দৃশ্য এক। ভারতীয় শিল্প রুশদের হালয় জয় করছে-মস্কোভা নদী ধরে বার্জ চেপে নর্তক-নর্তকী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গাইয়ে-বাজিয়েরা চলেছেন লেনিন স্টেডিয়ামে। বিরিয়ানি পোলাও তারিফ করে চেটেপুটে খাচ্ছেন রুম্প তরুণ-তরুণীরা। ক্যামেরায় ঘনঘন ধরা দিচ্ছেন গোরবাচেভ- রাইসা- রাজীব-সোনিয়া। আনন্দে হরিগুণ গাওয়া হচ্ছে মস্কোর রেড স্কোয়ারে। মিঠুন চক্রবর্তীর দু গালে ছপাহল পড়ছে রুশ-লিপস্টিকের দাগ। শাবানা আজমি-নাসিরুদ্দিন শাহ-দীপ্তি নাভালের দলেরা আটকে পড়ছেন সই-শিকারী রুশ জনতার ভিড়ে। সানাইয়ে বিসমিল্লা খান সুর ধরেছেন আশাবরী, আহির ভৈরব। ভোর আই, গায়া আন্ধিয়ারা। মস্কো, ১৯৮৭ সাল। শুরু হয়েছে ভারত-উৎসব। জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ- তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার/বাজাই আমি বাঁশি-শ্রবণ আমায় গভীর সুরে/হয়েছে মগন…।
দৃশ্য দুই। ভারত-উৎসব, প্যারিস। আইফেল টাওয়ার, ব্রোকাদেরো এলাকা। চলছে আউল-বাউলদের একতারা-দোতারা, গুব শুব ডুগ ভুগ। শীত-কাতুরে গলায় গান ধরেছে বীরভূমের বাউল… মোর বাড়ি পাশোরিয়া মোহন বাঁশি বাজাইয়া না জানি কোন কেলে ছোঁড়া যার রে মন আমার কেমন কেমন করে… ও বঁধু হে…। চলছে আর এক পাশে রবীন্দ্রসংগীত… বঁধু কোন আলো লাগল চোখে। আরও দূরে চলছে ভাংরা- কুর্তি মলমল কি- তেরে হাত মে মেহেন্দি। সন্দেশ- ভেলপুরি- চানাচুর- উত্তপম চাটনির গন্ধ ঢেকে দিচ্ছে ফরাসি কুইজিনের, মণিরার সৌরভ। সোনের জলে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে ঘটি ঘটি গঙ্গাজল। প্যারিস পার হয়ে আরও দূরে দক্ষিণ ফ্রান্সের অ্যাভেনিওঁর প্রাচীন থিয়েটারে মাঝ রাত থেকে হেমন্তের পাতাঝরা সকালে গভীর আগ্রহ নিয়ে লোকজন দেখে চলেছেন মহাভারত। ধর্ম- অধর্ম- পরধর্মের বাণী। গান্ধারীর আবেদন। বর্ণ-কুস্তী সংবাদ। সভামধ্যে দ্রৌপদীর হেনস্থা। মহাপ্রস্থানের পথ।
দৃশ্য তিন। উদ্বোধন, ভারত-উৎসব। জাপান। ১৫এপ্রিল, ১৯৮৮। স্থান, ন্যাশনাল থিয়েটার, টোকিও। বক্তৃতা দিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। সেখানে উপস্থিত জাপানের নব-প্রধানমন্ত্রী নোগুরো তাকেসিতা। আবেগে উদ্বেল গলা রাজীবের। যা এর আগে মস্কোতে শোনা গিয়েছে গোরবাচেভের পাশে। প্যারিসে শোনা গিয়েছে ফ্রঁসোয়া মিতেরর পাশে। রাজীব বলছেন, আমাদের দু দেশেরই আছে দীর্ঘ, প্রাচীন এক অন্তহীন ভবিষ্যৎ। ভারত-উৎসব সভানেত্রী পুপুল জয়কর বলছেন, এপ্রিলের এই সময়টা জাপানে চেরি ফলে ওঠার সময়। ভারতেও এখন আমের বনে মুকুল ধরেছে। এটা উৎসবের কাল। শুভক্ষণ।
ঊষার দুয়ারে পাখির মতো পশ্চিম ও পূবের উন্নত দেশে আমাদের পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতির বোহং-যাত্রা চলেছে এখন আশির দশকে। আমেরিকা – ইংল্যান্ড ফ্রান্স জাপান। মুখল মিনিয়েচার পেইনটিং আর মধুবনিকে আমরা চাইছি সাহেবসুবোদের পাতে দিতে। তাঁদের দামি খাদ্যদ্রব্য কাভিয়ের আর কোয়া গ্রার পাশাপাশি। ফরাসি মদিরা শম্পাইন সহযোগে।
কিন্তু কতখানি সার্থক হচ্ছে এই প্রচেষ্টা? কতটা আগ্রহ বেড়েছে ভারত সম্পর্কে বিদেশীদের। যা এই উৎসবের একটি বড় উদ্দেশ্য। আশির দশক তো শেষ হতে চলল। আমাদের এই দেওয়ার বদলে মিলছে কতখানি? বা, এই দেওয়া-নেওয়ার কোনও চিরস্থায়ী তাৎপর্য আছে কি না, না কি শুধুই তা এক তাৎক্ষণিক বিহ্বলতা বা উন্মত্ততা। সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতিরও কোনও দৃঢ় যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে কিনা এই আদান প্রদানে- এই সব হিসাব নিকাশ আমাদের ভাবাচ্ছে। এ কি জয়যাত্রা? না হার মানার গান?
ভারত-উৎসবের এক উদ্যোক্তা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ কালচারাল রিলেশন (আই সি সি আর)-এর সভাপতি আর বেংকটরামনকে ৮৭ সালের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল এ ধরনের উৎসবের আদৌ কোনও উপযোগিতা আছে কি না? বিজেপি সহ কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দল অভিযোগ করেছিলেন খরা, দারিদ্র্যের চিরন্তন সমস্যাটি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদের এই অশান্ত, অসুখী সময়ে এত শক্তি, এত অর্থ ব্যয় করে দরকার কি বিদেশের মাটিতে এ-ধরনের তারত-উৎসব করার? অবশ্যই এ প্রশ্নের জবাবে বেংকটরামন জবাব দিয়েছিলেন, ‘এটা সরকারের ব্যাপার। আমি তো সরকার নই।’ পরে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ভারত-উৎসবের ফলাফল, প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের কোনও চেষ্টা করা হয়েছে কি না আই সি সি আর-এর পক্ষ থেকে। তিনি বলেছিলেন হয়েছে। ‘যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারত-উৎসবের। দেখা গিয়েছে ফলাফল খুবই ভাল। ভারতের অনুকূলেই গিয়েছে সেখানকার রায়।’
প্রমাণ হিসাবে বেংকটরামন প্রেস ক্লিপিংগুলিকে সাক্ষী করেন। তা ছাড়া বিদেশী সংস্কৃতির সংগঠন সমূহের রিপোর্টগুলিকেও তিনি গুরুত্ব দেন। তুরুপের তাস হিসাবে তিনি উদাহরণ দেন পিটার ব্রুকের মহাভারতের সাফল্যের প্রতিদিন রাত দশটা থেকে ভোর ছটা পর্যন্ত যে মহাভারত চলেছিল অ্যাডেনিওঁতে প্যারিসে।
এ কথা অবশ্য অস্বীকার করা যায় না যে ১৯৮৫ সালে ফ্রান্সে ‘লানে দ্য ল্যাদ’ তথা ভারত-উৎসবের সময় উৎসবের হাইলাইট ছিল পিটার ফ্রকের মহাভারত। সরকারি হিসেব অনুযায়ী দক্ষিণ ফ্রান্সের অ্যাভেনিওঁতে প্রথম অনুষ্ঠিত ওই নাটকে প্রতিদিনের দর্শক সংখ্যা ছিল এক হাজার। একুশ দিন ধরে চলেছিল ওখানে মহাভারত। অর্থাৎ একা অ্যাভেনিওঁতেই পিটার ব্রুক একুশ হাজার দর্শক পেয়ে গিয়েছিলেন। ছিয়াশি সালে প্যারিসেও মহাভারত নিয়ে মারমার কাটকটি কাণ্ড। হাউসফুল মাসের পর মাস।
কিন্তু যা বেংকটরামন খেয়াল করেননি তা হল, পিটার ব্রুকের মহাভারত ভারত-উৎসব-এর অঙ্গ হিসেবে দেখানো হোক আর না হোক, নিজগুণেই তা হয়ে গিয়েছিল একটি সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ। এক ধরনের শো বিজনেস যা ভুবনখ্যাত ইলমার বার্গম্যানের সুইডিস নাটা কোম্পানির কিং লিয়ার বা ম্যাডোনা-মাইকেল জাকসনের গানের মতোই লোকজনের ক্রেজ তথা ক্ষ্যাপামি-র বিষয়বস্তু। প্যারিসের পরে নিউইয়র্ক, জুরিখ, আমস্টারডাম, অ্যাডেলেইড-যেখানেই মহাভারতকে নিয়ে গিয়েছেন পিটার ব্রুক সাফল্যের কষ্টিপাথরে সেখানেই তা সোনা বলে চিহ্নিত।
জুলাই মাসে ভারত-উৎসব দেখতে জাপানে গিয়েও মহাভারতকে নিয়ে একই রকম হইচই টের পেয়েছি। চারশো মিলিয়ন ইয়েনে অর্থাৎ চার কোটি টাকা ব্যয় করে টোকিওতে ডেকে এনেছিলেন জাপানের এবং সারা দুনিয়ায়ও অন্যতম ধনী বাণিজ্য গোষ্ঠী ‘সেবু’। যাঁরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হিসাবে বিলেতের মার্কস অ্যান্ড স্পেসার, হ্যারডস, ফ্রান্সের সামারিতেন, প্রাতকে বার্ষিক টার্নওভারে টেক্কা দিচ্ছে এখন। কলকাতার পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গি পাড়া থেকে একশ গুণ বেশি জৌলুসে ভরা টোকিওর গিনজা এলাকাতে যাঁদের সব চাইতে বড়সড় দোকানটি।
আর্ট গ্যালারি, অভিজাত নাইট ক্লাব, গেইসার আধুনিক ভার্সন হোস্টেস-বার আর দেশী-বিদেশী রেস্তোরাঁতে হয়লাপ ওই গিনজাতেই সেবু গোষ্ঠী সদ্য বানিয়েছেন তাঁদের থিয়েটার হল সেজো। নামেই যার ফরাসি কেতা। সেজো তেয়াত্র। বাংলা করলে দাঁড়ায় ঋতু রঙ্গমঞ্চ। রাস্তার এধারে সেবুর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ওধারে সেবুর থিয়েটার। এধারে বিক্রি হচ্ছে দিশি-বিদেশী জিনিসপত্র, অন্যধারে চলছে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতির অভিযান। এধারে বিক্রি হচ্ছে দিশি কিমোনো এবং মার্কিন ফ্যালভিন ক্লাইন জিনস্ ও জরডাশ শার্ট। অন্যধারে দেখানো হচ্ছে কারমেনের ট্রাজেডি, শেকসপিয়েরের হ্যামলেটের জাপানি অনুবাদ। এ-পাশে পাওয়া যাবে জাপানি ভেতো-মদ সাকে এবং ফরাসি লাল মদিরা বোজোলে, ইতালির গিভঞ্চি পারফিউম, শুচ্চি জুতো, আরমানির হাই-ফ্যাশন। ওধারে দেখতে পাবেন স্পেনের কবি নাট্যকার ফেদারেকো পার্সিয়া লোরকার ‘ব্লান্ড ওয়েডিং’। বা পিটার ব্রুকের ‘মহাভারত’। সংস্কৃতি আর বাণিজ্যকে এভাবেই মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছে সেবু।
১৯৮৮ সালের জুন-জুলাই মাসে যখন ‘সেবু’ ডেকে এনেছিলেন পিটার ব্রুককে টোকিও শহরে মহাভারত দেখাতে, তখন বিশ্ববিখ্যাত নিউ ইয়র্ক মেট্রোপলিটান অপেরা (মেট) টোকিও কাঁপাচ্ছে। জাপানের নামকরা বিয়ার-উৎপাদক ‘আসাহি ব্রুয়ারিজ’ ৩০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় চার কোটি টাকা খরচ করে ‘মেট’-কে টোকিওতে এনেছে। তাদের কর্পোরেট ইমেজ বাড়ানোর জন্য। সেই একই কারণে ‘সেবু’ও ভারত-উৎসবের সূত্রে তাঁদের থিয়েটারে ডেকে এনেছিলেন ‘মহাভারত’কে। মহাভারত এবং রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা- যে দুটি কর্মসূচি ভারত-উৎসবের অঙ্গ হিসাবে সবচেয়ে সফল, সে দুটিতেই যুক্ত আছে ‘সেবু’র নাম।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বা পিটার ব্রুক-এই দুজনকে দুনিয়ার বাসিন্দারা কতখানি ভারতের বলে মনে করেন আর কতখানি সারা দুনিয়ার তা নিয়ে তর্ক করা যায়। অন্তত প্যারিস বা টোকিওর অভিজ্ঞতা আমাকে এরকমই একটা সংশয়ে পৌঁছে দিয়েছে। বলছি না যে হোমার-ভার্জিল- গায়টে-শেকসপিয়রের মতো সারা পৃথিবীতে দুনিয়ার নাগরিক হিসাবে বেঁচে আছেন রবীন্দ্রনাথ। বা মহাভারতের কৃতিত্ব ষোলো আনাই পিটার ব্রুকের প্রাপ্য। কিন্তু একথা ঠিকই যে রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে ভারত যতটা আছে তার থেকে অনেকাংশে বেশি আছেন ইয়েটস বা আঁদ্রে জিন্দ। আর পিটার ব্রুকের খ্যাতিতে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস যতটা আছেন তার থেকে অনেক বেশি আছে ইংল্যান্ডের রয়েল কোম্পানি। ১৯ বছর বয়সেই পিটার যেখানে ঠাঁই পেয়েছিলেন সহকারী পরিচালক হিসাবে। এবং জঁ ক্লোদ কারিয়ের নামক সেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র নাট্যকার, যিনি লুই মাল, লুই বুনুয়েল থেকে শুরু করে আজকের বিতর্কিত পোলিশ চলচ্চিত্রকার আন্দ্রে ভাইদার ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন।
শেকসপিয়রের নাটক করে কৈশোরেই বিখ্যাত পিটার ব্রুক বা বিশ শতকের গোড়াতেই ইয়েটস-মেসফিল্ড-পাউন্ড-এইচ জি ওয়েলস-রখেনস্টাইনের মতো মনীষীদের দ্বারা আদৃত ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ এখনও দেশ-বিদেশে স্বনামেই ধন্য। ভারত তাঙ্কিয়ে ‘বাঁচতে’ হয় না তাঁদের। ফলে ভারত-উৎসবের সাফল্যে এঁদের নাম ব্যবহার করে হয়ত আক্রমণাত্মক প্রশ্নের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, কিন্তু উৎসবের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। রাশিয়ার কথা স্বতন্ত্র। ভারত সম্পর্কে তাঁদের ‘আগ্রহে’র কারণ যে নিছক ‘সাংস্কৃতিক আকর্ষণ’ নয় তাতে সকলেই একমত হবেন। কিন্তু অন্যত্র ভারত উৎসবের পরে ভারত সম্পর্কে আগ্রহ কেমন বেড়েছে। অক্সফোর্ডে ইতিহাসের অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী আমায় বলেছিলেন ভারত-উৎসবের তুলনায় ‘গান্ধী’ ছবি দেখে ভারত সম্পর্কে বিদেশীদের আগ্রহ বাড়ে বলেই তাঁর অভিজ্ঞতা। এ বছরের গোড়ায় ভারতে রুণ উৎসবের সময় তাঁর সঙ্গে নানা কথা হয়েছিল। তিনি তখন ভারতে।
চোখে দেখা একটি প্রদর্শনীর কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করছি। গত পাঁচ জুলাই টোকিওর মেগুরো মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্টে গিয়েছিলাম ভারত-উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত সমকালীন ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী দেখতে। শিল্পীদের নামের তালিকায় ছিলেন বিখ্যাত সব আধুনিক শিল্পী। মকবুল ফিদ্দা ছসেন, কৃষেশ খান্না, যোগেন চৌধুরী, মনু পারেখ, পিরাজি সাগর, তাইয়েব মেহতা, সুনীল দাশ প্রমুখ মোট ৩০ জন। প্রদর্শনী তার আগেও দুমাস ধরে চলেছে। টোকিওর বাইরে এবং টোকিও মিলিয়ে। আর মাত্র দিন পনেরো চলার কথা এই প্রদর্শনী। ইতিমধ্যেই মাইনিচি শিমবুন, যোমুতর শিমবুন প্রভৃতি বিখ্যাত জাপানি কাগজগুলিতে এই প্রদর্শনী বিষয়ে নানা মতামত, বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়ে গিয়েছে। ভাবগর্ত সব আলোচনাও। ইংরাজি কাগজ মাইনিচি ডেইলি নিউজ লিখেছে যে বিশ শতকের ভারতীয় শিল্পীরা সনাতন ভারতশিল্প এবং পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের টানাপোড়েনের জীবস্ত প্রতীক। মুক্তদন্দু। হ্যানা-ত্যানা।
যে প্রেস ক্লিপিংয়ের ভরসা করে বেংকটরামন ভারত-উৎসবের সাফল্যের নজির দিয়েছিলেন ‘৮৭ সালের সাক্ষাৎকারে, সেদিন মেগুরো মিউজিয়ামের অভিজ্ঞতায় তার সমর্থন মেলেনি। সেটা ছিল একটা ছুটির দিন। এমনিতে যখন আর্ট গ্যালারি, মিউজিয়ামে লোক আসা বেড়ে যায়। তাছাড়া ভারত উৎসবের প্রচারও চলছে রেডিও টিভিতে যথেষ্টই। আমরা কজন ভারতীয় সাংবাদিক (যার মধ্যে একজন ভি সি আর কেনার তাড়ায় চটপট প্রদর্শনীর ক্যাটালগটি পকেটস্থ করেই ওখান থেকে হাওয়া হলেন) জনা পাঁচ-হয় মধ্যবয়স্কা জাপানি গৃহবধূ, একজন ক্ষ্যাপাটে শিল্পী (নাম সিঙ্গেরু মাতুয়োকা। বিশ্ববিষাদে ভোগেন। ‘গান্ধীর দেশ, ঈশ্বরের দেশ, গঙ্গার দেশ, শাস্তির দেশ ভারতের’ অনুরাগী) এঁরাই ছিলেন সেদিনের প্রদর্শনীর সবে-ধন-নীলমণি দর্শক। কিউরেটরও স্বীকার করলেন যে লোক হচ্ছে না মোটে।
হ্যাঁ, আরও একজন ছিলেন। পরমা সুন্দরী এক যুবতী। তাঁর নাম কেকো মাতজুরা। নাম জানতেই তাঁর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। একে সুন্দরী তায় হুসেনের ছবির সামনে তন্ময়, নিশ্চয়ই উনি জাপানের সিমোন দ্য বোতুয়া। যে ছবিটা উনি দেখছিলেন তার নাম সাইক্রোনিক পিস। একজন মৃত মানুষের ছবি। ঘন কালো অন্ধকার ভেদ করে একটা সাদা রঙের জন্তু সেই হলুদ স্নান লাশের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কেকো বললেন, ‘আমার কাছে এটাই ভারত।’ ভীষণ ইমপ্রেসড হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কী করেন? নম্র ও নিম্নকণ্ঠে তাঁর জবাব ভেসে এল: এই মিউজিয়ামেই কাজ করি। অ্যাসিসট্যান্ট কিউরেটর। লোকজন নেই তাই উপরে উঠে এলেন। চারতলা মেগুরো মিউজিয়ামের একতলায় তাঁর অফিস। সচরাচর উপরে আসার ফুরসত মেলে না।
এই সেই টোকিও, যার গিলজা এলাকায় অবস্থিত ব্রিজস্টোন (বহুজাতিক সংস্থা ফারারস্টোনের জাপানি জবাব) টায়ার কোম্পানির বানানো ব্রিজস্টোন মিউজিয়াম অব আর্ট। যে কোনও দিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত যা ভিড়ে ঠাসা থাকে। একই দিনে মেগুরোর পর সেখানে গিয়ে ছুটির দিনের ফুলে ফেঁপে ওঠা ভিড়ের চেহারাটা দেখতে পেলাম। ব্রিজস্টোন মিউজিয়াম বিখ্যাত তার ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট সংগ্রহের জন্য। ভ্যান গন্থ, রনোয়ার ছবিতে পরিপূর্ণ ইদানীং বিলেতের ক্রিস্টিজ অকশন সংস্থার এক বড় ক্রেতা জাগানি বাণিজ্য সংগঠনগুলি। ভ্যান গখের সানফ্লাওয়ার ছবিটি এক আপানি সংগঠন ৪০ মিলিয়ন ডলার দামে কিনে নিয়েছেন। হয়ত একদিন সে ছবিও ঠাঁই পেয়ে যাবে ব্রিজস্টোনে।
জাপানি ভাষায় যাদের বলা হয় সিনজিনরুই অর্থাৎ কিনা ইয়াঙ্গি তথা যুবক কর্মোদ্যম, উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেই কর্পোরেট একজিকিউটিভরা ইদানিং আর কালচার কিনতে কার্পণ্য করেন না। ফিলিস্তাইন, অর্থপিশাচ ইমেজটা মুছে ফেলতে তাঁরা খুবই তৎপর। তবু সমকালীন ভারতীয় শিল্প তাঁদের টানেনি। ওই ব্যানারে হসেন এসেছিলেন বলে হুসেনও রয়ে গেলেন কিঞ্চিৎ প্রিয়মাণ। নচেৎ হুসেন ‘টোকিওতে পরিচিত, তাঁর পিকাসো কানেকশনটা রসিক লোকজন জানেন বলেছিলেন মেগুরো মিউজিয়ামের কিউরেটর।
অন্যদিকে একা ‘রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর ছবিতে টোকিও, ওসাকা জমজমাট করে দিয়েছিলেন। টোকিওতে তাঁর আঁকা ছবির ক্যাটালগের দাম করা হয়েছিল পাঁচ হাজার ইয়েন অর্থাৎ পাঁচশো টাকা। এক টোকিওতেই ক্যাটালগ বিক্রি হয়েছে হাজার পাঁচেক। প্রদর্শনী চলাকালীন মোট লোক এসেছিলেন হাজার পঁচিশ। ‘সেবু’র সঙ্গে এই অনুষ্ঠানের সহ-আয়োজক ছিলেন আসাহি শিমবুন সংবাদপত্র। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত বার পাঁচেক জাপানযাত্রী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জাপানিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সহজ না হলেও। জাপানের মেটেরিয়ালিজমের প্রতি রবীন্দ্রনাথের তীব্র অসন্তোষ থাকলেও জাপান যদি তাঁকে তত্ত্ব ও দর্শনের জন্য জীবদ্দশায় প্রত্যাখ্যান করে থাকে ভারত-উৎসব কালে টোকিও বা ওসাকা প্রমাণ করেছে যে শিল্পী রবীন্দ্রনাথ জাপানিদের কাছে কতখানি প্রিয়। জাপানের সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘তুলনামূলক সংস্কৃতি’র অধ্যাপক ডঃ জেসন রুসোনও বলেছিলেন, ‘এত ভাল ছবি যে উনি আঁকতে পারতেন এটা আমি জানতামই না। সরলভাবে আধ্যাত্মিক বলব না। তবে রবীন্দ্রনাথের ছবি আমাকে বাইজানটাইন আধ্যাত্মিকতার কথা মনে করায়।’ ডঃ রুসোনা একজন ব্যস্ত এবং ঘোরতরভাবে আন্তর্জাতিক চরিত্রের মানুষ। এই থাকেন টোকিও তো ওই চলে যান ইয়োরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে।
‘রবীন্দ্রনাথ’ বা পিটার ফ্রকের মহাভারত ছাড়া ভারত-উৎসবের অন্য ইভেন্টগুলির প্রতি মানুষজনের কী রকম রিঅ্যাকশন হয়েছিল। অন্য ইভেন্ট বলতে, ভারতের রাজপোশাক, লোকশিল্প, কুচিপুড়ি বা কথাকলি নাচ, ধ্রুপদী শিল্প-সঙ্গীতের (মহিশূর-থাঞ্জুর চিত্রকলা, আলপনা, অলঙ্কার মুখল মিনিয়েচার, ধ্রুপদী শিল্প-সঙ্গীত ইত্যাদি প্রদর্শনী বা অনুষ্ঠান) কথা বলা হচ্ছে। জাপানে ‘সবার জন্য সঙ্গীত’ বলে একটি অ-লাভজনক সংগঠন আছে।
নাম, মিন-ওন-কনসার্ট অ্যাসোসিয়েশন। এই মিন-ওনই ভারতীয় ধ্রুপদী নাচ-গানের প্রোগ্রামগুলি স্পনসর করেছিলেন। যেভাবে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে সারা দুনিয়ার সঙ্গীত নিয়ে আসছেন জাপানে। দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্যের ছন্দও আগিয়ে রাখছেন জাপানবাসীর প্রাণে। এবং ইয়োরোপীয় সঙ্গীতও। হাগনার বা মোৎজার্ট। জুবিন মেহতার নিউ ইয়র্ক ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রাকে তাঁরা টোকিওতে ডেকে এনেছিলেন।
মিন-ওনের সহ-সভাপতি কানামে রোশিদা বলছিলেন যে জাকির হোসেনের তবলা ভীমসেন যোশির গান টোকিওর প্রাণে সাড়া তুলেছিল। ‘ভীমসেন যোশিকে আমরা অবশ্য ভাল বুঝাতে পারিনি’-তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি। ‘জাপানের মানুষ বিশেষ করে টোকিওর নাগরিকরা যতটা বেশি অভ্যন্ত পশ্চিমী অপেরার ‘ভোকাল স্টাইলে তার তুলনায় কিছুই শোনেননি ভারতীয় মার্গসঙ্গীত’-বলছিলেন তিনি। কিন্তু ‘জাকির হোসেন নাকি ভারত উৎসবের কালে টোকিওয় তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে দাঁড়ান এক নম্বর ফিগার।’ সে কেবল তাঁর তবলার আওয়াজে নয়। ‘তাঁর অঙ্গভঙ্গি, তাঁর শোম্যানশিপ পাগল করে দিয়েছিল আমাদের যুবক-যুবতীদের।’
য়োশিদার এ কথায় কিন্তু কিছু ইঙ্গিত মেলে যে শোম্যানশিপ যতটা বেশি জাপানি চোখকে টেনেছে, সঙ্গীতের ভিতরকার অনুভবের দিকটা জাপানি মনকে ততটা টানেনি। আসাহি শিমবুনের টোকিও এডিশনের শিল্প-সমালোচক তেতসুয়া সিবায়ামাও আমাকে এই এক কথাই বলেছিলেন। ভারত-উৎসব কেমন লাগছে জিজ্ঞেস করায় উনি বলেছিলেন, ‘খোলাখুলি জানতে চান তো বলব তেমন কিছু লাগছে না। হতে পারে বুঝতে পারছি না।’
আর দোভাষী-বান্ধবী (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরাজি নিয়ে বছর পাঁচেক লেখাপড়া করা) তেরুকো নিমোমিতার কাছে কথাকলি-কুচিপুড়ি ‘কাবুকির মতো বোরিং’… ‘ইস্পপ্রেসিভ অ্যান্ড বোরিং’ যুবতী তেরুকো কাফেতে বসে এ কথা বলতে বলতে হাসিতে একেবারে আটখানা। উল্লেখ করা যেতে পারে কাবুকি সেই বিখ্যাত নাট্যশিল্প (আজও যেখানে ছেলেরা মেয়ে সাজে, সুললিত ঢঙে) যার আঙ্গিক সারা পৃথিবীর নাট্যকারদের মন কাড়ে। কিন্তু ফেডেড জিনস পরা জাপানি যুবকদের তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। গিনজার এক কোণে কাবুকিজা নামে কাবুকি থিয়েটার তার সুরম্য স্থাপত্য নিয়ে বেঁচে আছে। ‘এখানে বুড়োরা আসে, আর আসে মাঝ বয়সীরা’-বলেছিলেন কাবুকিজার টেকনিকাল ডিরেক্টার তথা সমালোচক তেতসুয়া সিবায়ামা, দোভাষী তেরুকো নিমোমিতা, অধ্যাপক ডঃ জেমস রুসোন-এঁরা সব্বাই কিন্তু একটি ক্ষেত্রে একমত। পিটার ব্রুকের মহাভারত এঁদের সব্বারই ‘অসম্ভব’ ভালো লেগেছে।
কিন্তু গিটার ব্রুকের মহাভারত তো বিষয়বস্তু ছাড়া অন্যত্র তেমন ভারতীয় নয়। হতে পারে তা মহাভারতের আন্তর্জাতিক চরিত্রটা তুলে ধরতে পেরেছে সার্থক ভাবে। হতে পারে নিরবধি কাল ও বিপুলা পৃথ্বীতে মহাভারতের কোনও জাত-পাত নেই, সেটা চিরকালের মানুষের কথা। পিটার ব্রুক ভারতের মহাভারতকে সেখানেই নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু পিটার ব্রুক তো আর ভারতীয় নন। বা ভারতীয় লোকজন, কলাকুশলী, গায়ক, বাদকই বা কতজন আছে তাঁর দলে? একজন মল্লিকা সরাভাই হয়ত সেখানে দ্রৌপদী বা সত্যবর্তী সাজেন, একজন আপানি গায়ক হয়ত বা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে অভিনব করে তোলেন মহাভারতকে-কিন্তু তা বাদে এই মহাভারত যতটা পরিমাণ গ্রিক বা আথেনীয় নাট্যকারদের দ্বারা প্রভাবিত, বা প্রভাবিত রাসিন, শেক্সপিয়র দ্বারা, তার সিকির সিকি ভাগ ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রও সেখানে নেই। এবং এটা শিক্ষিত রুচির দর্শকরা সবাই মানেন। লিভিং থিয়েটারের ট্রাডিশনে (যা আমরা বাদল সরকারের নাটকে দেখি) সারা পৃথিবীতে বর্তমানে সুপরিচিতা শ্রীমতী আরিয়ান মুশকিন প্যারিসে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মহাভারত দেখে তাঁর হিংসে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এ যেন বড়ো বেশি তাঁদের চেনা নাটক। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্র অবশ্যই খুব ভাল চেনেন না আরিয়ান।
আই সি সি আর অবশ্য ব্যাপারটা এভাবে দেখতে চান না। সেই সাক্ষাৎকারে বেংকটরামন বলেছিলেন, যে জিনিসই ভারত সম্পর্কে আগ্রহ জাগায় তাই-ই ভারত উৎসবের অঙ্গ হতে পারে। গান বা নাচ বা নাটকে যদি ভবিষ্যতে কোনও রুশ-ভারত যৌথ প্রযোজনা হয় (সাক্ষাৎকারটি রাশিয়াতে ভারত-উৎসবের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া) তবে তা কি কোনও দো-আঁশলা সংস্কৃতির প্রতীক হবে না? সেসব বস্তু কি ভারতীয় আত্মার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন এ ধরনের পরীক্ষাকে তাঁরা নিশ্চয়ই স্বাগত জানাবেন। কেননা এগুলো তো আসলে আধুনিকতাকে বাদ দিয়ে নয়। একজন কথক নর্তকী যদি স্পেনের একজন ফ্লামেলো নর্তকীর সঙ্গে মিলেমিশে নাচতে চান এবং স্পেনের মানুষ যদি তাতে আনন্দ পান তা হলে এ নিয়ে তাঁর বলবার কিছু নেই।
হক কথা। বলবার সত্যিই কিছু নেই। মস্কোবাসীরা যদি মুখল মিনিয়েচারের বদলে মিঠুন চক্রবর্তীতেই পান পরিপূর্ণতার স্বাদ তাতে কারও কিছু বলবার থাকতে পারে না। বার যেমন রুচি এবং সেই রুচির মেনুকার্ডে ভারতীয় সংস্কৃতির পদগুলিকে এমন ভাবেই সাজাতে হবে যাতে অর্ডার করে রান্না খেয়ে লোকজন আনন্দ পান, এবং হজমও হয়। এটাই মোটামুটি ভারত-উৎসবের ভারতীয় উদ্যোক্তাদের বক্তব্য।
মস্কোতে ভারত-উৎসবের সময় ভারতীয় রান্নাবান্না রুশরা কেমন পছন্দ করেছেন তা নিয়ে ভোট-ও নেওয়া হয়েছিল। এক ধরনের সমীক্ষা। ভোটে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিল ভারতীয় তন্দুরি-চিকেন এবং লাল মশলা। এবং মিষ্টি, কিন্তু মস্কোবাসীরা এ-কথাও জানিয়ে দিতে ভোলেননি যে এ-ধরনের রান্না প্রতিদিনের জন্য তাঁরা সহ্য করতে পারবেন না। রোজ-রোজ এ-রান্না খাওয়া স্বাস্থ্যগত কারণেই সম্ভবপর নয়। বড়ো বেশি মশলাপাতি এতে।
পরোক্ষে ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির পশরা সাজানোর ব্যাপারেও এতে একটু ইলিত পাওরা যেতে পারে। বেভাবে আমরা নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, টোকিওতে ঢোল, মৃদঙ্গম, কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে চলেছি, দলে দলে বোইং চেপে, উল্টোপাল্টা হযবরল করে, অচিরাৎ এটা বিসর্জনের বাজনা না হয়ে ওঠে। ভারত-উৎসবকে যেন নগদ-বিদায় না পেতে হয়। ভারত-উৎসবে নিয়মশৃঙ্খলা থাকে না- এটা বিদেশের সাধারণ মানুষের একটা ধরতাই অভিযোগ।
অন্তত রাশিয়া বা ফ্রান্সে ভারত-উৎসবের এটাই ছিল মস্ত বড় একটা ত্রুটির জায়গা। শিল্পীর অভাব নেই, অনুষ্ঠানেরও ঘাটতি নেই। অভাব নিছক প্রশাসনের। কে গাইবেন, কে বাজাবেন, কখন গাইবেন, কখন বাজাবেন, কজনে গাইবেন কজনে বাজাবেন তা ঠিক করতেই উদ্যোক্তারা দিশেহারা। স্থানীর ভারতীর দূতাবাসের অফিস এই গুরুদায়িত্ব সম্পূর্ণ বইতে নারাজ, তাঁদের যুক্তিও আছে। কিন্তু দায়িত্বটা কার এ কথা সমস্যার সময় কারও মনে থাকে না। আই সি সি আর অবশ্য মনে করেন এ-ধরনের কর্মকাণ্ডে ছোটখাটো ভুলচুক থেকে যেতেই পারে। কিন্তু ওলিম্পিকের মতো বড় ও বিশালতর কর্মযজ্ঞ এর থেকে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে কী করে সম্পন্ন হয় তার সদুত্তর তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তাঁদেরও একটা যুক্তি আছে। রাশিয়ানরা চেয়েছিলেন আমরা অনেক লোকজন নিয়ে যাই। কেননা তাঁদের থিয়েটার হলগুলির মঞ্চের সাইজ বিশাল বিশাল। তাঁদের খুশি করতে গাদা গাদা লোক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায়নি।
জাপান কিন্তু দেখিয়েছে যে নিখুঁত নিয়মতান্ত্রিক তাঁরা তাঁদের জ্বলে যাওয়া পুড়ে যাওরা যুদ্ধয্যন্ত দেশটাকে ফের নিয়ে যেতে পেরেছে উদিত ইয়েনের অহংকারে, পার ক্যাপিটা ইনকামের তুলে, সেই একই শৃঙ্খলায় পরিপাটি করে সাজানো যায় ভারত-উৎসবকেও টোকিওতে ভারতীয় দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি স্ত্রী মুলে অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘ওঁরা এত বেশি নিয়মতান্ত্রিক যে বাধ্য হয়ে আমাদেরও নিয়মতান্ত্রিক হতে হয়েছে।’ এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল, জাপানে ভারত-উৎসবের ক্ষেত্রে জাপানি উদ্যোক্তাদের সিংহভাগই বেসরকারি সংগঠন। আপান সরকারও নিশ্চয়ই আছেন। তাঁদের এন এইচ কে নামক জাতীয় রেডিও-টিভি চ্যানেল ভারত-উৎসবের প্রচারের কাজে যথেষ্টই লেগেছে। কিন্তু অনুষ্ঠান স্পনসর করার ব্যাপারে এগিয়ে এসেছেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেসরকারি সংগঠন। অন্য ভারত-উৎসবে এ ঘটনা তুলনায় অনেকানেক কম।
‘সেবু’র কথা তো আগেই বলা হয়েছে। বলা হয়েছে মিন-ওনের কথাও। এছাড়াও এই তালিকাতে আছে মিৎসুই ব্যাংক, মিৎসুবিশি কর্পোরেশন, আসাহি গ্লাস, তোশিবা কর্পোরেশন, হিতাচি লিমিটেড, টয়েটো মোটর, নিসান মোটর, সুজুকি মোটর প্রভৃতি। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে এঁরাই এগিয়ে এসেছেন ভারত-উৎসবের প্রাণশক্তি হিসাবে জাপানে। স্পনসর যা সহযোগী-স্পনসর হিসাবে।
এবং এটাই আপানের দস্তুর। মস্কোর বলপয় ব্যালেই হোক আর নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান অপেরা বা ম্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন, পিটার ব্রুকের মহাভারত হোক- জাপানে তাঁদের ডেকে আনেন বেসরকারি সংগঠনগুলোই। মুনাফা লোটাটাই যার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কর্পোরেট ইমেজ বাড়ানোর ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এঁদের কিসের দায় এই কর্পোরেট ইমেজ বাড়ানোর। গড়পড়তা জাপানি যেখানে ভারত সম্পর্কে কোনওই আগ্রহ রাখে না। ভারতের থেকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে অনেক কাছের দেশ যাঁদের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? জাপানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অর্জুন আসরানিকে টোকিওতে তাঁর অফিসে বসে এ-কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। জাপান সম্পর্কে ওঁর বহুদিনের আগ্রহ, জাপানি বলতে, বুঝতেও পারেন মোটামুটি। বললেন, এটা ঠিকই, ভারতের সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতি জাপানকে টানত না বলে দু দেশের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজীবের আমলে বন্ধ দরজাগুলো খুলে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জাপানি আগ্রহটা বাড়ছে। এই উৎসবে সে-ইঙ্গিতও আছে। উৎসবের পাশাপাশি তাই জাপানের কোবেতে একটি বাণিজ্যিক মেলায় ভারতীয় প্যাভেলিয়নও চালু করা হয়েছে। আসরানি তার উদ্বোধন করেছিলেন।
‘তাছাড়া’ আসরানি আরও বলেছিলেন, ‘ইয়োরেপিয়ান ইকনমিক কমিউনিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ১৯৯০ সালের মধ্যে তাঁরা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, অবিচ্ছিন্ন, একক মার্কেটে পরিণত হবেন।’ ইয়োরোপে ব্যবসা ফাঁদা জাপানি বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর কাছে যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে একটি বড় বাধা। কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একই রকম চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চলেছে। আশপাশের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শোনা যাচ্ছে স্বনির্ভরতার স্লোগান। ‘জাপান যাবে কোথায় বাণিজ্যেতে?’
সেবু, মিৎসুই ব্যাংক, আসাহি গ্লাস, টয়েটো, সুজুকি, নিসান মোটরের ভারত-উৎসবের নানা অনুষ্ঠানের স্পনসর হওয়ার এটাই বোধহয় মুখ্য কারণ। ভারতে তাঁরা বাণিজ্য বাড়াতে চাইবেন এই মুহূর্তে তাঁদের পক্ষে এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অত বেশি দামের জাপানি পণ্য কিনবার কতটুকু ক্ষমতা আছে আমাদের এই মুহূর্তে? তাছাড়া ভারত-উৎসবের যে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যটা রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে বীরভূমের আউল-বাউলটি পর্যন্ত দ্বিধাহীনভাবে মেনে নেবেন, তা হল, আমরা তো জিনিস বেচতেই বেশি আগ্রহী। কেনার থেকে।
আসরানি অবশ্য বলেছিলেন, কিন্তু বিক্রি হোক আর না হোক (মানে আমাদের চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ আর শান্তিনিকেতনি ঝোলা আর সরোদ-সেতারের কথা অবশ্যই বলা হচ্ছে না) আপাতত এর রিঅ্যাকশনে আমাদের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট লাভবান। অনেক জাপানি ভারতে যাবেন। বুঝুন আর নাই বুঝুন ভারতের সংস্কৃতির ‘সাবেকি’ দিকটা ‘জাপানিদের একটা বড় অংশকে নাড়া দিয়েছে’। অর্থাৎ আসরানি বলতে চাইছেন, ভারতীয় টুরিজম দফতরের বিজ্ঞাপনের স্লোগান ‘ইন ইন্ডিয়া ইটস ম্যাজিক’ এবারে কাজ করবে। ভারতের ভেলকিবাজিতে মুগ্ধ জাপানিরা এবারে দক্ষিণের মন্দির আর উত্তরের হিমালয় দর্শনে ঘনঘন আসবেন, পকেটভর্তি ডলার নিয়ে। ভেসে বেড়াবেন তাঁরা বারাণসীর বজরায়। আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্সের ভারত-উৎসব এ ধরনের কোনও প্রতিক্রিয়া অবশ্য তৈরি করেনি। আমাদের পর্যটন বিভাগও তা স্বীকার করেন।
ফ্রান্সে ভারত-উৎসব চলাকালীনই এক ভারতীয় অধ্যাপক বিখ্যাত ফরাসি প্রকাশক পালিমারের সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছিলেন এবারে তাঁরা ভারত বিষয়ে বইপত্র বেশি করে হাত দেবেন কিনা। গালিমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের মার্কেট সার্ভে এমন কিছু ইঙ্গিত দেয়নি যাতে মনে করা যায়, ভারত নিয়ে বই ছাপা হলে তা হৈ হৈ করে বিক্রি হবে। অতএব ভারত বিষরে আগ্রহ বাড়ার প্রসঙ্গটির এখানেই ইতি।
তাহলে কিসের জন্য এই সব ভারত-উৎসব। আমাদের শিল্পী- সাহিত্যিক গায়ক- বাদকদের জীবনে কয়েকদিনের মুগ্ধ বিদেশের স্মৃতি? প্যারিসের সায়াহ্নের পারফিউমের? টোকিওর রাস্তায় দেখা টয়েটো-নিসানের দুরন্ত গতি, মস্কোর রেড স্কোয়ারে গ্লাসনস্তের খোলা হাওয়ার কোনও তরুণীর সঙ্গে কিঞ্চিৎ মনের প্রাণের কথা? এবং অচিরাৎ স্বর্গ হইতে পতন, সঁজেলিজের রাস্তা থেকে ফের স্বীরভূমের মেঠো পথ ধরে গান করা। এবারে যেন তা একটু খারাপ লাগে। নিজেকে যেন একটু দীন, হীন মনে হয়। গলায় ফুটে ওঠে হার মানার গান। পথের ধুলোয় যা মিশে যায়।
২৮ আগস্ট ১৯৮৮, আনন্দবাজার