স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে ‘ভমস’ ছবির সূত্রে হঠাৎই আবার জিজ্ঞাসার কেন্দ্রে এসে গেছে দেশবিভাগ সম্পর্কিত রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। যাঁরা ছিলেন এই শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ও বিপর্যয়কর ঘটনার সাক্ষী, তাঁদের স্মৃতিতে যেমন, তেমনি যাঁদের জন্ম স্বাধীনতার পরে, তাঁদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে কিছু প্রশ্ন, কিন্তু তর্ক, কিছু নতুন তথ্য অনুসন্ধানের প্রয়াস। সেই সূত্রেই প্রশ্ন ওঠে, দেশবিভাগ আমাদের সাহিত্যে, শিল্পে, চলচ্চিত্রে কতোটা প্রভাব ফেলেছে, কিংবা আদৌ ফেলেছে কিনা। বিশেষত বাংলা উপন্যাসে, গল্পে? এই প্রসঙ্গে বাংলা ভাষার অগ্রগণ্য করেকজন সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকারের বক্তব্যই বা কী?…
তমস। এই টেলিভিশন সিরিয়ালটি হঠাৎই বেশ কিছুদিন ধরে খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিনে এবং লোকমুখে বিস্তর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্র ভালো হলে আজকাল চলচ্চিত্রকার বা নির্দেশকের নামটাই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কাহিনীকার যান হারিয়ে। কিন্তু ‘তমস’ ছবির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এর পরিচালক গোবিন্দ নিহালনির পাশাপাশি আরও একটি নাম- তিনি ‘তমস’ উপন্যাসের লেখক ভীষ্ম সাহানি। অর্থাৎ দেশভাগ নিয়ে এই উপন্যাসটি লেখা না হলে যেন গোবিন্দ নিহালনি এই ছবিটি করার কথা ভাবতেই পারতেন না। এখানে সাহিত্যকে একটা বড়োসড়ো মূল্য দেওয়া হয়ে গেল। এবং এই সূত্রে (নিহালনি এবং সাহানি চারিদিকে ভুরি ভুরি ইন্টারভিউ দিয়েছেন) নিহালনির মুখ থেকে জানা গিয়েছে যে দেশভাগ নিয়ে এত অসংখ্য উপন্যাস এবং গল্প লেখা হয়েছে যে ঠিক কোনটি নিয়ে তিনি তাঁর কাজ শুরু করবেন অনেকদিন তা ভেবে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরলেন ভীষ্ম সাহানির ‘তমস’ এবং দুটি ছোটগল্প। দেশভাগ বলতে নিহালনি যে পশ্চিম সীমান্তের ভাগাভাগির কথাই ভেবেছেন তা আর বলতে হয় না। এবং ‘তমস’ ছবিতেও পূর্ব সীমান্তের ভাগাভাগি, হত্যা, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্ত হওয়ার কোনও প্রসঙ্গ নেই।
ভীষ্ম সাহানির উপন্যাস যদি পশ্চিম সীমান্তের কথা পঞ্জাবের ভাগাভাগির, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এবং রাজনৈতিক কৌদলের উপরে নির্ভর করেই গড়ে ওঠে তাহলে নিহালনির ছবিতে পূর্ব সীমান্তের কথা আসবেই বা কেন?
আমাদের প্রশ্নের গুরু এইখান থেকেই। যে বাঙালি তাঁর সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে গর্বে মাটিতে পা ফেলেন না, তাঁর সাহিত্যে, শিল্পে সিনেমায় দেশভাগের মত এমন একটি বিপর্যয়কর ও ঐতিহাসিক সত্য কতটা প্রভাব ফেলেছে? আদৌ কি ফেলেছে? বিশেষত সাহিত্যে।
তিরিশের দশক থেকে যে বাংলা উপন্যাস সাবালক হয়ে গিয়েছে সেখানে এ রকম একটিও কি মনে পড়ার মত নাম নেই? এর সঙ্গে সঙ্গেই যে প্রশ্নটি আমাদের মনকে ভাবায়, তা হল, এই দেশভাগ, উদ্বাস্থ্য সমস্যা কীভাবে নাড়া দিয়েছে আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্য-শিল্প-সিনেমাকে? কোনও নৈব্যক্তিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি সেই বিচ্ছেদের সঙ্গে? না এখনও তা পুত্রশোকের মত সান্ত্বনাহীন। ‘যাতনা শুধুই যাতনা সুচিরসাথী?’
মধ্যবিত্তের জীবনবোধ, আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক ও অপরাধবোধ যাঁর ছোটগল্প, উপন্যাসে ভিড় করে থাকে, সেই রমাপদ চৌধুরীর কাছে এটা কিন্তু আদো কোনও জরুরি সমস্যা নয়। প্রশ্নটা ‘তমস’-এর সূত্রে ওঠাতে তাঁর প্রবল আপত্তি। তাঁর কাছে ‘সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে’ একটা উপন্যাসের টিভি-চিত্রয়রূপ দেখে ‘তার সাহিত্য-মূল্যায়ন করা হচ্ছে’ ভেবে। এ রকম প্রশ্ন ‘যে পাঠকের মনে হয় তাঁর অধঃপতন ঘটেছে তিনি বুঝতে পেরেছেন। তিনি মনে করেন যে, ‘তমস’ উপন্যাসটি দেশবিভাগের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ নভেল’ তথা প্রতিনিধিমূলক উপন্যাস কিনা সে সম্পর্কে রায় দেবার অধিকার সেই ব্যক্তির নেই যিনি উপন্যাসটি পড়েননি। এবং এ কথাও সত্য আমরা অনেকেই ‘তমস’ পড়িনি। শুধু দেখেছি।
একটা প্রশ্নের উপলক্ষ প্রশ্নটার থেকেও বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায় কিনা জানি না। রমাপদ মনে করেন জরুরি নয়। তাই অত্যন্ত বিরক্তিই ছিল তাঁর এ ধরনের আলোচনায় মতামত দিতে। বাংলাভাগ নিয়ে সে-রকম উল্লেখযোগ্য উপন্যাস নেই- অন্তত তাঁর পড়া নেই- এ কথাটা বলবার পর ‘কেন নেই” এ প্রশ্নে জবাবে তিনি বললেন ‘লেখা হয়নি বলে’। এবং বলাবাহুল্য যে তিনি রসিকতা করছিলেন না। বললেন, ‘তমস’ ভালো ছবি হয়েছে বলে ‘তমস’ উপন্যাসটি যে ভালো হবে এর কোনও মানে নেই। কেন না তিনি মনে করেন খারাপ উপন্যাস থেকে ভালো ছবি হয়েছে এরকম ‘বহু’ দৃষ্টান্ত আছে। অবশ্য সে দৃষ্টান্তগুলি সেদিন তাঁর কাছ থেকে শোনা হয়ে ওঠেনি।
তবে ভালো খারাপের তর্কগুলো সব সময়েই কিঞ্চিৎ গোলমেলে। কিন্তু এটা প্রায় অনস্বীকার্য যে কালজয়ী বা ধ্রুপদী সাহিত্য (শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, বিভূতিভূষণ, আঁদ্রে জিন্দ) থেকে আমরা যতই উৎকৃষ্ট বা নিম্নমানের ছবি পেয়ে থাকি না কেন কোনও ভট্টাচার্য বা কোনও মাইতি বা কোনও হ্যারল্ড রবিনস অবলম্বনে আজ পর্যন্ত কোনো গ্রুপদী মাপের চলচ্চিত্র হয়ে ওঠেনি।
কথাবার্তার মাঝে অবশ্য বাংলাভাগ নিয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস না থাকার অন্য একটা কারণও তিনি বলেছিলেন। ওঁর মতে পঞ্জাবের ভাগাভাগি হবার ঘটনাটা যতটা নাটকীয় ছিল, বাংলার তা ছিল না। ওখানে দেশভাগ নিয়ে দাঙ্গাহাঙ্গামার তীব্রতা বেশি ছিল। ‘পপুলেশন এক্সচেঞ্জটা সেখানে শান্তভাবে হয়নি।
এখানে আবার আমাদের সংশয় জাগে। হয়নি ঠিকই। কিন্তু সেই ক্যালকাটা কিলিং-এর ঠিক বছর-ফেরা স্বাধীনতায় এখানে গণ্ডগোল হল না কেন? সেটাও তো সাহিত্যের ক্ষেত্রে জরুরি প্রশ্ন হতে পারে।
একথা ঠিকই যে, লাহোর, অমৃতসরের মতো নরমেধ যজ্ঞ ‘৪৭ সালে বাংলায় ঘটেনি। গ্রাম জ্বলেনি, গুরুদ্বার জ্বলেনি, জ্বলেনি মসজিদ-মিনার। বাস্তহারার দল গরুর গাড়ি বোঝাই হাতাখুন্তি, উনোন, তৈজসপত্র, লাঙল নিয়ে সীমান্ত পেরোনোর আগেই হত্যাকারী ছুরি-বন্দুকে ঢলে পড়েনি। গাছের বাকল খেয়ে দিন কাটাতে হয়নি গরিবগুর্বো উদ্বাস্তুদের। ধর্ষিতা হতে হয়নি অপাপবিদ্ধ বালিকার দলকে। লাহোর থেকে টুকরো টুকরো করে কাটা মৃতদেহ বোঝাই ট্রেন অমৃতসর রেল স্টেশনে এসে থমকে পড়েনি। কিন্তু কেন পড়েনি? সে কি কেবলই দালার আশঙ্কাগ্রস্ত মাউন্টব্যাটেনের আবেদনে সাড়া দেওয়া গান্ধীজির কলকাতায় আগমন হেতু বা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামক নরমেধযজ্ঞের হোতা শাহেদ সুরাবর্ণির হঠাৎই ভোল পালটানোর লীলাখেলায়? নাকি সেই বৃদ্ধ মহাত্মার উক্তিকে শ্রদ্ধা জানাতে, যিনি বলেছিলেন, আমি আমার জীবনপথের শেষে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছি। আবার তোমরা যদি উন্মাদ হয়ে ওঠো, তার সাক্ষী হতে আমি আর বেঁচে থাকব না। চোদ্দই আগস্ট মধ্যরাতে নয়াদিল্লির সংসদে নেহরু যখন বলে চলেছিলেন মধ্যরাতে ঘুমন্ত পৃথিবীর বুক থেকে জেগে ওঠা তখন হিন্দু মুসলমানের মিলিত মিছিল জানিয়ে দিল যে তাঁরা এক! বছর খানেক আগের রক্তাক্ত স্মৃতি ভুলে গিয়েই! সেই স্মৃতি ৪৬ সালের ১৬ আগস্টের ‘গ্রেট কিলিং’-এর। যা জিয়ার টুপিতে গুঁজে দিয়েছিল আর একটি জয়ের পালক। চার হাজার মৃত মানুষ, দশ হাজার জখম মানুষ এবং এক লাখ মানুষের (সংবাদ সূত্র দ্য স্টেটসম্যান) ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে সগর্বে বলতে পেরেছিলেন কারো আজম উই শ্যাল হ্যান্ড ইন্ডিয়া ডিভাইডেড… অর উই শ্যাল হ্যাভ ইন্ডিয়া ডেস্ট্রয়েড।
অর্থাৎ বাংলাভাগের ঘটনায় রক্তমুখর নাটকীয়তা কম ছিল বাঙালির ভীরুতার দোষে নয়, বরং বলা যেতে পারে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবার জন্য। আরও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার মানবিক মূল্যবোধের জন্য। যে কারণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বেপরোয়া সাহিত্যবোধের লেখকও মনে করেন যে ‘দেশভাগ নিয়ে কোনও সার্থক উপন্যাস লেখা যায় না কেন না সে রকম লেখা আর একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দিতে পারে।’ জন্মসূত্রে পূর্ববাংলার মানুষ সুনীল নিজেকে ‘উদ্বাস্তু’ বলে মনে করেন। যদিও পায়ে পায়ে পথ পেরিয়ে, সীমান্ত ডিঙিয়ে উদ্বাস্ত হয়ে আসতে হয়নি তাঁকে অলিগলির গোলকধাঁধা এ কলকাতা শহরে। তাঁর বাবা এখানে স্কুলমাস্টার ছিলেন আগে থেকেই। তবু সেই জীবনের গ্লানি তাঁর বালকজীবনের কাছে-দূরেই হড়িয়েছিল। তাঁর বেশ কয়েকটি উপন্যাসে (‘অর্জুন’, ‘একা এবং কয়েকজন’ এবং এখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ) উদ্বাস্ত নায়কের মুখ, বা জয়-পরাজয়ের চেতনার ছাপ থাকে। সত্যভাষী লেখা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ইন্ধন জোগাবে কেন? প্রশ্নের উত্তরে সুনীল বলেছিলেন, ‘কেন না দেশবিভাগ নিয়ে যদি কোনও বস্তুনিষ্ঠ সার্থক উপন্যাস লিখতে হয় তবে তার দারিত্বটা মুসলমানসদের উপরেই এসে পড়ে। যেহেতু পাকিস্তানের দাবিটা তাদেরই। আর কারও দায়িত্ব নেই? ‘আর ছিলেন কিছু কংগ্রেস নেতা যাঁরা আর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারেননি।’
হিন্দুদের কি এ ব্যাপারে কোনও ভূমিকা নেই। ‘হিন্দুরা তো দেশভাগ চায়নি’- এ কথা বললেন সেই সুনীল, যিনি বিবেকানন্দ বিষয়ে ইংরাজি কাগজে বিতর্কিত মন্তব্য করে বা ঈশ্বরকে পৃথিবীর ‘মধুরতম গুজব’ বানিয়ে এখনও, এই মধ্যবয়সেও হিন্দু মনের কাছে কিঞ্চিৎ কালাপাহাড়।
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সেই রক্তস্নাত ১৯৪৬-এর শারদীয় সংখ্যা পরিচয়-এ ছাপা হয়েছিল সমরেশ বসুর ছোটগল্প ‘আদাব’। তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ। জীবনসংগ্রামের ঘামে ভেজা এক আদর্শবাদী কমিউনিস্ট যুবক সমরেশ বসু। ‘আদাব’-এর পটভূমি ছিল ওই গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। সেই পৈশাচিকতার, রক্ত ও বারুদের গন্ধে ভরা কলকাতা শহরে একই জায়গায় আশ্রয় নিতে গিরে এক হিন্দু ও এক মুসলমানের বিপন্ন প্রাণে ক্রমশ যে হাদয়বন্ধন গড়ে উঠেছিল, তাই নিয়ে লেখা হয় এই অসামান্য গল্পটি। আজকের এই চৌষট্টি বছরের সমরেশের গলার অন্য সুর- শাহেদ সুরাবর্দির প্রতি ঘৃণা সেখানে স্পষ্ট, মুসলিম লিগের রাজনীতির প্রতি সেখানে কোনও ক্ষমা নেই, এবং সেদিনের সেই দাঙ্গার দায়িত্বের বেশিরভাগটাই সুনীলের মত একই সুরে তিনি মুসলিম লিগের সদস্য ও সমর্থকদের উপরেই দিতে চান।
দেশভাগ সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ভিত্তিতে উপন্যাস? না, সমরেশ মনে করেন না যে ওই ধরনের লেখার এখন কোনও প্রয়োজন আছে। ওতে অশান্তি বাড়বে, কমবে না। তার চেয়ে ঢের ভালো দুই সম্প্রদায়ের আত্মিক যোগাযোগের দিকটা, বন্ধুত্বের এবং সামাজিক আদানপ্রদানের দিকটা লেখালেখির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা।
সমরেশ তো ওরকম কথা বলবেই! ও কি আর কম্যুনিস্ট আছে? ও তো এখন কুঝমেলায় গিয়ে হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য গেয়ে বেড়ায়! ইত্যাদি অভিযোগ যাঁরা করেন তাঁদের কিন্তু এ কথাও মনে করিয়ে দিতে হয় যে সমরেশ বসু এখনও বিশ্বাস করেন প্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে যাঁরা কিছুমাত্র সাম্প্রদায়িকতাহীন মানবিক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন তাঁরা কম্যুনিস্ট পার্টির-ই লোকজন। তাঁরাই পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়েও। এবং সমরেশ বসু আজও মনে করেন যে কলকাতা শহরের থেকে অনেক বেশি মানসিক স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য সেদিন দেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চলগুলির মেহনতি মানুষেরা- হিন্দু ও মুসলমান, দুই সম্প্রদায়েরই। ‘অথচ গণ্ডগোলটা সেখানে ছড়ানোরই আশঙ্কা ছিল বেশি, এবং সেখানে আগুন লাগলে তা আর খামানো যেত না।’
দেশভাগের জন্য দায়ী মুসলমানরাই গৌরকিশোর ঘোষ একদমই মানেন না সে কথা। ‘৭৮ সালে প্রকাশিত ‘প্রেম নেই’ উপন্যাসের পাঠক জানেন বাঙালি বর্ণহিন্দু নিয়ন্ত্রিত সমাজের মাঝখানে দ্বীপবাসীর মতো বিচ্ছিন্ন, যে কোনও সামাজিক ধাক্কার কাছে অসহায় নিম্নবর্গের বাঙালি মুসলমান সমাজের মানবিক রাজনৈতিক ভাষা হিসাবে এই উপন্যাসটির তাৎপর্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৫-৩৭এই দুই বছরের অর্থাৎ দুই মহাযুদ্ধের অন্তর্বর্তী সময়কে পটভূমি করেই যা লেখা।
সুনীল-সমরেশের বক্তব্যের সঙ্গে গৌরকিশোরের বিস্তর পার্থক্য। ‘এঁরা যে কেন এ কথা বলছেন বুঝতে পারছি না! হয়তো তলিয়ে দেখেননি’- তাঁর এই মন্তব্য। দুই বাংলার সীমান্ত যশোরে জন্মেছিলেন গৌরকিশোর। হিন্দু সমাজের যে গড়নটা আশৈশব লক্ষ্য করেছেন তিনি, সেটা এত ‘সংকীর্ণ এবং এত ‘অপ্রেসিভ’ বলে তাঁর মনে হয় যে ‘সেই সমাজ কাউকে প্রহণ করে না’ এরকম একটা দৃঢ় ধারণা করতে তাঁর দ্বিধাবোধ হয় না। ‘একমাত্র বর্ণভেদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা’ এই সমাজ ‘প্রতিটি ছুতোয় লোককে কেবলই বার করে দেয়’ বলে মনে করেন তিনি। ‘এবং ভারতে এই সমাজের ‘আধিপত্য’ই ভারতকে ভাগ করেছে।’
ছেলেবেলার এক বন্ধুর গল্প বলছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ। মুসলমান বন্ধু। গৌরের পিসিমার কাছে রোদে ঘেমে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় সে জল চাইতে এলে বাড়ির সব চাইতে ‘অস্পৃশ্য’ ‘আঁঙুড়ের ঘটিটি’ ঘষে-মেজে তাকে জল দেওয়া হত। ওই অত তেষ্টার সময়েও নিজেদের ব্যবহারের ঘটিটি এগিয়ে দেওয়া চলতো না। ‘এই নয় যে পিসিমা ওকে ভালোবাসতেন না’- গৌরের মন্তব্য। ‘কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে বাছবিচারের এই ব্যাপারটা জটিল হয়ে পড়েছিল।’ অনেকটা ঠিক এরকমই একটা পারিবারিক স্মৃতির কথা বলেছেন শিল্পী পরিতোষ সেন। ভারতভাগ, বাংলাভাগ ব্যাপারটাকে যিনি ‘বার্লিন দেয়ালের থেকেও বেশি অ্যাবসার্ড’ মনে করেন। দেশভাগের জিঘাংসা ও হিংস্রতায় তরা দিনগুলো-রাতগুলো যাঁর নান্দনিক বোধেও এনেছিল জিঘাংসা ও হিংস্রতার প্রতি ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান। তিনিও বলেছেন তাঁদের কলকাতার বাড়ির গল্প। শৈশব এবং কৈশোরের অনেকটা বছর কাটিয়েই তবে কলকাতায় এসেছিলেন পরিতোষ সেন। বাবা ছিলেন কবিরাজ। তাঁর ওষুধ-বিসুধ তৈরি করার কাজে-কর্মে সাহায্য করত যে মেয়েটি, সে মুসলমান। বাবা খুব স্নেহ করতেন তাকে, বাড়ির লোকেরাও তাকে ভালোবাসত, কিন্তু তার ঠাকুরঘরে যাওয়ার বারণ ছিল। ঢাকা শহরেও ছোটবেলায় দেখতেন মিষ্টির দোকানি মুসলমান ক্রেতাকে মিষ্টি দিচ্ছেন ‘হাতখানেক উপর থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে। ছোঁয়াছুঁরি এড়াতে।’
একটা প্রধান সমাজ যখন মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে ভেদাভেদ দেখায় তবে সে দেশ ভাগ হবে না তো কী হবে? গৌরকিশোর ঘোষ পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ভৌগোলিক সংহতিই কি বড় কথা? মনের বিভাজন আগেই এসেছিল। ভূগোল তা কেবল অনুসরণ করেছে।’
আমার মনে হয়েছিল গৌরকিশোর সমস্যাটার অনেক ভিতর দিকটা ধরার চেষ্টা করেছেন। তাতে সুনীল-সমরেশের দেখা সত্যিটার অপমান হয় না-তবে বাড়তি একটা মনস্কতা, একটা মাত্রা পায়। গৌরকিশোরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম দেশবিভাগ নিয়ে লেখা কোন্ উপন্যাস তাঁর মতে উল্লেখযোগ্য? বলেছিলেন ‘মনে পড়ছে না। অতএব উল্লেখযোগ্য সে রকম কিছু নিশ্চরই পড়িনি।’
গৌরকিশোর ঘোষের মনে না পড়লেও অনেক পাঠকেরই হয়ত এই সূত্রে মনে পড়বে উদ্বান্তদের নিয়ে লেখা নারায়ণ সান্যালের ‘বল্মীক’, ‘বকুলতলা পি এল ক্যাম্প, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’, কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ ইত্যাদি উপন্যাস। ব্যর্থ হোক বা সার্থক হোক, এঁদের আগে এবং পরেও কিছু কিছু গল্পে বা উপন্যাসের ভিতরেও প্রক্ষিপ্তভাবে যে দেশভাগ বা উদ্বাস্তু-প্রসঙ্গ আসেনি তা নয়। কিন্তু দেশভাগ বিষয়টির ঐতিহাসিক এবং মানবিক ব্যাপকতা এতই বেশি যে সেই ব্যাপকতার হালয়-বুদ্ধিগ্রাহ্য রাপ এই সব রচনায় ধরা পড়েনি। আমাদের আরও মনে পড়বে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিংবা সতীনাথ ভাদুড়ীর কথা নয়, বরং নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সন্তোষকুমার ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর কথা। যাঁদের গোড়া পূর্ববঙ্গে। এবং ১৯৪৭-এর আগে-পরে বাংলাভাগ হবার মুহূর্তে যাঁরা ছিলেন বাংলা ভাষার সদ্য-উঠে-আসা খ্যাতিমান লেখক। এঁদের রচনাতেও দেশভাগ, উদ্বাস্তু হয়ে আসার যন্ত্রণা বিছিন্নভাবে ছায়া ফেললেও কোন ব্যাপকতা নিয়ে উঠে আসেনি কেন?
তবে কি বাঙালি সুজন-মনীষার মধ্যে ‘সেনস্ অব হিস্টরি’ তথা ইতিহাসবোধের একটা অভাব আছে? যার জন্য এত বড় একটা ঘটনা সেরকমভাবে সাড়া তুলতে পারল না? নাকি বাঙলা উপন্যাস বাস্তব-উদাসীন, ভাবনাতে আনমনা? যে কারণে সুনীলের অর্জুনের উদ্বাস্তু নায়ক কলোনির জীবনের ক্ষতযন্ত্রণার মধ্য দিয়েই কেবল নিজেকে প্রকাশিত করে তুলতে অক্ষম হয়, কলোনির বাস্তবতার ভিতরেও জীবনবিমুখ একটা লোভনীয় ছায়াপ্রেম তাকে ঘিরে থাকে? রাঢ় জীবন এবং স্বপ্নজীবনের এযুগের অর্জুনকে? যা ‘ঘুণপোকা’য় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্যাম’ (শ্যাম একজন বাস্তহারা) এই ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়োবাড়িটার বিধ্বস্ত বর্তমানে বাস করেও, চরম বেদনাহত বোধ করেও যেন একটা শেষ আশ্রয় আছে বলে মনে করে? সুনীল আমায় বলেছিলেন, খুব একটা বাস্তবধর্মী উপন্যাস তিনি লিখতে পারেন না। একটা অযৌক্তিকতার সঙ্গে উপন্যাসে তাঁর মোলাকাত হবেই। ‘অর্জুন’ও যে সে অর্থে লক্ষ্যভ্রষ্ট, এটা তিনি স্বীকার করেন।
যেমন শীর্ষেন্দুও স্বীকার করেন যে তাঁর ‘খুব একটা ইতিহাস নেই।’ তিনিও সুনীলের মত জন্মসূত্রে পূর্ববাংলার, তবে বাবা ‘অপশান’ দিয়ে এপারে চলে আসেন, ছিন্নমূল হওয়া সত্ত্বেও ‘বাবা এখানে চাকরি করতেন’। রিফিউজি কলোনিতে নিজেরা না থাকলেও আত্মীয়স্বজনের সূত্রে ঘনঘনই ওই সব জায়গায় তাঁকে যেতে হত। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ বালক শীর্ষেন্দু মৈমনসিংহে। সকাল থেকেই চলেছে স্বাধীনতার আনন্দ। এবং এরই মধ্যে পারিবারিক হিতৈষী ‘ফজলুদা’ এসে বলেছিলেন, ‘তোদের বাড়িতে পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ টাভাসনি কেন?’ দেশভাগ শীর্ষেন্দু সেদিন বোঝেননি। কিন্তু এখনও মাঝে মাঝেই দেশের বাড়ির স্বপ্ন দেখেন। ‘কি আর এমন ছিল আমাদের সেখানে? কতদিনই বা ছিলাম সে দেশে। বেশির ভাগই তো এখানে! তবু’-।
কোনও বিষয়-আশ্রিত উপন্যাস লিখতে পারেন না- এটাও শীষেন্দুর স্বীকারোক্তি। কিন্তু অন্য কেউ, পরবর্তী কালের লেখকরা কেউ দেশভাগের বিষয়ে লিখবে, লিখে সার্থকতা পাবে- এটা তিনি চেয়েছিলেন। ‘কিন্তু কই?” শীর্ষেন্দু প্রশ্ন করেন। ইতিহাস চেতনা? ‘দেশভাগের উপর কোনও প্রামাণ্য ইতিহাসও তো আজ পর্যন্ত লেখা হল না। ঐতিহাসিকরা তাঁদের কর্তব্য পালন করেছেন বলেই তো মনে হয় না। ইতিহাস চেতনার আগে তো সে প্রসঙ্গই আসে’- শীর্ষেন্দু জবাব দেন।
শীর্ষেন্দুর সাম্প্রতিক একটি উপন্যাসে (‘জাল’) এক বাস্তুহারা মাস্টারমশাইকে ফলকাতার পটভূমিতে দেখানো হয়েছে যে কলকাতা শহরের বুকেই একটি নকল বিক্রমপুর তৈরি করার আজগুবি চেষ্টা করে চলে। এখানে একটি বহুতল বাড়ি হওয়া সে আটকাতে চায়। অবশেবে সে মারা যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে। সমরেশ বসুর একটি উপন্যাসে (যাট দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত) ‘সূচাঁদের স্বদেশযাত্রা’য় দেখানো হয়েছে এক হরবোলাকে, যে বাস্তহারা হয়ে এ-দেশে এসেও মাটি হাওয়ার সঙ্গে মিলমিশ করতে না পেরে পাসপোর্ট ছাড়াই নদী পেরিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করে। স্বদেশে ফেরার জন্য আবার প্রমাণ কি লাগে সূচাঁদের কাছে? আর নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ পেরিয়ে, ‘মেঘে ঢাকা তারা’ থেকে ‘সুবর্ণরেখা’- সর্বত্র আমরা দেখেছি ঋত্বিকের এক ধরনের উন্মত্ততা- দেশভাগকে তিনি কখনও সত্য বলে স্বীকার করেননি। আমৃত্যু ছিল তাঁর এ জেহাদ।
মৃণাল সেন অবশ্য এ ধরনের প্রত্যাখ্যানে বিশ্বাস করেন না। ঋত্বিকের প্রতিভার প্রতি সহস্র অনুরাগ সত্ত্বেও। মৃণালের দৃষ্টিভঙ্গি এ বিষয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক- যদিও জন্মসূত্রে তিনিও পূর্ববাংলার এবং দেশভাগের আগে থেকেই কলকাতাবাসী। সরকারি খাতায় নিজেদের উদ্বাস্তু বলে চিহ্নিত করতে তাঁর আপত্তি ছিল। করেনওনি। যুদ্ধ, যুদ্ধজনিত আকাল, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশবিভাগ, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের প্রকম্পিত সামাজিক পটভূমি তাঁকে যদিও তাঁর সিনেমার ভাষায় ও ভঙ্গিতে ক্রমাগত পালটিয়েছে। তিনি রি-অ্যাক্ট করেছেন সমানেই। কিন্তু ঋত্বিকের মত ‘দেশভাগ’ মানি না ধরনের শিল্প-ম্যানিফেস্তো কখনওই ছিল না মৃণালের। এই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। দেশবিভাগ সম্পর্কে কোনও উল্লেখযোগ্য উপন্যাস এখানে না থাকার কারণ মৃণালের মতে, ‘ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভাব’। ‘ভীষ্ম সাহানি দেখেছেন সব। তাই পেরেছেন ওরকম লিখতে’- মৃণালের এই বিশ্বাস। ‘তবে আমাদের লেখকরা এ নিয়ে যে বেশি লেখালেখি করেননি, এটা আমি বলবো এক পক্ষে ভালোই হয়েছে।’ কেন? জিজ্ঞাসা করাতে চাপা হাসি ঠোঁটের ডগায় তাঁর। ‘লিখলেই তো ওঁরা বানিয়ে বানিয়ে লিখতে শুরু করতেন। তো, বানাননি, আমি বলব ভালই করেছেন। অন্তত সেদিক থেকে ওঁরা সততাই বজায় রেখেছেন।’
আগাপাশতলা শহরে নায়ক, কলকাতার জীবনের উচ্চ ও মধ্য- মধ্যবিত্ততা, সত্তর দম্পকের নকশাল রাজনীতির পটভূমি-পরিসরকে যিনি তাঁর লেখায় (‘সহযোদ্ধা’) প্রথাসিদ্ধ বাঙালি আবেগের বাইরে, অ-রোমান্টিক, নির্লিপ্ত নিরাসক্তিতে বোঝার চেষ্টা করেন সেই দিব্যেন্দু পালিত দেশবিভাগের এই রাজনৈতিক প্রহসনটিকে তাঁর উপন্যাসের বিষয় করতে চান না। কেন না এটা তাঁর ‘ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’র বাইরে। তিনি বাংলার বাইরে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, ‘দেশবিভাগ বাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই ঘটেছিল এবং যাঁরা এ বিষয় নিয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টি করতে পারতেন’, তাঁরা, অন্তরে বেদনার্ত বোধ করলেও লেখালেখির ব্যাপারে বিষয়টিকে এড়িয়ে গিয়েছেন।’
বাংলা সাহিত্যে ‘দেশভাগ’ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস না থাকার এটা যেমন একটা কারণ তেমনি আরও একটা কারণ ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বেশির ভাগ লেখকের একটা অসচেতন মনোভাব। দিব্যেন্দু ভাই মনে করেন। ‘এবং অনেক সময়েই রোমাস্টিসিজমের প্রবণতায় এই প্রেক্ষাপট থাকলেও যায় হারিয়ে।’ আমার হঠাৎ সুনীলের বক্তব্যটা মনে পড়ল। সত্যি কথা বললে গণ্ডগোল বাড়বে বলে যে আশঙ্কা সুনীল প্রকাশ করেছিলেন। দেশবিভাগ সম্পর্কে সত্যভাষণের বিপদ এবং ঝুঁকির কথাটা দিব্যেন্দুকে জানাতে ওঁর উত্তর: দেশবিভাগ যেহেতু সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতেই ঘটেছিল সুতরাং দেশবিভাগের সত্যের ভিতরেও ছিল কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ। হয় এগুলোকে মেনে নিতে হত, নয় এগুলোকে এড়িয়ে যেতে হত। ‘অন্তরে বেদনার্ত বোধ করেও বেশিরভাগ লেখকই যে দ্বিতীয় পথটিই অবলম্বন করেছেন একথা তো আগেই জানিয়েছিলেন।
ইতিহাসবোধের অভাব থেকেই বাংলা সাহিত্যে দেশবিভাগটা তেমন তাৎপর্য পায়নি- এ কথাটায় অবশ্য অতটা জোর দিতে চান না কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের ডিরেক্টর ঐতিহাসিক ডঃ অশীন দাশগুপ্ত। সাহিত্য ও ইতিহাসের অন্তর-সম্পর্ক নিয়ে লেখা যাঁর মেধা উজ্জ্বল অন্বেষণ-ভিত্তিক বক্তৃতামালা বহুজনের আগ্রহ কেড়েছিল সম্প্রতি। ইতিহাসবোধ কাজ করেছে যেসব যুদ্ধোত্তর আধুনিক বাংলা সাহিত্যে, তার মধ্যে গৌরকিশোর ঘোষের ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দেশভাগ নিয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের অনুপস্থিতিটা অবশ্য ডঃ দাশগুপ্ত টের পান। ‘অবশ্য তার কারণটা আমার কি মনে হয় জানেন? আমার মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই এখনও আমাদের কাছে একটা আঁতে ঘা লাগার মত হয়ে রয়েছে।’ ডঃ দাশগুপ্ত মনে করেন, এত বেশি পরিমাণেই এই ঘটনায় ‘আমরা নাড়া খেয়েছি’ যে এখনও পর্যন্ত কেউ এই নিয়ে ‘শুছিয়ে বলার মত তাগিদ পাচ্ছেন না।’ মনে পড়ল গৌরকিশোরও এরকমই একটা কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন হয়ত এই ধরনের উপন্যাস লেখার জন্য যে সৃজনশীল নির্লিপ্ত দূরত্বের দরকার হয়, ‘তা এখনও আমাদের মধ্যে আসেনি।’ আরও প্রোফেটিক আরও মানবিক কণ্ঠস্বর ডঃ দাশগুপ্তের। বললেন, ‘একটু সরে থাকারও দরকার হয় মাঝে মাঝে। বাংলাভাগ ব্যাপারটা কতটা মর্মান্তিক, কতটা একটা জাতের পতীরের ক্ষত তাও তো ভাবতে হবে।’ তাছাড়া দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতেই বা কটা দিগ্দর্শনকারী মহৎ-উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে? যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে, নির্লিপ্ত নিরাসক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারে। ডঃ দাশগুপ্তের পাল্টা প্রশ্ন। আমি গুল্টের প্রাস, হাইনরিশ বোল, মিলান কুন্দেরার নাম করতেই ওঁর উত্তর, ‘সাহিত্যের সেই স্তরে এঁরা কেউই উঠতে পেরেছেন বলে আমি মেনে নিতে নারাজ।’
গৌরকিশোর ঘোষের সঙ্গে একমত হয়ে ডঃ দাশগুপ্তও এটা মানতে নারাজ যে দেশভাগের দায়টা কেবল মুসলমান সমাজের উপর। পাকিস্তান যেহেতু মুসলমানদের দাবি, তাই দেশভাগ নিয়ে সত্যভাষণে সেই পুরনো সাম্প্রদায়িকতাকেই উসকে দেওয়া হবে, বেহেতু হিন্দুরা দেশভাগ চায়নি-সুনীলের এই ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ডঃ দাশগুপ্তের বিনীত মন্তব্য- সুনীলবাবুর প্রতি শ্রদ্ধা হয় এ ধরনের সামাজিক দায়িত্ববোষের জন্য। তবুও বলছি মুসলমানদের দায়ী করাটার প্রশ্নে তিনি ঠিক কথা বলছেন না। দায়টা আমাদের সকলেরই। আমরাও তো সেদিন শরৎ বসুর ডাকে সাড়া দিইনি।
আরও একজন, যিনি মুসলমানদের উপর এই ভাঙা বাংলার দায়ভার দিয়ে দিতে চান না, তিনি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁর লেখা ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ এখনও লোকে পড়েন। তবে, আমাদের কলকাতার বহু পড়ুয়া সমালোচক আছেন যাঁরা জেমস জয়েসের ‘ফিনিগানস ওয়েক’ বা ‘ইউলিসিস’ অথবা প্রন্তের স্মৃতিসন্ধান এক নিশ্বাসে মুখস্ত বলতে পারেন- অথচ এই উপন্যাসটি পড়েননি। ১৯৩৪-১৯৫২ সালের বিশাল সময় ও পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটিতে আছে দেশভাগের প্রস্তুতি পর্ব থেকে শুরু করে ভাঙনের পরের বেশ কয়েকটা বছর-ও। যেখানে আমরা দেখতে পাই চেনাজানা মানুষের নামধাম-ঘরবাড়ি, গ্রাম বাংলার ভাঙা দেউল, যেখানে দাঙ্গা বাধে, ধর্ষিতা মালতী যেখানে আশ্রয় পায় ফকিরের কাছে, কড়াকট্টর মুসলিম লিগের সমর্থক সামসুদ্দিন খুঁজে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া মালতীকে। দাঙ্গাবাজের পোশাকের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে মানুষের হৃদয়ের বিপন্নতা।
নিজেও হয়রানি হওয়া অতীন কিন্তু মনে করেন না দেশভাগের সিংহভাগ দায়িত্ব মুসলমানরাই নিয়ে বসে আছেন। ‘একমাত্র ঢাকা ছাড়া পূর্ববঙ্গের আর কোনও মুসলমান নবাব ছিল না’- অতীন বলেছিলেন। হিন্দুদের দ্বারা কোণঠাসা, অপমানিত, বিপর্যন্ত অপাংক্তেয় মুসলমান সমাজে ‘তাই মুসলিম লিগ সহজেই ঢুকে পড়তে পেরেছিল’ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কাছে দেশভাগের প্রশ্নে কেবল হিন্দু-মুসলমানই বড় কথা নয়। ‘প্রশ্নটা অভাবের, দারিদ্র্যের, অন্নহীনতার।
তাহলে কেন লেখা হয়নি সেই বহুকাঙ্ক্ষিত উপন্যাসটি তার ঝাঁকিদর্শনে ধরা পড়েছে (১) লিখবেন যাঁরা সেই উচ্চ বর্ণের লেখক শ্রেণী নিজেরা প্রত্যক্ষভাবে দেশভাগের নিষ্ঠুরতার শিকার নন। এপারে তাঁদের ঠাঁই পেতে অসুবিধে হয়নি। বন্দোবস্ত সবই ছিল আগে থেকে। (২) ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক আন্দোলনের চোরাগোপ্তা টানের, প্রতিক্রিয়ারও শিকার এঁরা। (৩) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চেতনার অনুপস্থিতি এবং অভাব এঁদের শিল্প-বিশ্বে। (৪) বাংলা সাহিত্যের সাবেকি রোমান্টিকতার প্রতি পিছুটানেও এঁরা ভুগছেন। (৫) রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার আধুনিক মানসিকতার অভাব। যা ঘটেছে, তা ঘটেনি বলে ভাববার এক মানসিক জড়তা। দেশবিভাগ-জড়িত বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের বিবিধ চরিত্রে তাই এত পাগলামির হাগ।
এবং সর্বোপরি সেই নির্লিপ্ত দূরত্বের, সেই সময়ব্যবধানের স্বল্পতা, যার ফলে কেউই জাতশিল্পীর উদাসীনতায় পৌঁছোতে পারছেন না। বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে লিখছেন এমন কয়েকজন অগ্রগণ্য লেখক এবং ঐতিহাসিক, চলচ্চিত্রকার এবং শিল্পীর বক্তব্য থেকে যা উঠে এল তা আমাদের বিষয়টি সম্পর্কে ভাবিত করল ঠিকই, কিন্তু বক্তব্যের পরস্পর বিরোধিতায় এটাও বোঝা গেল যে দেশবিভাগ নিয়ে কোনও সমবেত ধারণায় আমরা পৌঁছোতে পারিনি। যাঁরা পৌঁছে দিতে পারতেন সেই সাহিত্যিকরাও নয়।
১৩ মার্চ ১৯৮৮, আনন্দবাজার পত্রিকা