আর দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই একটা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের নিলাম ডাকা হবে আমাদের বাণিজ্যনগরী বোম্বাই শহরে। চা পাতা বা আসবাবপত্র, বা কোনও নেতাজীর রিভলবারের নিলাম নয়-নয় সাহেববাড়ির দরজা-জানালা, খেতপাথরের টেবিলেরও। তার থেকেও বহুগুণ রোমাঞ্চকর এই নিলামটিকে চালানোর ভার নিয়েছেন লন্ডন শহরের বিখ্যাত অফশনার ক্রিস্টিজ। কিছুদিন আগেই যাঁরা সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলেন ভ্যান গখের ‘সান ফ্লাওয়ার” ছবিটিকে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দিয়ে তাঁদের নিলামে। সেই ক্রিস্টিজ এবারে আসছেন বোম্বাই-এ। ‘হেল্প-এজ’ বলে একটি সংগঠন-আয়োজিত ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় চিত্রকরের ছবির নিলাম চালাতে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার ভাষায় বলা যেতে পারে এ এক এমন খবর যাতে, ‘শিল্পের শিরার আসে উত্তেজনা, শিল্পের দুচোখে পোড়ে বাজি।’
কেননা এই নিলাম প্রমাণ করতে চলেছে বিত্তবান বা ভারতীয় মধ্যবিত্তের মনে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলা কী পরিমাণ স্নায়বিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পেরেছে যার জন্য এখন নিলামেও আধুনিক চিত্রকলা কেনার (গণেশ পাইনের কথায় বলতে গেলে, এই সেদিন পর্যন্ত মানুষজন ‘ছবি আঁকতে না পারার লোকজনদের আড্ডা বলে মনে করতো) জন্য কত তোড়জোড়, এত বিশাল কাণ্ডকারখানা করা হচ্ছে। এই স্নায়বিক চাঞ্চল্যের আর এক প্রমাণ গত কয়েক বছর ধরে দিল্লী, বোম্বাই, কলকাতার সরকারী, বেসরকারী আর্ট গ্যালারিগুলিও। বছর খানেক বা তারও বেশি আগে যেখানে প্রদর্শনী করার জন্য ‘অ্যাডভালড হল বুক’ করতে হয়। প্রমাণ, তরুণ বা প্রবীণ শিল্পীর একজিবিশনে অজস্র ছবির নিচে লাগানো লাল সঙ্কেত, যে ছবিটি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। প্রমাণ, চারুকলা প্রদর্শনীতে উৎসাহে উজ্জ্বল মুখের ভিড়, সিনেমাস্টারদের মতো মকবুল ফিদা হসেন, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্যকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্ত মনের নানান টেনশন প্রশ্ন। আর্ট কলেকটরসের নামের লিস্টে এখন শুধুর গোয়ালিয়র, বরোদার রাজামহারাজই নেই, আছেন যাদবপুরের ইঞ্জিনীয়ারিং-এর অধ্যাপক, বাংলা সিনেমায় অভিনেতা, কম্পিউটার কোম্পানির চেয়ারম্যান, উঠতি বিজনেস একজিকিউটিভ। প্রধানমন্ত্রীর পত্নী শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধী তো আছেনই। সুতরাং সদ্য কেনা বা পাওয়া অ্যাপার্টমেন্টের ড্রইংরুমের দেয়ালে গণেশ পাইন বা বিকাশ ভট্টাচার্যের সই ঝুলিয়ে রাখতে পারাটাও ক্রমশ হয়ে উঠছে কেতা-সচেতন মধ্যবিত্তের মনের স্টেটাস। যা তার মারুতি- ভি-সি-আর’ এর থেকেও অনেক জরুরী। এক কালে যে দায় তাঁরা নিতান্তই সেরে নিতেন একটি ঝাপসা হওয়া, সত্তা, খেলো প্রিন্টের ভ্যানগখ, রনোয়ায়। বা চর্বিতচর্বণ যামিনী রায়ের প্রিন্ট। আরও প্রকট কোনটা মানেন আর কোনটা মানেন না, সেটা বোঝা ভারী মুশকিল, তাঁর উত্তরের নাগাল পাওয়ার থেকে হ-য-ব-র-ল’র গেছো দাদার নাগাল পাওয়া অনেক সোজা, আরও সোজা ডেলফির অরাক্রের আসল মানে বোঝা। তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয় হুসেন বা বেন্দ্রে, গণেশ বা বিকাশ, এঁদের ছবি তাঁর কেমন লাগে, এঁদের তিনি কী রকম ‘ইমপ্যান্স’ দ্যান, তো তিনি জবাব দ্যান যে তিনি কাউকে (ভারতের? না পৃথিবীর?) কোনও ‘ইমপ্যান্স দ্যান না’। কেননা সবাই ‘স্পেস এবং টাইমের’ শিল্পী। পারমার্থিক ভাবে, ‘হুসেন আঁকতে পারে না’, গণেশ ‘পারে না’, বিকাশও ‘পারে না’। তিনি নিজে? ‘ওই দুঃখেই’ তো তিনি ‘ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়েছেন’। ‘স্পেস অ্যান্ড টাইম’-এ আবদ্ধ ‘হয়ে যাবেন’ বলে। তিনি আঁকবেন ‘দুর্ভিক্ষের ছবি আর সে ছবি হারিয়ে যাবে বড়লোকের বাড়ির ড্রইংরুমের সাজসজ্জায়’। খেজাহ্-ঘেন্না। তার চেয়ে অনেক ভালো বেলজিয়াম এমব্যাসির বাড়ি বানানো। ‘মিচেলেঞ্জেলো’ হতে হলে কি ‘কেবল ছবি আঁকলেই চলে?’ তাই ‘ভারতের রোম’ দিল্লী নগরীর এই ‘টোটাল ও রেনেসাঁস ম্যান’ মিচেলেঞ্জেলোর মতই হতে চান সব কিছুতেই স্ট্রং। বা সতীশ গুজরালের উচ্চারণে (যিনি জ্বালপচারকে বলেন সকাল্লার) ‘সটেরং’।
তো, এই সতীশও মনে করেন, ভারতীয়দের মধ্যে ইদানীং চারুকলার প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়েছে। ছবি, ভাস্কর্যের কেনাকাটিও বেড়েছে। কিন্তু এটা নাকি শিল্পকে মেরে ফেলারও একটা পথ। কেননা ‘সমাজ শিল্পকে হয় উপেক্ষা করে মারে, নয় মারে কিনে নিয়ে’। তাঁর মতে উপেক্ষাটাই নাকি ভালো, কেননা সেক্ষেত্রে শত্রুকে পরিষ্কার ‘চিহ্নিত করা যায়।’
শিল্পের আততায়ী সামাজিক মূর্খরা ভাগ্যিস সতীশকে উপেক্ষা করেননি। তাহলে তো তাঁর আর অতো চড়া দামে ছবি, মূর্তিচূর্তি এবং শেষমেশ আর্কিটেক্ট হয়ে বেলজিয়াম এমব্যাসির বাড়িটা আর গড়া হতো না। গড়া যেত না লাজপতনগরে নিজের বাড়ির ড্রইংরুমের ওই অভিজাত ইনটেরিয়ারের আতিশয্য, ওই ফ্যাশনেবল প্রাচীনতায় মোড়া আসবাবপত্র, এটা-ওটা-সেটা।
তবে ছবি যাঁরা কেনেন তাঁরা সবাই যে সেই ছবিকে ময়মনসিংহ গীতিকার ‘খাইতে দিনু তোমায় আমি শালিধানের চিঁড়া’র স্টাইলে আদরযত্ন করেন এ-কথা ঠিক নয়। গণেশ পাইনই সেই শিল্পী, ইদানীং যাঁর ছবি আঁকার ‘আগেই বিক্রি হয়ে যায়’ এ-ধরনের গল্পকথাও চালু। যাঁর ছবির জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হয় কলকাতায় বহু নামীদামী লোককেও। গদেশ বললেন, তাঁর কাছে একজন এসে কেনা ছবি ফেরত দিয়ে গিয়েছিলেন ‘একটু মেরামত করে দেবার জন্য’। কেননা ‘প্রচণ্ড রোদ্দুর আর জল পড়েছিল’ সেই ছবির উপর। ‘কী করে এমন দশা হল ছবিটার’ জিজ্ঞেস করায় ক্রেতা ভদ্রলোক গণেশ পাইনকে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ির ‘ইনটেরিয়ার চেঞ্জ’ করার সময় ছবিটা ‘না কি বহুদিন বাইরের বারান্দায়’ পড়েছিল। ‘সেখানেই ছবি অতো রোদজল খেয়েছে।’
বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে ডক্টর প্রকাশ কেজরিওয়ালের ‘চিত্রকূট আর্ট গ্যালারি। আর্ট কালেক্টর এবং বিক্রেতা হিসাবে ওঁরা সারা ভারতে সুপরিচিত। উনি এবং ওঁর স্ত্রী সুমিত্রা কেজরিওয়ালের কাছে অসামান্য সব স্কেচ আছে গণেশ পাইনের। ললিতকলা আকাদেমির ডিরেক্টর শঙ্খ চৌধুরী দিল্লিতে ওঁর কথা বলেছিলেন আমাকে। অবন ঠাকুরের ছবির অসামান্য কালেকশনও নাকি ওঁর। ‘তা এক ভদ্রলোক নাফি ডক্টর কেজরিওয়ালের কাছ থেকে কেনা ছবি ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, ‘এ ছবিটা ভাল লাগছে না। অন্য ছবি চাই তাঁর। গণেশ বললেন গল্পটা। ঠিক যেন হরলালকায় এসে গড়িয়াহাটের বৌদি কেনা শাড়ি পরে অপছন্দ হওয়ায় ফেরত দিয়ে ‘ওইটা দিন, ওইটা দিন’ বলে বাতচিত চালাচ্ছেন দোকানদারের সঙ্গে।
এব্যাপারে অবশ্য আমাদের কলকাতার পরমা ভাস্কর শ্রীমতী মীরা মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি মর্মস্পর্শী। দিল্লির পাঁচতারা হোটেল ‘মৌর্য’ মীরাদেবীর অশোক মূর্তিটি কিনে নিয়েছিল ‘পরম আগ্রহে’, আশি হাজার টাকায়। কিছুদিন আগে সেই হোটেলে গিয়ে তিনি নিজের চোখে দেখে এসেছেন ঢালাই-এ তৈরি সেই দণ্ডায়মান মূর্তির হাতে যে-তরবারিটি ছিল মাটি ছুঁয়ে থাকা অবস্থায় গড়া, চেঁচেপুঁছে সেই তরবারিটিকে সরু এবং ছোট করে দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য এই কিলিস্টাইন আবরণটা যে কেবল ভারতীয়দেরই তা বলা বার না। শিল্পবোধের নাকউঁচু ভাবে ভরা প্যারিসেও দেখেছি যত্রতত্র চলেছে নামকরা ভাস্করের গড়া মূর্তির উপর অবিচার। নয়নভোলানো পার্ক মঁ সুরির সামনেই ‘বিশ্বনাগরিক’ টমাস পেনের যে মূর্তিটি রয়েছে, তার তো সঙ্গিন অবস্থা। যেহেতু এলাকাটা প্যারিসের ছাত্রাবাস পাড়ায়, অতএব যে ছাত্রদল যে রকমই আন্দোলন করবে তার প্রথম বলি হবেন টমাস পেন। মনে করুন ছাত্ররা ‘এডস’ বিরোধী আন্দোলন করছে। ব্যাস্ যায় কোথায়, টমাস পেনের ট্রাউজারের বোতাম অঞ্চলকে দেওয়া হল রাঙিয়ে। মনে করুন ডাক্তারির ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছেন। অমনি টমাস ব্যান্ডেজ। ছাত্র আন্দোলন মিটে গেল, টমাস পেনের শান্তি কিন্তু মকুব হল না। তাঁর তখনও ‘হাতভাঙা’।
ছবি বা ভাস্কর্য যাঁরা কেনেন-টেনেন, তাঁরা যে সবাই ‘এসথেটিক রিজনস বা নান্দনিক যুক্তিতে এগিয়ে আসেন তা ডক্টর কেজরিওয়ালও মানেন না। তাঁর আর্ট গ্যালারির অভিজ্ঞতা বলে, ভাল ইনভেস্টমেন্ট হিসাবেও চারুকলাকে এখন গ্রহণ করা হয়। তবে ‘চোখ’ আছে এমন ক্রেতাও আছেন। অনেক না হলেও। ‘চোখ’ নেই কেবল ‘লগ্নি করার দলের সংখ্যাই তাঁর মতে বেশি। তবে এঁরা আছেন বলেই যাঁদের পয়সা নেই তাঁদেরও কেনার জেদ চাপে। অর্থাৎ, কেজরিওয়ালের মতে ওই ‘ইনভেস্টার ক্লাস’ (আবার ইনভেস্টমেন্ট করছেন বলেই যে সেটা একেবারে কালোয়াতি ব্যাপার, বানিয়াবৃত্তি, তাও মনে করেন ডক্টর কেজরিওয়াল’। অনেক লোক আছেন যাঁরা, তাঁর মতে, ‘এক ঢিলে দু পাখি মারেন’। পয়সা নষ্ট করতে চান না বলেই ইনভেস্টমেন্ট করেন। কিন্তু ছবির সম্পর্কে তাঁদের চোখ আছে) প্রেরণা জোগায় সেই সব মানুষজনকে, যাদের ‘সাধ আছে অথচ সাধ্য নেই। তিনি নিজেই ‘কত লোককে বিনাপয়সার’ ছবি দিয়েছেন। ‘বাড়িতে রাখার জন্য’। দেখেছেন, রাখতে রাখতে তাঁদের মধ্যেও ‘ছবি কেনার গরজ হচ্ছে’। তাঁর খারাপ লাগে ওই দলটাকেই ‘যারা ছবি কিনে বাক্সবন্দী করে রাখে। আর খুলে দ্যাখে না।
ওঁর যেহেতু শিল্প কেনাবেচার জগৎটা বিস্তর আনাশোনা (নিজেও কেনাবেচা করেন যথেষ্ট), অতএব শিল্পীদের কার কী রকম ‘মার্কেট’ সেটা বোঝার চেষ্টা করলাম। ‘সিওর ইনভেস্টমেন্ট’, তাঁর হিসাবে, ‘এখন হসেন।’ পঞ্চাশ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত যাঁর ছবির দাম। তারপর আছেন এফ এন সুজা। পঞ্চাশ হাজার। এন এস বেন্দ্রেও খুব জনপ্রিয়। তাঁর ল্যান্ডস্কেপ লোকজনের খুব পছন্দ। দাম কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার টাকা। দিল্লির কৃষণ খান্না (যিনি মৌর্য হোটেলের সিলিং ডিজাইন করেছেন), তিনিও খুব জনপ্রিয়।
কয়েকজন ভি-আই-পি এবং ভি-ভি-আই-পি আর্ট কালেক্টরের নামধাম পেরেছিলাম দিল্লির কনট প্লেসের ধুমিমল আর্ট গ্যালারির ডিরেক্টর রবি জৈনের কাছে। তাঁর দাবি সমসাময়িক ভারতীয় চিত্রকলার বেসরকারী প্যালারির ক্ষেত্রে ধূমিমলই ‘প্রবীণতম’। স্বাধীনতারও আগে তাদের জন্ম। তাদের ক্রেতারা বেশির ভাগই ‘রিয়ালিস্টিক’ (মানে সহজবোধ্য এবং সুবোধ্য) ছবি পছন্দ করেন। ক্রেতাদের নামের তালিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী তো আছেনই। তাহাড়া আছেন দিল্লির কমপিউটার মেইনটেনাল কর্পোরেশনের (সি এম সি)-এর পক্ষ থেকে তার চেয়ারম্যান ডঃ পি গুপ্ত, হাউসিং ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশন (হাডকো)-এর চেয়ারম্যান, মাদ্রাজের প্রেমা শ্রীনিবাসন এবং কোনও এক মিস্টার রাজিন্দর।
এই সব ‘রিয়ালিন্দ্র’ ছবির শিল্পী কারা। কাদের ছবি বেশি বিক্রি হয় ধূমিমল থেকে। এক গাদা নাম বলে গেলেন রবি জৈন যাঁদের মধ্যে একমাত্র জাহাঙ্গির সাবাওয়ালা ছাড়া কারও নামই বিশেষ চেনাশোনা লাগলো না। কে সব যেন সত্যম ঘোষাল, জয়রাম পাটিল, হ্যানো-ত্যানো। ও হ্যাঁ, সতীশ গুজরালও ছিলেন।
খুমিমল যাঁদের নাম বড় করে দেখাচ্ছেন তাঁদের বড় শিল্পী, শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলে মনে করার সঙ্গত কারণ এখন অবশ্যই নেই। কেন না, যেটা ঘটনা, তা হল, এখন আমাদের দেশের কোনও বড় শিল্পীই আর ডিলার মারফত তাঁদের ছবি বিক্রি করেন না। হয়তো কেরিয়ারের প্রথম দিকে তাঁদের শরণাপন্ন হতে হত দিল্লি বা বোম্বাই-এর কোনও ডিলার বা এজেন্টের। এখন তার দরকার হয় না। একজন হুসেন বা একজন বিকাল বা একজন গণেশ বা বেন্দ্রের কাছে ক্রেতারা নিজেরাই ছুটে আসেন এবং ছবি কিনে নিয়ে যান কেন না গরজটা সেই কোনোসার ক্রেতাদেরই।
ফলত ডিলারদের বা গ্যালারি-মালিকদের ছবি বিক্রির সময় স্পষ্টতই দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের শিল্পীদের ছবিই জোগাড় করতে হয়। এবং ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে এ কথাও চাউর করতে হয় যে এঁরাই এখন ভারতের বিস্ময়কর এবং বিরল প্রতিভা। তাতে বিকাশ-গণেশ- বেন্দ্রের বা হুসেনের অবশ্য কোনওই ক্ষতির কারণ নেই। লাভ, যদি কিছু হয়, তো ওই ‘তরুণ প্রতিভা’দেরই। তবে তুচ্ছ ক্ষতি, যা হতে পারে, তর হল, উৎসাহী অথচ বুঝদার নন এমন ক্রেতা হয়তো ঠকে যেতে পারেন। এজেন্টের ভূমিকা আমাদের দেশে কি শিল্প কি সাহিত্য কোনও কিছুরই ‘বাজারে’ নেই। এখনও বই ছাপানোর জন্য লেখককে ‘এজেন্ট’ ধরতে হয় না। বিদেশে যা অবশ্যকর্তব্য। সরাসরি বই এলিয়টও ছাপতে পারেননি। তাঁকেও একবার ফেবার অ্যান্ড ফেবারের এজেন্ট ধরতে হয়েছিল। এদেশে আমাদের লেখকরা সহজেই দেখা পেয়ে যান প্রকাশক মশাই-এর। সম্পর্কের মতো সহজ, পারিবারিক একটা ভঙ্গি থাকে। যা বিদেশী দৃষ্টিকোণে অবশ্যই নন প্রফেশনাল। এই ‘সেকেলে’ পদ্ধতি অচিরাৎ আমাদের দেশে নিশ্চয়ই পাল্টাবে। কি শিল্পে, কি সাহিত্যে। অদূর ভবিষ্যতেই হয়তো।
তবে শুধু যে আর্ট ডিলাররাই মানুষকে বিভ্রান্ত করেন এটাও নয়। বিকাশ ভট্টাচার্য বা গণেশ পাইন- এঁরা দুজনেই এ-কথাটা স্বীকার করেন যে তারতবর্ষে শিল্প-সমালোচকরাও এই ভূমিকাটি যথেষ্ট পরিমাণেই পালন করে যান। এবং ওঁরা যে সব কথা সচরাচর লিখে থাকেন রিভিউ-এর নামে, সেগুলোর কোনও মাথামুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যায় না। বিকাশ এঁদের কাছ থেকে কিন্তু ‘আশাও’ করেন না। ‘বন্ধুত্যের বেড়া ডিঙিয়ে এঁরা কিছু করবেন বলে মনে করি না’। বিকাশ আরও বললেন,
‘অনেক সময় তো আবার এটাও দেখেছি যে যিনি ছবির সমালোচনা লেখেন তিনিই লেখেন গানের, নাচেরও।’ বোম্বাই-এর কোন এক সমালোচক সম্প্রতি লিখেছেন, যা নিয়ে খানিকটা হৈ চৈও, যে বিকাশ তাঁর কমিশন-করা কাজগুলোও আজকাল প্রদর্শনীতে রাখছেন। আগে থেকে টাকা নিয়ে যেসব ছবি-পোর্ট্রেট আঁকছেন সেগুলোও একজিবিশনে রাখছেন নতুন কাজ হিসাবে। শিল্পী ও কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের অধ্যাপক গণেশ হালুইও স্বীকার করেছিলেন যে, বিকাশের কাজের ভল্যুম ‘এখন বড় বেশি হয়ে যাচ্ছে’। কোনও কোনও অয়েল পেইনটিং দেখলে নাকি মনে হয় ছবিটার আরও বেশি সময় নেবার কথা- একটু আগে করা হয়ে গিয়েছে। তবে তিনি কিছু বিকাশের ছবির একজন প্রগাঢ় অনুরাগী। ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন বিকাশের ‘ডল সিরিজ’-এর ছবিগুলির।
কি বলবো এ সব কথার জবাবে? কাজ কমিশন করা হল না অন্যভাবে আঁকা হল, কেন আজ এত বেশি করছি তাতে কার কি? ‘ছবিটা শিল্পের বিচারে উতরোলো কিনা সমালোচকের তা সেটাই বিবেচ্য হবার কথা’। বিকালের গলায় খানিকটা বিরক্তি। বললেন, ‘গত পঁচিশ বছর ধরে ছবি আঁকছি। আমাকে এখন এসব ব্যাপারে জ্ঞান দেবার কিই বা খাকতে পারে।’
গণেশ হালুই বলছিলেন যে গণেশ পাইনের ছবিতেও ‘আমরা একটু উত্তরণ আশা করছিলাম।’ গণেশের শিল্প-বিশ্বটা তাঁর চোখে অসামান্য। কিছুটা ‘মিসটিক-যেন হঠাৎ করে চোখের সামনে ফুটে উঠল কোনও প্রায়ান্ধকার অতীত, মিশরীয়, ব্যবিলনের সভ্যতা।’ কিন্তু গণেশ হালুই চান গণেশ পাইনের কাছ থেকে আরও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি।
গণেশ পাইন, যিনি মনে করেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্যের দেশ’, ‘ভিশুয়াল ভাষা এখানে তৈরি হয়নি’, সমালোচকদের সম্পর্কে তাঁরও রয়েছে তিক্ততা। বিকাশের মতো অত কড়া গলায় না হলেও, তিনিও বললেন, সমালোচকরা মনে করেন ইচ্ছে করলেই তিনি শিল্পীকে ‘ওঠাতে বসাতে’ পারেন। তার কারণ শিল্পীও জানে। ‘কারণ এদেশে শিল্পের ক্ষেত্রে ‘পিপলস ভারডিকট’ বলে কোনও বস্তু নেই। সাহিত্যের বিচার করার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেবার অজস্র লোক আছেন। নিয়মিত যাঁদের প্রতিবাদ-পত্র চোখে পড়ে পত্র-পত্রিকায়। ‘আর্ট ক্রিটিক’ ভুল করলে, ভুল লিখলে কি ওরকম ঝাকড়দা-মাকড়দা থেকে চিঠি আসে’।
উনি নিজেকে পালটাচ্ছেন না কেন? ক্যানভাসে? এ রকম দাবি বা অভিযোগের বেলায় গণেশের উত্তর, ছবি তো এক ধরনের ‘অটোবায়োগ্রাফিকাল নোটস’ও বটে। একটা মানুষ নিজের সঙ্গে তো দু-তিন রকমভাবে কথা বলতে পারে না। আর বৈচিত্র্য। গণেশ পাইন যদি ‘কাকের জগতটা’ খুঁজে ফেরা শেষ না করে উঠতে পারেন তো লোকে বললেই কি ‘তাকে বকের পিছনে ধাওয়া করতে হবে’ বৈচিত্র্যের জন্য?
ভাগ্যিস ওঁরা দুজনেই এ কথা বললেন। সমালোচকরা যে কি লেখেন ছাই আমরা বুঝি না, আমরা এত হাবা কেন এ ভেবে সাধারণ মানুষরাও কি কম দুঃখ পান? এই তো কদিন আগে এক ইংরাজি কাগজে চিত্রভানু মজুমদারের একজিবিশনের উপর কোনও এক সমালোচক লিখছেন চিত্রভানুর ছবিতে নাকি খুঁজে পান ‘এলিগ্যান্ট হাইব্রিডিজম’। মানে চিত্রভানুর ছবি ‘এলিগ্যান্ট দো আঁশলা’? এটা নিন্দা, না প্রশংসা?
কিছুদিন আগে এক অধ্যাপক-কবি-শিল্প সমালোচকের লেখা পড়েও ওই একই অবস্থা। ব্যাপারটা আরও কষ্টকর এই কারণে যে, ওঁর বাংলা কবিতার ভাষায় আন্তরিকতায় আমরা অনেকেই যাকে বলে ফ্যান। সেই তিনিই সোমনাথ হোড়, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ পাইন, যোগেন চৌধুরীর এক যৌথ প্রদর্শনীর ক্যাটালগ-ব্রন্ডর-এ লিখেছেন দেখলুম গণেশের ছবিতে নাকি বেজে ওঠে মালার্মের ফনের সঙ্গীতমূর্ছনা, সোমনাথ হোড়ের ছবিতে থাকে সফোক্লেসের পেরিসেটিসের (বা পেরিকটিটিস)-এর ক্ষতযন্ত্রণা বোধের সঙ্গে মার্কসীয় সমাজচেতনা। ‘জীবন” যদি ‘জীবন সংগ্রাম’ না হয় তবে শিল্পকেই এরকম ‘যন্ত্রণা’ হতে হবে কেন? তা সে পেরিসেটিস হোক বা মার্কসই হোক।
শিল্প-সমালোচকরা যা খুলি লিখুন, যা কিছু বলুন বাহাত বিকাশের তাতে সত্যিই সত্যিই খারাপ লাগে, শিল্পীরাও যখন এই সব একে অন্যের নামে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করেন। কেননা এতে কাজের পরিবেশটা বিষিয়ে যায়। ‘এসব কথা শুনে যে আমি কাজ ছেড়ে দিই’ তা নয়। ‘কাজ তাতে হয় না বটে, কিন্তু কষ্ট তো হয়’। কথা প্রসঙ্গে নীরদ মজুমদারের নাম ওঠায় যথেষ্ট ঝাঁঝ আর বিরক্তি ভরা গলার বিকাশ বললেন, ‘দেখুন উনি মারা গিয়েছেন। ওঁর নামে বেশি কিছু বলাটা শোভন নয়। তবে একটা কথা, নীরদবাবু প্রচণ্ড দুর্মুখ ছিলেন বলেই যে তিনি সদা সত্য কথা বলতেন এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই।’ বিকাশের ধারণা, দোষটা আমাদের সমাজেরই। ‘দুর্মুখ হলেই তাঁকে আমরা ধরে নিই স্পষ্টবাদী, অতএব, সত্যবাদী।’ বিকাশের ধারণা, শিল্পী হিসাবে ওঁর মধ্যে একটা ‘ব্যর্থতাবোধ’ ছিল, যার জনাই আজ একে কাল ওকে গালাগাল দিতেন।’ শিল্পী হিসাবে নীরদ মজুমদার কি ব্যর্থ? বিকাশের মতে, নীরদবাবু শিল্পী হিসাবে ‘ওঁর প্রচণ্ড শক্তিটাকে’ নষ্ট করেছেন কতগুলো ‘আরোপিত ভাবনার ভূতে’র জন্য। ওঁর ওই ‘কালীভক্তি মেশানো ফরাসিয়ানা’র ‘আরোপিত ভাবনায়’।
এক হিসাবে বলতে গেলে ‘পাগলাটে, ক্ষ্যাপাটে’ বলে চিহ্নিত আমাদের মীরা মুখার্জির পলিসিটা এ-ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো। উনি ওঁর সম্পর্কে লেখা কোনও সমালোচনা পড়েন না। পড়লেই ‘তাঁর কষ্ট হয়’। এক সময় আমাকেও সেই চরম কথাটাও বলে দিলেন মীরা দেবী- ‘এই যে তুমি আমার ‘ইনটারভিউ নিচ্ছ, কাগজে ছাপা হবে বলে, এটাও আমি পড়বো না। তুমি কিন্তু কিছু মনে কোরো না।’ মনের দুঃখ মনেই রেখে ভলত্যেরের মতো বলে উঠি, ‘আমার লেখা কিছু ইম্পর্ট্যান্ট নয়। কিন্তু নামী সমালোচকরা আপনাকে কী চোখে দেখে সেটা জানতে ইচ্ছে করে না আপনার?’ ‘না ভাই, করে না।’ তাঁর সাফ জবাব। মীরার বিরুদ্ধে ‘খারাপ কিছু লিখছে বলে’ যে ওসব তিনি পড়েন না তা নর। আসলে তাঁর ‘কষ্ট হর’ এই ভেবে যে ‘বেচারা কিসসু বোঝে না! তাই লেখে!
তো, এটা তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের দেশে শিল্প সম্পর্কে যে আগ্রহ, যে নবচেতনা দেখা দিয়েছে তার সঙ্গে পাশাপাশি চলতে পারার মতো আনুষঙ্গিক আয়োজনগুলো ঠিক মতো তৈরি হয়নি। ঠিক এই মুহূর্তে কোন জিনিসটা হয়ে ওঠা জরুরী? গণেশ পাইন মনে করেন, প্রথমেই যা দরকার তা হল যে সব ‘পরস্পরবিরোধী’ রাজনীতির ক্রমান্বরে ‘পরীক্ষানিরীক্ষা’ চলছে সেগুলোর একটা ‘রেকর্ড’ রাখা। নিয়মতান্ত্রিক রেকর্ড। ওঁর দুঃখ ‘সমকালীন’ চারুকলা বলে যা রয়েছে আমাদের দেশে তারও বয়স হয়ে গেল প্রায় একশো বছর। এর কোনও সুসংবদ্ধ ইতিহাস রচনা করা হয়নি। কোনও ‘নবীন শিক্ষার্থী যদি আজ নিজের ‘পটভূমিটা’ জানতে চায় তাহলে তাকে এলোপাথাড়ি এদিক-ওদিক হাতড়াতে হবে। এ-ব্যাপারে ললিতকলা অকাদেমির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন গণেশ। কিছু কাজ তাঁরা করলেও তাঁদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই গণেশের। ‘যা করার কথা, তার সবটা করেন কি ওঁরা?’ গণেশ প্রশ্ন করেন।
ললিতকলা অকাদেমির ডিরেকটর শখ চৌধুরী অবশ্যই স্বীকার করেন ‘অনেকটাই করা হয়নি’।
শাস্তিনিকেতনের প্রেমিক ছাত্র শখ চৌধুরী অবশ্য কলকাতার ছবি নিয়ে মাতামাতির ব্যাপারটাকে যথেষ্টই সন্দেহের চোখে দেখেন। ওঁর নিজের ধারণা কলকাতার লোকজন ‘ছবিটবি বোঝে না’। ওই এক সময় ওঁরা (কলকাতার বুদ্ধজীবীরা) বই পড়ে শিখেছিলেন রনোয়া থেকে ভ্যানগখ, রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক প্রভাবে কিছু ব্যারিস্টার, অ্যাটর্নি ছবি-টবি দেখতে, কিনতে শুরু করেছিলেন। ‘কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা বই পড়তেন, ছবি দেখার চোখ ছিল না খাঁদের। কেন, বিষ্ণু দে? ‘আবণসন্ধ্যার সেই মাতিশ আকাশ’ ধরনের ছবির রঙে-রঙ মেলানো শব্দের বাহার থাকতো যাঁর কবিতায়। যামিনী রায়ের যিনি ছিলেন পরম ভক্ত। ‘মুশকিল হচ্ছে, এসব কথা বললে আবার বিপদ, তর্কাতর্কি হয়-‘ শঙ্খ বললেন যে উনি যামিনী রায়কে খুব একটা কিছু উঁচুদরের শিল্পী বলেই মনে করেন না। ‘উনি তো একই ছবি আঁকতেন।’ তাছাড়া ওঁর ‘দুইং-ও’ শম্বর খুব একটা মনে ধরে না। ‘কলকাতার বিষ্ণু দে-সুধীন দত্ত-এ-ও মিলে ওঁকে অবশ্য ‘যামিনী পটুয়া’ বানিয়ে দিলেন। পট নিয়ে ওঁর কাজকর্ম থেকে থেকে পটুয়া হলেন উনি।’ কিন্তু শঙ্খর সন্দেহ, এর মধ্যে একটা অন্য ব্যাপার আছে। আসলে শাস্তিনিকেতনের বিরোধিতা করতেই এসব। ‘মাস্টারমশাই (নন্দলাল বসু)-কে তো এই বিষ্ণু দে, সুধীন দত্তরা কোনওদিন পাত্তাই দিলেন না। যামিনী রায় হলেন ওঁদের লোকসংস্কৃতির শিকড়।
হবি এখন ভারতের ফোন অঞ্চলে বেশি ফেনাকাটি হয়, বেশি আগ্রহ দেখা যায় এ-কথায় শঙ্খর পরিষ্কার জবাব: বেশি হয় বোম্বাইয়ে।
যাক সে কথা, আমরা ফের চলে এলাম ললিতকলার কাজকর্মের ব্যাপারে। উনি বললেন, ললিতকলা ভারতীয় চারুকলার উপর বহু লেখালেখি হাপিয়েছে তাদের ‘এনসিয়েন্ট জার্নাল’ এবং ‘কনটেম্পরারি জার্নালে’। সমসাময়িক ভারতীয় চিত্রকর এবং ভাস্করদের উপর ছোট ছোট সাইজের বইয়ের সিরিজ-ও। আরও বড় ধরনের কাজে হয়তো নামা যেত। ‘কিন্তু ললিতকলা নেই।’ যেখানে ডিরেকটরের সিদ্ধান্তই ছিল ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’। আজকাল তো সব ব্যাপারের ভোট নেওয়া হয়।’ ব্যাপারটা শঙ্খের কাজকর্মে ‘সুবিধের থেকে অসুবিধেই আনে বেশি, তা ছাড়া, বয়সও তো হল।’
বয়স, চাকরিজীবনে চারুশিল্পীকে ক্লান্ত হয়তো করতে পারে, কিন্তু নদীর মতো ফিরে ফিরে বাঁক নেওয়া একজন পাবলো পিকাসো (যাঁর শেষজীবনের ছবি নিয়ে আজ সমালোচক মহলে নতুন বিস্ময়, নব গবেষণা), একজন মকবুল ফিন্দা হুসেনকে জীর্ণ করতে পারে না। বা একজন কবি রবীন্দ্রনাথকে। বয়স যাঁকে দান করেছিল এক অনন্য আত্মপ্রকাশ। এক চরম দুঃসাহসী ভ্রমণ।
এবং যে ছবি নিয়ে আজ ফের নতুন করে আলোচনা। শিল্পসচেতন ভারতীর নাগরিক মন সম্প্রতি যাঁর আঁকা ছবিতে খুঁজে পাচ্ছে তাঁর সাহিত্যের থেকেও অনেক বেশি পরিমাণ শক্তি।
শঙ্খ চৌধুরী অবশ্য তা মনে করেন না। এটাও তাঁর কাছে বাড়াবাড়ি কথা। ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্পর্কে কোনও জাজমেন্ট দেবার সময় আমাদের এখনও হয়নি। কেন না বড় করে ওঁর ছবির একটা একজিবিশনও এখন পর্যন্ত করা হয়নি।’ ওঁর ধারণা এই সব কথা বিদেশীরা চান বলছেন বলে আমরা যথারীতি মানতে শুরু করেছি।’ যেমন ছসেনকেও পিকাসোর মতো নদীর মতো মোড় ঘোরানো ক্রমশ পালটে যাওয়া, শিল্পী বলে উনি মনে করেন না। ‘আমি তো ওঁর মধ্যে কোনও পরিবর্তন-টরিবর্তন দেখতে পাই না।’
গণেশ পাইন কিন্তু হুসেনকে এক অসামান্য শিল্পী বলে মনে করেন। ওঁর মতে, অমৃতা শেরগিলকে ‘পুরোধা করে বোম্বাই পেইনটিং-এর যে নতুন ধারা শুরু হয়েছিল ‘হসেনের সেখানে অসামান্য অবদান’। ‘স্টান্ট দেখার জন্যই হোক, কিম্বা অন্য কোনও কারণেই হোক’ হসেনকে এখন প্রায় ‘পারফরমিং আর্টিস্ট-এর স্তরেই ফেলা চলে বলে গণেশের ধারণা।
আর রবীন্দ্রনাথ?
‘তন্ময় গলায় বলে উঠলেন গণেশ, ‘ওঁর আঁকা ল্যান্ডস্কেপ দেখেছেন? কী অপূর্ব নরম সুন্দর তার আলো। ‘টোয়াইলাইটে ভরা। আমার তো যত বয়স বাড়ছে ততই রবীন্দ্রনাথের ছবি ভালো লাগছে।’
রবীন্দ্রনাথকে দক্ষ শিল্পী বলতে নারাজ হলেও বিকাশ ভট্টাচার্য এটাও মনে করেন যে ওঁর ছবির টেকনিকাল ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সব দুরে সরে যায় (বিকাশ এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন অন্য সব বৃত্তির মতোই ছবি আঁকাও একটা পরিপূর্ণ বৃত্তি। এবং সেই সিরিয়াসনেস দিয়েই ছবি আঁকা শেখার ব্যাপার থাকে)। ছবিতে রবীন্দ্রনাথ যেখানে উত্তরণ করেন তা তিনি রবীন্দ্রনাথ বলেই করেন বলে বিকাশের বিশ্বাস। ‘তাঁর আঁকা নারীর মুখে যে রহস্যঘন পরিমণ্ডল তৈরি হয়’ তা বিকাশকে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু গোলমাল হল সতীশ গুজরালের বেলায়। উনি যে রবীন্দ্রনাথকে খুব বড় চিত্রকর বলে মনে করেন না, ততদূর অবধি পরিষ্কার বোঝা গেল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি ওঁর, কেমন লাগে নিজের থেকেই তার যে ফিরিস্তি দিলেন তা দুর্বোধ্য। বললেন, রবীন্দ্রনাথের ছবি ‘আউটস্ট্যান্ডিং কিছু নয়’। কিন্তু ‘টাইম অ্যান্ড স্পেসের’ বিচারে তা অনেক এগিয়ে- ‘যার অ্যাহেড’।
গুজরালজি নিজেকে ‘পূর্ণ শিল্পী করতে চান বলেই নাকি ‘ছবি থেকে ভাস্কর্য, মিউরাল হয়ে অবশেষে স্থাপত্যে’ পৌঁছেছেন পরম সন্তোষে।
কেননা ক্রমশ উনি বুঝতে পেরেছেন কোথাও ওঁর হারিয়ে যেতে নেই মানা। ছবি থেকে ভাস্কর্ষে গিয়েছিলেন ‘থ্রি ডাইমেনশনাল’ হবার জন্য। স্থাপত্যে পেরেছেন শুধু ভাস্কর্যের আনন্দই নয়, ‘ছবি আঁকার, মিউয়াল করার আনন্দ’। এরপর যদি উনি রাজনীতিতে যান তাতেও বিস্ময়ের নেই কেননা রাজনীতিকেও তো আজকাল শুনি, বলা হয় ‘মস্ত বড় আর্ট’।
২২ নভেম্বর, ১৯৮৭ আনন্দবাজার