী সমাজ-সচেতন শিক্ষকদেরও’ অপমান সহ্য করতে হয়েছে ‘উগ্র বাম রাজনীতি’-র কাছে। নবনীতা মনে করেন, ‘এখন রক্ষণশীলতা আসছে ঠিকই, কিন্তু ওই ভালবাসাটাও ফিরে আসছে।’
গোটা ব্যাপারটাকেই আরও একটু তলিয়ে ভাবতে চায় সুনন্দন। সুনন্দন রায়চৌধুরীর এই কুড়ি পূর্ণ হল। প্রেসিডেন্সি, সেকেন্ড ইয়ার। ভোটের বয়স একুশ থেকে আঠারোয় নামানোর ব্যাপারটায় সে অত কিন্তু উত্তেজিতও নয়, ব্যাপারটা খুব একটা আহামরিও লাগছে না তার কাছে। সব দল যে ব্যাপারটাকে তাঁদেরই জয় বলে দামামায় ঘা দিচ্ছে এ-সম্পর্কেও তার একটা সাফ জবাব আছে। তার মতে, দলগুলো তো একই চরিত্রের। শ্রেণীগতভাবে। ‘নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য সব ব্যাপারের মতো এ ক্ষেত্রেও তো একটা ভেদাভেদ তুলতে হবে।’
একটা নতুন কিছু হবে না সুনন্দন? এবারে? ‘ধু-র, কিইবা হবে? আগে উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলেরা ফল্স ভোট দিত। এবারে চোদ্দ-পনেরোর দল দেবে।’
এ ছেলে বলে কি? কোনও লাভ নেই এ সবের? শুধু মিথ্যে মিথ্যেই হয়রানি।
প্রশ্নটাকে ঘোরানোর চেষ্টা করি। আচ্ছা, সুনন্দন, এই যে এত ড্রাগের সমস্যা সঙ্গবয়সী ছেলেদের মধ্যে এবং সঙ্গে সঙ্গে এই যে এত অল্পবয়সী নতুন ভোটার- দুটোকে তুমি কিভাবে পাল্লায় রাখবে। ‘খুবই সহজ।’ বলল সুনন্দন, ‘যারা অল্পবয়সীদের ড্রাগ দিচ্ছে। তারাই অল্পবয়সীদের ভোট দিচ্ছে। যত রকম সম্ভাব্য উপারে মানুষকে নিজেদের কজায় রাখা যায়- ড্রাগ দিয়ে হোক, ভোটের অধিকার দিয়ে হোক’। ব্যাপারটা সুনন্দনের কাছে জলের মতো স্বচ্ছ। না বোঝার কিছুই নেই।
গেল, নয়া ভোটের গূঢ় কার্যকারণ। এবারে একটু সমাজ প্রসঙ্গ। নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে কি ধারণা সুনন্দনের? ‘যতদিন গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি পুরুষের সাহায্যে চালাতে হবে ততদিন ও নিয়ে কথা বলে লাভ নেই।’ এবারে কুড়ি বছরের সুনন্দন কিছুটা তিক্ত। ‘আমি কি আমার বউকে বলব যে তুমি স্বেচ্ছাচারী হও। ফালতু কথা বলে তো লাভ নেই। আমি তো চাইবই অফিস থেকে ফিরে বউয়ের সেবাই পেতে। তো?’
ছেলেটা কেমন যেন। অন্তত বড়দের তাই-ই মনে হবে। কেননা রাজীব গান্ধী ওর কাছে শাসক শ্রেণীর একটা ‘আনফিট প্রজেকশন’। অ-বাম বিরোধীদলগুলি ওর কাছে কংগ্রেসেরই ‘পার্ট অ্যান্ড পার্সেল’। বামপন্থী বিরোধী দলগুলিও শাসকশ্রেণীর কবজায় তাদেরও। তবু সুনন্দন মনে করে বামদলগুলির কেন্দ্রে একবার ক্ষমতায় আসাই ভাল। ‘কেননা তা হলে লোকের মনে ওদের সম্পর্কে যে ইলিউশন আছে সেটা কাটবে।’
ভোট দিতে যাবে না, সুনন্দন? ‘ধু-র। প্রথমে ভেবেছিলাম ভোটটা নষ্ট ফরে দিয়ে আসব তারপর দেখলাম ওতেও সময় নষ্ট।’ তো ভোটের দিন করবে কি? ‘আমি বেড়াতে যাব।’ জানাল সে। বলেই ফের ‘নিচ্ছি’ বলে সামনে রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা তুলে নিল। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হো হো করে হাসতে শুরু করল ছেলেটা। তখন তাকে ঘিরে আঠারো-একুশের ধোঁয়াশা। কম্পমান।
১৯ নভেম্বর ১৯৮৯, আনন্দবাজার